নারীর লড়াই কেবল তার একার নয়
অলংকরণ :: বোরহান আজাদ
আনু মুহাম্মদ
প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩২ | আপডেট: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৭:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
কোনো সমাজ, রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক মতাদর্শ কতটা সভ্য বা সংবেদনশীল, তার বিচারের প্রধান মাপকাঠি হলো নারীর প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি। একটি রাজনৈতিক দর্শন তখনই গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করা যায়, যখন তা নারীকে তার প্রাপ্য মর্যাদা, অধিকার ও সম্মানের স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। নারী যখন সমাজে সম্মানজনক ও সরব অবস্থানে থাকে, তখন কেবল নারীরই নয়, পুরুষেরও প্রকৃত সম্মান প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত নারীর সক্রিয় সম্মানজনক বাধাহীন অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই একটি বৈষম্যহীন ও সমতার সমাজ বিনির্মাণের পথ প্রশস্ত হয়।
কর্মক্ষেত্রে নারীর অদম্য উপস্থিতি ও প্রতিকূলতা
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে নারীর সক্রিয় উপস্থিতি নেই। কৃষি খাতে নারীর ‘অদৃশ্য শ্রমের’ ভূমিকা দীর্ঘদিনের, তবে বর্তমানে মাঠে সরাসরি কৃষিকাজেও তাদের অংশগ্রহণ দৃশ্যমান হচ্ছে। এর বাইরে পোশাকশিল্প বা গার্মেন্টস সেক্টরে তো নারীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। মাটি কাটা থেকে শুরু করে নির্মাণশ্রমিক–সব জায়গাতেই নারীর পদচারণা। এমনকি দোকান, রিকশা চালানো বা পরিবহন শ্রমিক হিসেবেও এখন নারীকে দেখা যাচ্ছে।
শিক্ষাক্ষেত্রেও চিত্রটি আশাব্যঞ্জক। স্কুল-কলেজ, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত নারীর অংশগ্রহণের হার এবং কৃতিত্বের স্বাক্ষর অত্যন্ত উজ্জ্বল। পেশাগত জীবনে প্রবেশ করতে গিয়ে সামাজিক ও পারিবারিক কারণে অনেক নারী ঝরে পড়লেও যারা টিকে থাকছেন, তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে আছেন। বিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, লেখক, শিল্পী, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, বিমানচালক থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা–সব পেশাতেই নারীর অবস্থান সুদৃঢ়। এমনকি প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার বা উপাচার্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদেও আমরা নারীদের দায়িত্ব পালন করতে দেখেছি।
এই অর্জন এসেছে বিশাল প্রতিকূলতাকে মোকাবিলা করে। একজন নারীকে শৈশব থেকে ঘর ও বাইরে, প্রতিষ্ঠানে–সর্বত্রই নানামুখী বাধার সম্মুখীন হতে হয়। রাস্তাঘাট, গণপরিবহন কিংবা কর্মস্থল–কোথাও নারী পুরোপুরি নিরাপদ নয়। মৌখিক ও শারীরিক আক্রমণ, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, টিটকারি এবং হুমকির মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হয়। শ্রমজীবী নারী থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা–প্রত্যেকেই কমবেশি একই অভিজ্ঞতার শিকার। এই প্রতিকূল পরিবেশকে উপেক্ষা করেই নারীকে অগ্রসর হতে হয়, যা প্রমাণ করে যে নারীর মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়েও বেশি।
রাজনৈতিক দল ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা
নারীর সক্ষমতা প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও সমাজের নীতিনির্ধারক মহল এবং রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীকে কোণঠাসা বা প্রান্তিক করে রাখার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ফলে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর উপস্থিতি যা হওয়া সম্ভব তার তুলনায় এখনও অনেক কম।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এই আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ ছিল নির্ধারক ও বৈপ্লবিক। নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এ অভ্যুত্থানের সাফল্য কল্পনাও করা যায় না। দুঃখজনক হলো, অভ্যুত্থানের পর সেই নারীদেরই বিভিন্নভাবে হেনস্তা ও অপমানের শিকার হতে হয়েছে। যারা একসময় তাদের সহযোদ্ধা ছিল, তাদেরই একটি অংশ অনলাইনে নারীর প্রতি কুরুচিপূর্ণ আক্রমণ বা সাইবার বুলিং শুরু করে। এ প্রবণতা আদতে এই আক্রমণকারীদের প্রকৃত হীন রাজনৈতিক ও পুরুষতান্ত্রিক চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ।

নির্বাচনী অঙ্গীকার ও প্রবঞ্চনার রাজনীতি
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গঠিত বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে নারীর উপস্থিতি ছিল হতাশাজনক। আর নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন ছিল সবচেয়ে অবহেলিত এবং অপমানিত। সংবিধান সংস্কার ও নির্বাচনী বিধিমালা নিয়ে অনেক আলোচনার পর ঐকমত্য কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয় যে, নির্বাচনে সব দল কমপক্ষে ৫ শতাংশ নারী মনোনয়ন দেবে, যদিও দাবি ছিল ৩০ শতাংশ।
কয়েকটি ছোট দল ৫ শতাংশের বেশি মনোনয়ন দিলেও বড় দল হিসেবে বিএনপিও ৫ শতাংশের গণ্ডিতে পৌঁছাতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় স্ববিরোধিতা দেখা গেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রে। তারা বরাবরই দাবি করে যে, তারা নারীকে সম্মান করে এবং জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী হিসেবে তারা ৫ শতাংশ নারী মনোনয়ন দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ ছিল। জামায়াতসহ বেশ কয়েকটি দল একজন নারীকেও মনোনয়ন দেয়নি। এটি প্রমাণ করে যে, নারী প্রশ্নে এই দলগুলোর অবস্থান এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মধ্যে বিশাল ফারাক বিদ্যমান।
ক্ষমতা, ধর্ম এবং পুরুষতান্ত্রিকতার মনস্তত্ত্ব
বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে (১৯৯১-২০২৪) রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে নারীরা আসীন ছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশ নেই। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মতাদর্শ। নারী নেতৃত্বে থাকলেও যদি তিনি পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শ ধারণ করেন, তবে তিনি পুরুষের মতোই জনস্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারেন। গত কয়েক দশকে আমরা সেটিই দেখেছি। অর্থাৎ সমস্যাটি নারীর সক্ষমতার নয়, বরং পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির; যা নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই থাকতে পারে।
ধর্মভিত্তিক দলগুলোর বক্তব্যে প্রায়ই নারীকে ‘নির্ভরশীল’, ‘দুর্বল’ এবং পুরুষকে ‘তত্ত্বাবধায়ক’ বা ‘কর্তৃত্বকারী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অনেক দলের নেতাদের মতে, নারীর বিচরণক্ষেত্র হবে অন্দর মহলে এবং পুরুষের কাজ বাইরের জগৎ নিয়ন্ত্রণ করা। কেউ কেউ নারীশিক্ষার বিরোধী, আবার কেউ কেউ শর্তসাপেক্ষে শিক্ষার পক্ষে। নিষেধাজ্ঞা বা প্রতিকূলতা–এর সবই কেবল নারীর জন্য। অনেকে মাসিক বা সন্তান ধারণের বিষয়টিকে নারীর ‘দুর্বলতা’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন। অথচ এটি নারীর অক্ষমতা নয়; বরং অধিকতর সক্ষমতা। বাংলাদেশ শুধু নয়, বিশ্বজুড়ে মানব প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখার এই বিশাল দায়িত্ব পালন করেও নারী অন্যান্য গুরুদায়িত্ব পালন করছে। কার্যত নারীর এই অন্তর্নিহিত শক্তিকে পুরুষতন্ত্র ভয় পায়। এই ভয় থেকেই তারা ধর্মকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে নারীকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, দুর্বল ভাবাতে চায়, নারীর মধ্যে হীনম্মন্যতা তৈরি করতে চায়।
এটি কোনো ধর্মীয় প্রশ্ন নয়; বরং এটি একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্ন। আমিনা ওয়াদুদ বা ফাতেমা মারনিসির মতো মুসলিম নারীবাদীরা দেখিয়েছেন, টেক্সট বা মূল ধর্মীয় পাঠের যথাযথ বিশ্লেষণে সমাজ রাজনীতির সকল ক্ষেত্রে নারীর শক্তিশালী ভূমিকার স্বীকৃতি আছে। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজপতিরা যুগে যুগে ধর্মকে নারীকে অধস্তন রাখার কাজে ধর্মকে ব্যবহার করতে চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশেও তা-ই।
আমরা দেখি যখন প্রয়োজন হয়, তখন এসব গোষ্ঠী নারী নেতৃত্বের সঙ্গে জোট করে বা সমর্থন জানায়, আবার কাজ শেষ হলে বিরোধিতা করে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জামায়াত একসময় আন্দোলন করেছে। কয়েক বছর আগেই হেফাজতের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধি দেওয়া হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য দল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ও পরবর্তী সময়ে ২০ দলীয় জোটে ছিল। অথচ সুযোগ পেলেই এসব দল নারীর নেতৃত্ব বা সক্রিয় ভূমিকার বিরোধিতা করে, তাদের অধিকার সংকোচনের চেষ্টা করে। এই স্ববিরোধিতা ও প্রতারণাই তাদের রাজনীতির মূল বৈশিষ্ট্য।
নারীকে ধর্ম ও সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে অবদমিত রাখার এই চেষ্টা আসলে প্রকট বৈষম্যবাদী রাজনীতি। এই রাজনীতিকে মোকাবিলা করা ছাড়া বাংলাদেশের রাজনীতির প্রকৃত উত্তরণ সম্ভব নয়। নারীর লড়াই কেবল তার একার নয়, এটি পুরুষেরও লড়াই। কারণ নারী ও পুরুষের যথাযথ মর্যাদা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই কেবল একটি মানবিক ও বাসযোগ্য সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
লেখক: শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ
- বিষয় :
- নারী
- নির্বাচন
- নারী ভোটার
- আনু মুহাম্মদ
