নতুন সরকার-নারীর প্রত্যাশা
প্রাপ্তি, প্রত্যাশা এবং আগামীর কৌশল
ছবি :: মামুনুর রশিদ
কামরুন নাহার
প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩১ | আপডেট: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২:৪০
| প্রিন্ট সংস্করণ
নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে আমরা যখন সুপারিশমালা তৈরি করেছিলাম, তখন অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে সেগুলোকে তিনটি ধাপে বিন্যস্ত করা হয়েছিল। প্রথম ধাপে ছিল–অন্তর্বর্তী সরকার তাৎক্ষণিকভাবে কী কী পদক্ষেপ নিতে পারে। দ্বিতীয় ধাপে, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের করণীয় কী হবে এবং তৃতীয় ধাপটি ছিল আমাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্নের জায়গা বা ‘ভিশন’, যেখানে আমরা রাষ্ট্রকে নারীবান্ধব হিসেবে দেখতে চাই।
আমরা একটি ‘স্বাধীন নারী কমিশন’ গঠনের দাবি জানিয়েছিলাম। এ বিষয়ে একটি কমিটি বা সার্চ কমিটির মতো কাঠামো তৈরি হয়েছে, যারা এর কার্যপরিধি নির্ধারণে কাজ করছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকেও ৪৩৩টি সুপারিশের মধ্যে ৭১টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছিল, যা তাদের মেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য।
নির্বাচিত নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা হলো, বিগত উদ্যোগগুলোকে পুনরায় পর্যালোচনা করা এবং অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রগুলোকে আরও সুনির্দিষ্ট করা। দুঃখজনক হলেও সত্য, নারীবিষয়ক ইস্যুগুলো ঐতিহাসিকভাবেই উপেক্ষিত থেকেছে। যাদের প্রতি আমাদের অনেক আস্থা বা প্রত্যাশা ছিল, তারাও অনেক সময় এ বিষয়গুলোকে গুরুত্বের তালিকায় নিচে রেখেছেন। এই উপেক্ষার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সংবেদনশীলতা আনা প্রয়োজন।
যেসব সুপারিশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য বলে প্রমাণিত, সেগুলো যেন কোনো অজুহাতেই বিলম্বিত না করা হয়। নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়টিকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। যে প্রেক্ষাপট বা অজুহাতই দেখানো হোক না কেন, নারীর ওপর সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সমাজে এমন একটি বার্তা পৌঁছে দিতে হবে, নারীর ওপর সহিংসতা করে কেউ পার পাবে না। অতীতে অপরাধ করে পার পাওয়া গেছে বলে ভবিষ্যতেও যাবে–এই মানসিকতা ভাঙতে হবে কঠোর আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে।
নারীর উন্নয়ন কেবল একটি নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হতে পারে না। বিশেষ করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রতিটি মন্ত্রণালয়েরই কিছু না কিছু করণীয় রয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী, তাই যৌক্তিকভাবেই প্রতিটি সেক্টরে বরাদ্দের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নারীর জন্য থাকা উচিত।
নতুন মন্ত্রিপরিষদ বা প্রশাসনিক কাঠামো যখন গঠিত হবে, তখন পরিকল্পনাকারীদের এটি নিশ্চিত করতে হবে, প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনায় নারীর অংশগ্রহণ ও স্বার্থ রক্ষিত হচ্ছে। এখানে বিচার বিভাগকেও একটি বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বিত চিন্তাভাবনা এবং কার্যক্রমের অভাব দূর করতে হবে, যাতে নারীবান্ধব উদ্যোগগুলো আলোর মুখ দেখে।
নারী অধিকার কর্মী বা সংগঠন হিসেবে আমাদের কাজ হলো ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো ধরিয়ে দেওয়া এবং সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করা। আমরা যেসব ভালো উদাহরণ বা মডেল তৈরি করেছি, রাষ্ট্র যেন সেগুলো গ্রহণ ও রেপ্লিকেট (পুনরাবৃত্তি) করে, সেদিকে আমাদের নজর থাকবে।
আমরা, অধিকারকর্মীরা নীতিনির্ধারকদের দরজায় বারবার কড়া নাড়ব, যতক্ষণ না কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আমাদের আরও সতর্ক হতে হবে। ধর্মীয় আবরণে একটি গোষ্ঠী যেভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে এবং জনমত গঠনে প্রভাব বিস্তার করছে–তা আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। নির্বাচনেও আমরা এর প্রতিফলন দেখেছি। এ পরিস্থিতিতে নারী আন্দোলনের কর্মীদের আরও সুসংহত এবং কৌশলী হতে হবে।
লেখক: সদস্য, নারীপক্ষ
সদস্য, সাবেক নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন
