অদম্য ‘তনিমা’র এগিয়ে চলার গল্প
সানজিদা সুলতানা তনিমা
লাবণী মণ্ডল
প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬ | ০৭:২৪ | আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ২০:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকার যানজট আর ব্যস্ততার চিরচেনা দৃশ্যপট। এর মধ্যেই হঠাৎ হয়তো আপনার চোখে পড়বে একটি স্কুটার। চালকের মাথায় গোলাপি রঙের হেলমেট, কাঁধে ফুড ডেলিভারির চারকোনা বড় ব্যাগ। হ্যাঁ, চালকের আসনে একজন নারী! গ্রাহকের দোরগোড়ায় গরম খাবার পৌঁছে দিতে তীব্র বেগে ছুটে চলেছেন তিনি। প্রথম দর্শনে অনেকেই হয়তো কিছুটা থমকে যান, অবাক চোখে তাকান। তবে পরক্ষণেই সেই বিস্ময় রূপ নেয় মুগ্ধতায়; হাসিমুখে খাবার গ্রহণ করে অনেকেই তাঁর প্রশংসা করেন।
আমাদের সমাজে ‘ফুড ডেলিভারি’ বা রাইড শেয়ারিংয়ের মতো পেশাকে অলিখিতভাবে কেবল পুরুষদের জন্যই নির্দিষ্ট বলে ধরে নেওয়া হয়। সেই প্রথাগত ছক ভেঙে, সাহস আর আত্মবিশ্বাসে ভর করে যে নারীরা নতুন পথ তৈরি করছেন, সানজিদা সুলতানা তনিমা তাদেরই একজন। শহরের এই যান্ত্রিক কোলাহলের ভেতর তাঁর এই ছুটে চলা কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে খাবার পৌঁছে দেওয়ার নয়; এটি তাঁর স্বাবলম্বী হওয়ার, জীবনযুদ্ধের প্রতিটি বাধা জয় করার এক অনুপ্রেরণার উপাখ্যান।
তনিমার শিকড় টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে। এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট তিনি। বুকে একরাশ স্বপ্ন আর চোখে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার উজ্জ্বল আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ২০২০ সালে পাড়ি জমান রাজধানী ঢাকায়। অচেনা শহরে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা মোটেও সহজ ছিল না তাঁর জন্য।
টিকে থাকার লড়াইয়ে শুরুতে একটি মার্চেন্ডাইজিং প্রতিষ্ঠানে কাজ নেন তিনি। এরপর কখনও কল সেন্টার, কখনও সেলসের কাজে নিজেকে যুক্ত করেছেন। কিন্তু ঢাকার মতো ব্যয়বহুল শহরের আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার মান এবং দৈনন্দিন খরচের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে বারবার হোঁচট খেয়েছেন। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তনিমা তাঁর সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে বলেন, ‘ঢাকায় আসার পর প্রথমদিকে ভয়ংকর অর্থকষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। নিজের থাকা-খাওয়ার খরচ জোগাড় করতেই এত হিমশিম খেতে হতো যে, একসময় আমার সবচেয়ে প্রিয় স্বপ্ন– পড়াশোনাটাই বন্ধ হয়ে যায়।’
অন্ধকার যখন ঘনীভূত, তখনই যেন ভোরের আলো ফুটে ওঠে। সেই আলো হয়ে তনিমার জীবনে আসেন তাঁর হোস্টেলের রুমমেট ইসরাত। ইসরাত তাঁকে গতানুগতিক কাজের বাইরে এসে ‘ফুডপ্যান্ডা’র ডেলিভারি রাইডার হিসেবে কাজ করার সাহস জোগান। শুধু পরামর্শ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, তনিমাকে একটি স্কুটার কেনার জন্য আর্থিক ঋণও দেন তিনি। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার এ দৃষ্টান্তই তনিমার জীবনের মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দেয়।
সেই যে চাকা ঘুরতে শুরু করল, তা আর থামেনি। বর্তমানে তনিমা সপ্তাহে ছয় দিন ঢাকার রাস্তায় স্কুটার নিয়ে ছুটে বেড়ান। এ আয়েই এখন তাঁর সচ্ছল জীবন কাটছে। শুধু কি তাই? ফুড ডেলিভারির মতো স্বাধীন পেশায় নিজের সুবিধামতো শিফট বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকায় থেমে যাওয়া পড়াশোনাটাও তিনি আবার শুরু করেছেন। বর্তমানে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করছেন। পাশাপাশি স্কুটার কেনার সেই ঋণও ধাপে ধাপে শোধ করে চলেছেন আত্মনির্ভরশীল এ তরুণী।
তনিমার এই অভাবনীয় পরিবর্তন দেখে এখন অনেকেই তাঁর কাছে পরামর্শ চাইতে আসেন। তনিমা হাসিমুখে তাদের রাইডার হিসেবে যুক্ত হওয়ার উৎসাহ দেন। তিনি বলেন, ‘এই কাজের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো নিজের সুবিধামতো সময়ে কাজ করার স্বাধীনতা। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্য বা যারা খণ্ডকালীন কাজ করে বাড়তি আয় করতে চান, তাদের জন্য এটি দারুণ এক সুযোগ।’
তনিমা জানান, এখানে কাজ করতে বিশেষ কোনো ডিগ্রির প্রয়োজন নেই। ১৮ বছরের বেশি বয়সী যে কেউ ইচ্ছা আর বাইক চালানোর দক্ষতা থাকলে যুক্ত হতে পারেন। রাইডারদের সুরক্ষায় প্ল্যাটফর্মগুলোর বর্তমান নানা উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। তনিমা জানান, ফুডপ্যান্ডার মতো প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় স্বল্পমূল্যে বীমা সুবিধা, ই-লার্নিংয়ের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি, এমনকি সহজ কিস্তিতে ই-বাইক বা সাইকেল কেনার সুবিধাও এখন রাইডারদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে, যা তাদের পথচলাকে করছে আরও মসৃণ।
প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা আর গ্রাহকদের এক চিলতে হাসি তাঁকে প্রতিদিন নতুন করে অনুপ্রাণিত করে। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পাওয়া মানুষের প্রশংসা বা ছোট টিপসগুলো তাঁকে আরও এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগায়। অদম্য আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তনিমা বলেন, ‘কোনো কাজই আমার কাছে ছোট নয়। নিজের ভেতর প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রম করার মানসিকতা থাকলে জীবনে যে কোনো কিছুই অর্জন করা সম্ভব।’
নিজের ঘাম ঝরানো আয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচার যে প্রশান্তি, সেটাই সানজিদা সুলতানা তনিমাকে প্রতিদিন নতুন করে সামনে এগোবার শক্তি দেয়। সমাজের শত ভ্রুকুটিকে পেছনে ফেলে এভাবেই এগিয়ে চলুক হাজারো তনিমা।
- বিষয় :
- গল্প
- লাবণী মণ্ডল
- নারী
