ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নতুন সরকার-নারীর প্রত্যাশা

পিতৃতান্ত্রিক ঐক্য ও রাজনীতির ভবিষ্যৎ

পিতৃতান্ত্রিক ঐক্য ও রাজনীতির ভবিষ্যৎ
×

ছবি :: মামুনুর রশিদ

মানস চৌধুরী

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩৮ | আপডেট: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণকে কেবল চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ফ্রেমে বন্দি করে দেখাটা ঐতিহাসিক ভুল। যদি আমরা পেছনের দিকে তাকাই, ২০১৮ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলন কিংবা নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণ ছিল সমানে সমান। আরও অতীতে গেলে ভ্যাটবিরোধী আন্দোলনেও নারী শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি আমরা দেখেছি। অর্থাৎ বাংলাদেশের জনপরিসরে বা রাজপথে নারীর উপস্থিতি নতুন কোনো ঘটনা নয়; এর একটি দীর্ঘ নাগরিক ইতিহাস রয়েছে।

‘রাজপথ’ শব্দটি অত্যন্ত নাগরিক বা শহুরে মধ্যবিত্তের শব্দ। আমরা যদি শহরের গণ্ডি পেরিয়ে শ্রমিক অঞ্চলগুলোর দিকে তাকাই, দেখব গত কয়েক দশকে গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশের ফলে সেখানে নারীরই আধিপত্য। শ্রমিকের সংখ্যার দিক থেকে এবং রাজপথে দাবি আদায়ের মিছিলে তাদের উপস্থিতি অত্যন্ত দৃশ্যমান। আরও গভীরে গেলে কৃষিজ মজুর কিংবা নারী সমিতির আন্দোলনের ইতিহাসও আমাদের সামনে আসে। তাই আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে আলাদা করে বিস্ময় প্রকাশ করাটা এক ধরনের ঐতিহাসিক অস্বস্তির জন্ম দেয়।

তবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লব–যে নামেই একে অভিহিত করা হোক না কেন এর পরবর্তী প্রেক্ষাপট গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর জনপরিসরে যারা আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করলেন, তাদের মধ্যে একটি অভাবনীয় ‘পিতৃতান্ত্রিক ঐক্য’ লক্ষ্য করা গেছে। এই ঐক্যে শামিল হয়েছে আন্দোলনের বিজয়ী তরুণ অংশ এবং বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল। সাইবার স্পেস বা ডিজিটাল পরিসরে চোখ রাখলেই দেখা যায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালেও প্রশ্ন উঠেছিল– সমন্বয়কদের মধ্যে নারী, ভিন্ন ধর্ম বা ভিন্ন জাতিসত্তার প্রতিনিধি কতজন? কিন্তু ৫ আগস্টের পর সেই প্রশ্নগুলো তলিয়ে গিয়ে একটি প্রবল পুরুষতান্ত্রিক আবহে আমরা প্রবেশ করলাম। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে নতুন রাজনৈতিক শক্তির (যেমন জাতীয় নাগরিক কমিটি বা এনসিপি) উন্মেষ ঘটল, তারাও এই লিঙ্গীয় প্রশ্নে বা নারী প্রশ্নে বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক ঐক্যের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করল বা আপস করে নিল।

এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে মূলধারার রাজনীতিতেও। দীর্ঘ দেড় দশক পর বিএনপি যখন একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পুনরায় আবির্ভূত হলো, তারা দেখল মাঠ এবং সাইবার জগৎ–উভয়ই নারীবিরোধী এবং নাগরিক শিষ্টাচারবহির্ভূত এক প্রবল হইচইয়ে পূর্ণ। নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিএনপি চাইলেই আরও বেশি নারী প্রার্থী দিতে পারত। তারা সম্ভবত এই ‘সাংস্কৃতিক বাতাবরণ’ বা পুরুষতান্ত্রিক জনমতের সঙ্গে মানানসই থাকার কৌশল বেছে নিয়েছে। তবে এখানে একটি প্যারাডক্স বা বৈপরীত্যও লক্ষণীয়। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরার পর বা জনসমক্ষে আসার পর প্রায়ই স্ত্রী, কন্যাসহ উপস্থিত হয়েছেন। এটি হয়তো তাঁর দিক থেকে এক ধরনের ‘কালচারাল ডেমোনস্ট্রেশন’ বা প্রদর্শনীমূলক রাজনীতি, যা বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক স্রোতের বিপরীতে একটি সূক্ষ্ম বার্তা দিতে পারে।
এখন প্রশ্ন হলো, পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব? যদি কোনো দল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বসে, তবে তাদের এই বিষাক্ত পুরুষতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে পুনর্বিবেচনা করতে হবে। কেবল সংরক্ষিত নারী আসন নয়, মন্ত্রিসভা গঠন এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়বে। এমনকি যেসব দলের গঠনতন্ত্র বা ইশতেহারে নারীবিদ্বেষী মনোভাব স্পষ্ট, সংসদীয় রাজনীতির চর্চায় এলে তাদেরও কৌশলগত কারণে কিছুটা নমনীয় হতে হবে। চিত্তের পরিবর্তন না হলেও, অন্তত আচরণের পরিবর্তন ঘটাতে তারা বাধ্য হতে পারে।

দুই.
নারীর প্রতি অনলাইন ও অফলাইন বুলিং বা হয়রানি বর্তমানে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অনেকেই বলেন, ‘আইন দিয়ে সবকিছু রোধ করা যায় না, সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন।’ আমি এই বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নই। সমাজ যখন কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বা সম্মান দিতে ব্যর্থ হয়, তখনই আইনের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি হয়ে পড়ে। বিষয়টি অনেকটা পাবলিক বাসে নারীর জন্য সংরক্ষিত আসনের মতো। যদি আমাদের গণপরিবহন বা পাবলিক পরিসর নারীবান্ধব হতো, যদি সেখানে নারীর প্রতি যৌন হয়রানিমূলক বা উপেক্ষামূলক আচরণ না করা হতো, তবে আলাদা আসনের প্রয়োজনই পড়ত না। যেহেতু সামাজিক অনুশীলনে সেই নিরাপত্তা নেই, তাই সেখানে ‘অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশন’ বা নিরাময়মূলক পদক্ষেপ হিসেবে আইনের কঠোরতা জরুরি।

আইন অনেকটা ঐশী গ্রন্থ বা কবিতার মতো বিমূর্ত। এর সতেরো রকমের ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব। আইন প্রয়োগের সাফল্য নির্ভর করে প্রয়োগকারীর অভিপ্রায় বা ‘ইনটেন্ট’-এর ওপর। কেউ আইনের ফাঁকফোকর বের করে নিপীড়কের পক্ষে দাঁড়াতে পারে, আবার কেউ একই আইন ব্যবহার করে ভুক্তভোগীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। তাই আইন দিয়ে সম্ভব নয়–এই অজুহাতের চেয়ে জরুরি হলো, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কোন দার্শনিক বা নৈতিক অবস্থান থেকে কাজ করছে, তা নিশ্চিত করা। যতদিন পর্যন্ত সমাজে পুরুষতন্ত্রের বোধোদয় না ঘটছে (এবং নিকট ভবিষ্যতে তা ঘটার সম্ভাবনা কম), ততদিন পর্যন্ত আইনকেই প্রধান ‘রক্ষাকবচ’ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

স্থায়ী পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সামগ্রিক সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির বদল, যার শুরু হতে হবে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে। কিন্তু বাংলাদেশ এমন এক দুর্ভাগ্যজনক রাষ্ট্র, যেখানে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যক্রমও বদলে যায়। পাঠ্যপুস্তকগুলো যেন পাঁচ বছরের আয়ু নিয়ে জন্মায়। এর বাইরেও শিক্ষা খাতে সীমাহীন দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি ও জবরদখল তো আছেই। তবুও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের কারিকুলামে লিঙ্গ-সংবেদনশীলতার পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা ছাড়া বিকল্প নেই।

পরিশেষে বলা যায়, পুলিশ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন–প্রতিটি স্তরের নির্বাহী দায়িত্বে থাকাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং ‘পেডাগজিক্যাল’ বা শিক্ষাদর্শনিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি লিঙ্গবান্ধব পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় চেকপোস্টগুলো সচল রাখাই হবে নারীর সুরক্ষার প্রাথমিক ও প্রধান হাতিয়ার।

লেখক: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×