ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নতুন সরকার-নারীর প্রত্যাশা

অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের পরীক্ষা

অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের পরীক্ষা
×

ছবি : সাজ্জাদ নয়ন

মরিয়ম নেছা

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩২ | আপডেট: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২:৩৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় পর একটি উৎসবমুখর নির্বাচন সম্পন্ন হলো। ভোরের আলো ফোটার আগেই ভোটকেন্দ্রের সামনে নারী-পুরুষের দীর্ঘ সারি আর তরুণ ভোটারদের উচ্ছ্বাস এক নতুন রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে নারী ভোটারের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এ উৎসবের আবহকে সার্থক করেছে।

এই গণজাগরণের আড়ালে একটি রূঢ় বাস্তবতা আমাদের ভাবিয়ে তোলে। দুই হাজারের বেশি প্রার্থীর মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নারী ছিলেন মাত্র ৮৩ জন, আর নির্বাচিত হতে পেরেছেন মাত্র সাতজন। কোনো কোনো বড় দল নারী প্রার্থী দেয়নি, যা গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উপরন্তু, সংসদে নারীর জন্য ৫০টি সংরক্ষিত আসন থাকলেও তা পরোক্ষ মনোনয়নে পূরণ হয় বলে সরাসরি প্রতিনিধিত্ব কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না পৌঁছানোর আক্ষেপ অতীতের মতোই আশাহত করার মতো। এটি একটি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, যা নিরসনে এখন সাহসী সংস্কার প্রয়োজন।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শ্রমবাজারে নারীর উপস্থিতি হ্রাস পাওয়া মানেই দারিদ্র্যের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়া। অর্থাৎ ব্যালট পেপারে নারী আজ যে ভবিষ্যতের সপক্ষে রায় দিয়েছেন, তার মূলে রয়েছে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার দাবি। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে পেছনে রেখে টেকসই উন্নয়ন কিংবা অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র–কোনোটাই সম্ভব নয়।

নারী ভোটাররা এবার যখন ভোট দিয়েছেন, তাদের কেন্দ্রে ছিল অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, শ্রমবাজারে নারীর উপস্থিতি কমলে দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ে। বাংলাদেশের নারী শ্রমশক্তির হার ৪৪ শতাংশ; একে অন্তত ৫০ শতাংশে উন্নীত করা ছাড়া এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বা উন্নত রাষ্ট্রের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।

সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, দেশের ৭৬ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তরুণীদের হয়রানি বেড়েই চলেছে। নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের অবকাঠামো শক্তিশালী না হলে নারীর অংশগ্রহণ কখনোই টেকসই হবে না। এ ক্ষেত্রে আমরা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে পারি। স্পেন বা অস্ট্রিয়া যেভাবে ‘এক-দরজায় সব সেবা’ এবং ইলেকট্রনিক নজরদারি চালু করে নারীর তাৎক্ষণিক সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে, তা আমাদের জন্য উদাহরণ হতে পারে। 

প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে আমরা নারী সমাজের উন্নয়নে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দেখতে চাই। সরাসরি নির্বাচিত নারী আসনের রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়নে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপ এখন সময়ের দাবি। সেই সঙ্গে যৌন সহিংসতার মামলা নিষ্পত্তিতে ফাস্ট ট্র্যাক আদালতের সংখ্যা বাড়ানো এবং তদন্তে আধুনিক ফরেনসিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অনলাইন হয়রানি রোধে সাইবার অপরাধ দমন ইউনিটকে আরও দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে।

কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত শিশু-পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে। বাজেটে জেন্ডার-সংবেদনশীল বরাদ্দ কেবল কাগজে-কলমে না রেখে তার ফলাফল পরিমাপের সূচক প্রকাশ করতে হবে। পোশাক, চলাফেরা ও মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে নারীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর যে কোনো হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সিডও সনদের সংরক্ষিত ধারা প্রত্যাহারের রোডম্যাপ  ঘোষণা এবং জেন্ডার-ড্যাশবোর্ড চালুর মাধ্যমে তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। 

লেখক: উইমেন রাইটস অ্যান্ড জেন্ডার ইকুইটি টিম লিড, একশনএইড বাংলাদেশ

আরও পড়ুন

×