ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নতুন সরকার-নারীর প্রত্যাশা

রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজবাস্তবতার সমীকরণ

রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজবাস্তবতার সমীকরণ
×

ছবি :: সাজ্জাদ নয়ন

শরমিন্দ নীলোর্মি

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩৩ | আপডেট: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীর অবস্থান, রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ একটি অপরটির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। আমাদের রাজনৈতিক কাঠামোতে নারীকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে সদিচ্ছার অভাব দীর্ঘদিনের। যে নগণ্য সংখ্যক নারী রাজনীতির মাঠে আসছেন বা নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন, তাদের পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা মূলত রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকারী। অর্থাৎ বাবা বা স্বামীর রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিচিত হয়েই তারা নেতৃত্বে আসছেন।

পারিবারিক ঐতিহ্য থাকা দোষের কিছু নয়, কিন্তু সমস্যা হলো, যখন নেতৃত্ব কেবল উত্তরাধিকার সূত্রে আসে তখন তৃণমূল থেকে উঠে আসা সাধারণ নারীদের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। সাধারণ পরিবার থেকে আসা একজন নারীও যাতে মেধা ও শ্রম দিয়ে নেতৃত্বে আসতে পারেন, সেই প্রণোদনা ও পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

এশিয়ায় বাল্যবিয়ের হারে আমাদের শীর্ষস্থানটি অত্যন্ত লজ্জাজনক। এর পেছনের কারণ খুঁজতে গেলে আমরা দেখি, এটি কেবল দারিদ্র্য নয়, বরং নিরাপত্তার অভাবই প্রধান কারণ। অভিভাবক যখন দেখেন তার স্কুলগামী মেয়েটিকে রাস্তায় ইভটিজিংয়ের শিকার হতে হচ্ছে, তখন মেয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি তাকে বিয়ে দিয়ে দেওয়াকেই একমাত্র সমাধান মনে করেন।

বাল্যবিয়ে রোধ করতে হলে আমাদের অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। এই পর্যায় পর্যন্ত বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো ‘লার্নিং গ্যাপ’ না থাকে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত তাকে ধরে রাখা এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব হওয়া উচিত।

নারীর ক্ষমতায়নের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থান এবং একে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক মাধ্যম ও রাজনৈতিক আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, মানুষ নারীকে আর ঘরের চার দেয়ালে বন্দি দেখতে চায় না। ব্যালট পেপার বা জনমতের মাধ্যমে মানুষ এই বন্দিদশার বিরুদ্ধেই তাদের রায় দিয়েছে।

এ সদিচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ায় প্রধান বাধা হলো আমাদের সনাতনী মানসিকতা। আমরা সামাজিকভাবে মনে করি, পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব শুধু পুরুষের। তাই চাকরির অধিকারও তাদেরই আগে। এই একপেশে চিন্তা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রীয় পলিসি বা নীতিমালায় যদি নারীর জন্য বিশেষ প্রণোদনা বা বাধ্যবাধকতা না থাকে, তবে তাদের মূল স্রোতে নিয়ে আসা কঠিন হবে।

যখন একজন নারী প্রাতিষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেন, তখন তাঁর প্রয়োজন হয় ‘সাপোর্ট সিস্টেম’-এর। এর মধ্যে অন্যতম হলো ডে-কেয়ার সুবিধা। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে দেশের অনেক স্থানে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা হেফজখানাগুলো শিক্ষার পাশাপাশি শিশুদের দেখভাল বা ডে-কেয়ারের মতো সেবা দিচ্ছে। গার্মেন্ট সেক্টরেও মালিকপক্ষ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এ উদ্যোগগুলো নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।

একটি শিশু কেবল পরিবারের নয়, রাষ্ট্রেরও ভবিষ্যৎ। নারী যাতে নিশ্চিন্তে কাজে যোগ দিতে পারেন এবং নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন, সে ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এর জন্য সরকারি এবং কমিউনিটি পর্যায়ে ব্যাপক বিনিয়োগ প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কেবল ব্যক্তি উদ্যোগে বা এনজিওর মাধ্যমে এই বিশাল চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়।

দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সংগঠনগুলো নারীর উত্তরাধিকার, পারিবারিক আইন বা সহিংসতার মতো আইনি অধিকারগুলো নিয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছে। এগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এখন সময় এসেছে নারীর ‘দৈনন্দিন জীবনের অধিকার’ নিয়ে কথা বলার। নারীর অধিকার কেবল ডিভোর্স বা মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন কর্মজীবী মা তাঁর সন্তানকে কোথায় রেখে অফিসে যাবেন বা কর্মক্ষেত্র থেকে ফেরার পথে তিনি কতটা নিরাপদ–এগুলোও নারীর অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সংগঠনগুলোকে কমিউনিটি পর্যায়ে কাজ করতে হবে। তাদের সরকারের সঙ্গে দরকষাকষি করতে হবে, যাতে ডে-কেয়ার, নিরাপদ যাতায়াত এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করা যায়। আন্দোলনের পরিধি আদালতপাড়া থেকে বের করে এনে নারীর প্রতিদিনের জীবনযাপনের বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধানে কাজে লাগাতে হবে। নারীর অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে হলে রাজনীতিতে সুযোগ, অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ এবং সমাজে নিরাপত্তা–এ তিনটি ক্ষেত্রের সমন্বয় ঘটাতে হবে।

লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×