ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শহুরে শিশুর মধ্যে দেরিতে কথা বলার সমস্যা বেশি

শহুরে শিশুর মধ্যে দেরিতে কথা বলার সমস্যা বেশি
×

ছবি :: কিরণ/ইউনিসেফ

ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ

প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৫ | আপডেট: ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৭:২২

| প্রিন্ট সংস্করণ

শিশুর বিকাশগত সমস্যার মধ্যে বাক ও ভাষাগত প্রতিবন্ধিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় শিশুর ভাষা-বিকাশে বিলম্ব, শব্দ উচ্চারণে সমস্যা, তোতলামি, স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যার কারণে যোগাযোগ ঘাটতি এবং সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতার অভাব বেড়েছে। সময়মতো শনাক্তকরণ ও থেরাপি না পেলে শিশুর বাকপ্রতিবন্ধকতা শিক্ষাগত সাফল্য, সামাজিক দক্ষতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বাকপ্রতিবন্ধিতা বলতে কেবল কথা বলতে না পারা বোঝায় না–বরং শব্দ উচ্চারণে অসুবিধা, ভাষা শিখতে দেরি হওয়া, কথা জড়ানো বা তোতলামি, বাক্য গঠন করতে না পারা, ভাষা বোঝায় সমস্যা অথবা সামাজিক প্রেক্ষাপটে ভাষা ব্যবহার করতে না পারাও বাকপ্রতিবন্ধকতার অন্তর্গত। সাধারণভাবে এটি কথা ও ভাষা শিখনের সমস্যা নামে পরিচিত। 

২০১৮-১৯ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, প্রায় ৬ শতাংশের বেশি শিশুর মধ্যে স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যা রয়েছে, যাদের একটি বড় অংশই কথা ও ভাষা শিখনের সমস্যায় ভুগছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জাতীয় প্রতিবন্ধিতা জরিপ অনুযায়ী, দেশে ভাষাগত প্রতিবন্ধিতা শিশুর মধ্যে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরো ডিসঅর্ডার ও অটিজমের (ইপনা) গবেষকদের প্রকাশিত ২০২১ সালের এক নিবন্ধে দেখা যায়, ছেলেশিশুর মধ্যে কথা ও ভাষা শিখনের সমস্যা তুলনামূলক বেশি। একই গবেষণা অনুযায়ী বাকপ্রতিবন্ধকতার অন্যান্য যে ঝুঁকি পাওয়া গেছে তা হচ্ছে শিশুর জন্মের সময় মা-বাবার বয়স, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম, অপরিণত বয়সে জন্ম নেওয়া শিশু, কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশু এবং অতিচঞ্চল ও অমনোযোগী শিশু। এ ছাড়া বৈশ্বিক বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী বাকপ্রতিবন্ধকতার অন্য কারণগুলোর মধ্যে প্রধান হচ্ছে–কান ও সংশ্লিষ্ট স্নায়ুর সমস্যা, জন্মের সময় অক্সিজেনের ঘাটতি, নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার, শিশুর সঙ্গে পর্যাপ্ত কথোপকথনের অভাব, অপুষ্টি, পরিবারের মানসিক চাপ, সহিংসতা ইত্যাদি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, শব্দদূষণ শিশুর শ্রবণ মনোযোগ ও কগনিটিভ ফাংশনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে; যাতে শিশুর কথা ও ভাষা শিখনের সমস্যা হতে পারে। ২০১৯ সালে আইসিডিডিআর,বির আরেক গবেষণার তথ্যমতে, বায়ুদূষণ শিশুর নিউরোকগনিটিভ বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা ভাষা বিকাশের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
নগর এলাকায় খেলার জায়গা কম, সামাজিকতা কম। ফলে শিশুতে ভাষা অনুশীলনের সুযোগ সীমিত। সব মিলিয়ে শহুরে শিশুর মধ্যে কথা ও ভাষা শিখনের সমস্যা গ্রামাঞ্চলের তুলনায় বেশি।
যদি দেখা যায় জন্মের কয়েক মাসের মধ্যে শিশু স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাসছে না, ১২ মাস বয়সের মধ্যেও মুখ দিয়ে অস্ফুট শব্দ করছে না, ১৮ মাসের মধ্যে কয়েকটি অর্থবোধক শব্দ বলতে পারছে না, দুই বছর বয়সেও দুটি শব্দ জোড়া দিয়ে একটি অর্থবোধক বাক্য তৈরি করতে পারছে না বা কথা বলতে শেখার পরও তার কথা আবার বন্ধ হয়ে গেছে, তখন ধরে নিতে হবে শিশুর কথা ও ভাষা শিখনের সমস্যা হচ্ছে। এ ছাড়া সঠিক উচ্চারণ করতে না পারা, তোতলামি, শব্দের পিঠে শব্দ উঠে যাওয়া  বা একদম কথা বলতে না পারা ইত্যাদিও বাক-প্রতিবন্ধকতার অন্যতম লক্ষণ। 

করণীয়
ভাষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি: প্রতিদিন শিশুর সঙ্গে গল্প করা/কথা বলা; খেলাধুলার সময় প্রতিটি ধাপ বর্ণনা করে বলা; বিভিন্ন শব্দ ও বস্তু শেখানো শিশুকে উত্তর দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া।
স্ক্রিন টাইম কমানো: দুই বছরের নিচে মোবাইল/কম্পিউটারের স্ক্রিন ব্যবহার করতে না দেওয়া। এর পরিবর্তে বই, খেলনা ও সামাজিক ঘরোয়া খেলা/বাইরের খেলাধুলা উৎসাহিত করা
স্পিচ ও ল্যাংগুয়েজ থেরাপি: স্পিচ ও ল্যাংগুয়েজ থেরাপি শিশুর ভাষা, উচ্চারণ ও যোগাযোগ দক্ষতা উন্নয়নে অত্যন্ত কার্যকর। 
শ্রবণ পরীক্ষা: যদি শিশুর কথা দেরিতে আসে– প্রথমেই তার কান ও সংশ্লিষ্ট স্নায়ুর পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
অভিভাবক প্রশিক্ষণ: অভিভাবক প্রশিক্ষণ শিশুর কথা ও ভাষা শিখনের সমস্যা সমাধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একাধিক গবেষণায় প্রমাণিত–প্রশিক্ষিত অভিভাবকরা শিশুর ভাষা-বিকাশে থেরাপির সমান ভূমিকা রাখতে পারেন। 

লেখক: অধ্যাপক, চাইল্ড অ্যাডোলেসেন্ট ও ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রি, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ

আরও পড়ুন

×