ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নারী অভিবাসী শ্রমিকের দ্বিমুখী লড়াই

নারী অভিবাসী শ্রমিকের দ্বিমুখী লড়াই
×

২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ৬১ হাজার ১৫৮ জন নারী কাজের সন্ধানে বিদেশে গেছেন

তানজিলা মোস্তাফিজ

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৬ | ০৭:২০ | আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ২০:০৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘বিদেশ গেলাম ঠিকই, কিন্তু টাকার মুখ দেখলাম না। দুবেলা পেটপুরে খাবারও জুটল না। সেখানে হাড়ভাঙা খাটুনি আর অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে যখন দেশে ফিরলাম, তখন সমাজ আমাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাল। সামনে-পেছনে মানুষের কত যে কটু কথা! পেটে ভাত নেই, অথচ অপবাদের বিষ গিলতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।’

আক্ষেপ আর দীর্ঘশ্বাসের মিশেলে কথাগুলো বলছিলেন সৌদি আরবফেরত নারী অভিবাসী শ্রমিক রূপা। স্বপ্নের পেছনে ছুটে সর্বস্বান্ত হয়ে ফেরা এক রেমিট্যান্সযোদ্ধার এই আর্তনাদ যেন হাজারো নারী অভিবাসীর না-বলা বেদনার প্রতিধ্বনি।

বাংলাদেশে নারী অভিবাসী শ্রমিকদের দেশে ফেরার পর হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার এ প্রবণতা নতুন কিছু নয়। পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, নৈতিকতার ভ্রান্ত মাপকাঠি এবং ভিত্তিহীন গুজবের ওপর দাঁড়িয়ে আছে সমাজের এই নেতিবাচক মানসিকতা। ফলে বিদেশে গিয়ে অমানুষিক শ্রম দিয়ে যে নারীরা দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে সাহায্য করেন, দেশে ফেরার পর তারাই হয়ে পড়েন ভয়াবহ মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার। এই বৈষম্য কেবল তাদের আত্মবিশ্বাসকেই গুঁড়িয়ে দেয় না, বরং তাদের পারিবারিক জীবন, আর্থিক পুনর্বাসন এবং ভবিষ্যতের সব স্বপ্নকেও গলা টিপে হত্যা করে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ৬১ হাজার ১৫৮ জন নারী কাজের সন্ধানে বিদেশে গেছেন। এর আগে ২০২৩ সালে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১৩ লাখ ৫ হাজার ৪৫৩ জন কর্মী বিদেশে পাড়ি জমান, যার ১৩ শতাংশই ছিলেন নারী। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রায় ৯০ শতাংশ শ্রমিক মূলত ছয়টি দেশে যান–সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং সিঙ্গাপুর। নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এই গন্তব্যগুলোর মধ্যে সৌদি আরবের আধিপত্য সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৬৫ শতাংশ নারীই সেখানে যান।

রামরুর ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী তাঁর এক শ্বেতপত্রে নারী অভিবাসীদের এই বহুমাত্রিক সংকটের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ‘পুরুষদের তুলনায় নারী অভিবাসীরা সাধারণত বেশি আর্থসামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ পটভূমি থেকে আসেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সৌদি আরবে যাওয়ার ক্ষেত্রে নারী অভিবাসীদের আর্থিক সহায়তা পাওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে তারা পদে পদে প্রতারিত হন।’

তিনি আরও বলেন, ‘গন্তব্য দেশে পৌঁছানোর পর নারী কর্মীরা বিচ্ছিন্নতা, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন এবং ক্ষেত্রবিশেষে ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের শিকার হন। সেখানে তাদের ন্যায়বিচারের সুযোগ নেই বললেই চলে। চুক্তি শেষ হওয়ার পরও সময়মতো দেশে ফিরতে না পারা একটি নৈমিত্তিক সমস্যা। অনেক নারী মিথ্যা অভিযোগে কারাবরণ করেন, এমনকি অস্বাভাবিক মৃত্যুরও শিকার হন। অন্যদিকে গন্তব্য দেশগুলোয় পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্রের অভাব এবং দূতাবাসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা না থাকায় তারা সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়েন।’

প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরার পর স্বপ্না আক্তারের জীবনে শুরু হয় আরেক নতুন মানসিক নির্যাতন। তিনি বলেন, ‘দেশে ফেরার পর আমার স্বামী মানুষের নানা রকম বাজে কথায় প্রভাবিত হয়। সমাজ অপবাদ দেয়, বিদেশে গিয়ে আমি খারাপ কাজ করেছি। বিদেশেও কষ্ট করলাম, দেশে ফিরেও নিজের আত্মীয়-স্বজনের আজেবাজে কথা শুনে দিনের পর দিন কাঁদছি।’

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ড. নুরুল ইসলাম এ বিষয়ে আইনি কাঠামোর গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘মানব পাচার ও প্রতারণার শিকার হলে বিএমইটি সহায়তা করতে পারে। ২০১৩ সালের আইন অনুযায়ী অভিযোগ জানালে বিএমইটি অভিযুক্তদের তলব করে সমাধানের উদ্যোগ নেয়। নিয়ম অনুযায়ী, গৃহকর্মীদের বিদেশ যেতে কোনো টাকা লাগার কথা নয়, কিন্তু দালালরা ঠিকই মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।’

তিনি আরও যুক্ত করেন, ‘পাসপোর্টে যে এজেন্সির সিল থাকে, আইন অনুযায়ী প্রথম তিন মাস কর্মীর ভালোমন্দের দায়িত্ব তাদের। কিন্তু বেশির ভাগ কর্মী স্বল্প শিক্ষিত হওয়ায় তারা জানেন না কোথায় গিয়ে অভিযোগ করতে হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডেমো অফিসের মাধ্যমে এই আইনি তথ্যগুলো তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া জরুরি।’ 

আরও পড়ুন

×