নেতিবাচক প্রতিবেদনে কমছে নারী অভিবাসীর হার
অনেক স্বপ্ন বুকে নিয়ে এই নারীরা পারি জমান প্রবাসে; তাদের কারও কারও স্বপ্ন পরিণত হয় দুঃস্বপ্নে
তানজিলা মোস্তাফিজ
প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১৮ | আপডেট: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৮:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশ থেকে যে নারীরা বিদেশে কাজ করতে যান, তারা তো মূলত যান গৃহকর্মী হিসেবে এবং একটা বড় অংশ যান সৌদি আরবে। মূলত ২০১৫ সালে সৌদি আরবে যখন তাদের নারী গৃহকর্মী প্রয়োজন হয় এবং বাংলাদেশ এমওইউ স্বাক্ষর করে, তারপর থেকে যদি আমরা দেখি– ২০১৫ থেকে গত সাত-আট বছরে আমাদের যত নারী অভিবাসন হয়েছে, তার বড় অংশই গৃহকর্মী হিসেবে যারা যান তারা।
কুমিল্লার নারী অভিবাসী মাকসুদা বেগম বলেন, ‘আমি সৌদি আরবে সাত বছর থেকে দেশে বেড়াতে আসি। এখন আমার মালিক যাওয়ার জন্য ভিসা পাঠিয়েছেন। আমি যেতে পারছি না, কারণ আমার বয়স ৪৭ বছর। অফিস থেকে বলছে, আমার বয়স বেশি হয়ে গেছে, তাই আমি যেতে পারব না। আমার কথা হলো, আমি সুস্থ আছি, তাহলে যেতে পারব না কেন?’
১৯৭৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কতজন বাংলাদেশি কর্মী অভিবাসিত হয়েছেন, সে হিসাব থাকলেও প্রতিবছর কর্মচুক্তি সম্পাদন করে কত ব্যক্তি দেশে ফিরেছেন, তার তথ্য সংগ্রহ আজও সম্ভব হয়ে ওঠেনি। মাসভিত্তিক বিএমইটি ক্লিয়ারেন্সের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জানুয়ারি মাসে ৯৬ হাজার ৮৩৪ জন এবং ফেব্রুয়ারিতে ৬২ হাজার ২৯৪ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। মার্চে এ সংখ্যা বেড়ে এক লাখ পাঁচ হাজার ২৬ জনে পৌঁছায়, যা প্রথমবারের মতো লাখের কোটা ছোঁয়। এপ্রিলে বছরের সবচেয়ে কম ৪৯ হাজার ৯৬৭ জন অভিবাসী অভিবাসন করেছেন। তবে আগস্টে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে এক লাখ ৪৭ হাজার ৪০১ জনে পৌঁছায়, যা এ বছরে সর্বোচ্চ।
২০২৫ সালে ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৬১ হাজার ৪৮৩ জন নারীকর্মী কাজের উদ্দেশে বিদেশে গেছেন, যা মোট অভিবাসীর প্রায় ৫.৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে নারী অভিবাসীর সংখ্যা ছিল ৬১ হাজার ১৫৮। সুতরাং ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে অভিবাসনে নারীর অংশগ্রহণ ০.৫৩ শতাংশ বেশি। ২০১৬ সাল নাগাদ বাংলাদেশ থেকে মোট শ্রমপ্রবাহের ১৬ শতাংশই ছিলেন নারী শ্রমিক। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি নারী শ্রমিক বাংলাদেশ থেকে কাজের জন্য অভিবাসন করেছেন। ২০২৫ সালে নারী অভিবাসীর সংখ্যা ২০২৪ সালের মতোই। ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় ৪১.৭ শতাংশ কম, যা নারী অভিবাসনের ক্ষেত্রে একটি উদ্বেগজনক নিম্নমুখী ধারা।
রামরুর গবেষণা অনুযায়ী, গত ১০ বছরে নারী অভিবাসন সম্পর্কে শুধু নেতিবাচক প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়েছে। নারী অভিবাসনসংশ্লিষ্ট কোনো ইতিবাচক গল্প তুলে ধরা হয়নি। ফলে নেতিবাচক সামাজিক ধারণার (স্টিগমা) পাশাপাশি শোভন কর্মক্ষেত্রের অনিশ্চয়তা, সহিংসতার কারণে নারী অভিবাসী কর্মী ক্রমেই অভিবাসনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। এ ছাড়াও যেখানে পোশাকশিল্প শুরু হয়েছিল ৯০ শতাংশ নারী কর্মী নিয়ে, সেখানে গত বছরগুলোতে ক্রমাগতভাবে নারীর অংশগ্রহণ কমে ৫৫ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। রক্ষণশীল পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা এই জায়গায় কাজ করছে কিনা তা গবেষণা করে দেখা প্রয়োজন।
নারী অভিবাসনে নিম্নমুখী ধারা মোকাবিলায় গন্তব্যভিত্তিক নিরাপদ ও শোভন কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রয়োজন সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় ভোকেশনাল সৃষ্টি করা। নারী অভিবাসন বিষয়ে সামাজিক স্টিগমা কমাতে ইতিবাচক প্রচেষ্টা নিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ পেশা ও বিদেশে নারী কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা।
রামরুর ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ‘নারী অভিবাসীরা কিছু নির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন, যেমন–বিচ্ছিন্নতা, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে যৌন নিগ্রহ। ন্যায়বিচারের অভাব এবং অকাল প্রত্যাবর্তন তাদের ক্ষেত্রে একটি সাধারণ চিত্র। একদল নারী গন্তব্য দেশগুলোতে কারাবাস, নির্যাতন এবং অস্বাভাবিক মৃত্যুর শিকার হন; আবার অন্য একটি অংশকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো হয়। এসব দেশে শেল্টার হোমের সংখ্যাও অপ্রতুল। এ ছাড়া নারী গৃহকর্মীদের সঙ্গে দূতাবাস কর্মকর্তাদের নিয়মিত যোগাযোগের ব্যবস্থাটি এখনও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি।’
- বিষয় :
- নারী
- নারী অভিবাসী
- তানজিলা মোস্তাফিজ
