ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মৃত্যু উপত্যকায় প্রাণের স্পন্দন

মৃত্যু উপত্যকায় প্রাণের স্পন্দন
×

গাজায় দুই বছর পর আট শিশু ফিরে পেয়েছে মা-বাবার সান্নিধ্য ছবি: এএফপি

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১০ | আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১৯:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

গাজার বাতাসে বারুদের গন্ধ আর ধ্বংসস্তূপের মাঝেও কখনও কখনও ফুটে ওঠে জীবনের অমলিন হাসি। দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় পর যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় ফিরে এসেছে আটটি ফিলিস্তিনি শিশু। ইসরায়েলি আগ্রাসনের ভয়াল দিনগুলোতে অপরিণত অবস্থায় (প্রিম্যাচিউর) জন্ম নেওয়া এই শিশুদের যখন উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তখন তারা ছিল মৃত্যুর খুব কাছাকাছি। আজ তারা হাঁটতে শিখেছে, আধো আধো কথা বলতে শিখেছে। ৩০ মার্চ (সোমবার) রাফাহ সীমান্তে যখন এই শিশুদের তাদের মা-বাবার কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হলো, তখন সেখানে তৈরি হয়েছিল এক অভূতপূর্ব আবেগঘন পরিবেশ। স্বজন হারানোর বেদনায় নীল হওয়া গাজার বুকে এ যেন এক বিরল আনন্দের মুহূর্ত।

মৃত্যুকূপ থেকে বেঁচে ফেরার গল্প
সময়টা ২০২৩ সালের নভেম্বর মাস। গাজা সিটির আল-শিফা হাসপাতালে তখন চলছে ইসরায়েলি বাহিনীর ভয়াবহ অবরোধ ও তাণ্ডব। সে সময় হাসপাতালটিতে অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়া অন্তত ২৫ নবজাতককে উদ্ধার করা হয়। চারদিকে যখন মৃত্যু আর ধ্বংসের বিভীষিকা, তখন এই একরত্তি প্রাণগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে চিকিৎসকদের লড়তে হয়েছে এক অসম যুদ্ধ।

ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হাসপাতালবিষয়ক মহাপরিচালক এবং আমিরাতি হাসপাতালের চিকিৎসক মোহাম্মদ জাকোত সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘ইসরায়েলি অবরোধের কারণে আল-শিফা মেডিকেল কমপ্লেক্সে ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক, স্যালাইন এবং খাবারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল। সব ধরনের সরবরাহ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।’ সেই ভয়াবহ প্রতিকূলতার মাঝেও জীবন বাঁচানোর তাগিদে এই শিশুদের গাজার দক্ষিণাঞ্চল হয়ে মিসরে পাঠানো হয় দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য।

একদিকে মাথার ওপর মুহুর্মুহু বোমাবর্ষণ, অন্যদিকে বাস্তুচ্যুতির ভয়াবহ অনিশ্চয়তা–এরই মাঝে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর বুক বেঁধে প্রহর গুনেছেন অসহায় মা-বাবারা। তাঁদের আদরের সন্তান বেঁচে আছে তো? এই প্রশ্নই প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খেয়েছে তাঁদের।

সুলাইমান হিজ্জি নামের এক শিশুর মা ওলা হিজ্জি শোনালেন তাঁর সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা। গর্ভাবস্থার আট মাসের মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা ও শারীরিক জটিলতার কারণে বাধ্য হয়ে সিজারিয়ান অপারেশন করাতে হয় তাঁকে। ওলা বলেন, ‘তারা আমার সন্তানকে আল-হেলু হাসপাতাল থেকে আল-শিফা হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) নিয়ে যায়। এরপর থেকে আর একবারের জন্যও আমি তাকে দেখতে পাইনি।’ দীর্ঘ বিরহের পর সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে আবেগাপ্লুত ওলা শুধু বলতে পারলেন, ‘এ এক বর্ণনাতীত সুন্দর অনুভূতি। সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।’

কিনদা লুলু নামের আরেক শিশুর বাবা সামের লুলুর কণ্ঠেও ধ্বনিত হলো আনন্দ আর শঙ্কার মিশ্র সুর। আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের এই অনুভূতি অবর্ণনীয়। এটি আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, বিশেষ করে ও আমার প্রথম সন্তান।’

ভেঙে পড়া সমাজ ও হারিয়ে যাওয়া শৈশব
প্যালেস্টাইন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, তাদের একটি দল এই মানবিক মিশনে অংশ নিয়ে আটটি শিশুকে গাজায় ফিরিয়ে এনেছে। চিকিৎসা শেষে শিশুদের সঙ্গে তিনজন আত্মীয় এবং দুজন চিকিৎসাকর্মীও ছিলেন। তবে এই আটটি শিশুর ঘরে ফেরা গাজার সামগ্রিক ট্র্যাজেডির একটি ক্ষুদ্র খণ্ডচিত্র মাত্র। ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি) সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গাজায় যুদ্ধ এবং বাস্তুচ্যুতির কারণে পারিবারিক কাঠামোগুলো পুরোপুরি ভেঙে পড়ছে। অসংখ্য শিশু আজ মা-বাবা কিংবা অভিভাবকহীন।

অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে আইআরসির শিশু সুরক্ষা সমন্বয়ক উলরিক জুলিয়া বলেন, ‘গত কয়েক বছরে গাজার শিশুরা সীমাহীন ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বাস্তুচ্যুতির সময় কিংবা পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর কারণে অসংখ্য শিশু তাদের মা-বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আমরা এখন দেখছি, স্থানীয় মানুষজন নিজেদের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে এই এতিম ও বিচ্ছিন্ন শিশুদের যত্ন নেওয়ার চেষ্টা করছে, যদিও তাদের নিজেদেরই বেঁচে থাকার মতো ন্যূনতম সংস্থান নেই। শিশুদের জন্য পরিবারভিত্তিক যত্নই সর্বোত্তম, তবে টেকসই আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়া এই ব্যবস্থাও টিকিয়ে রাখা অসম্ভব।’

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে গাজায় এখন পর্যন্ত ৭২,২০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের একটি বিশাল অংশ নারী ও শিশু। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় একটি তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ চলমান থাকলেও, ইসরায়েলি আক্রমণ প্রায় প্রতিদিনই অব্যাহত রয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, এই যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ইসরায়েলি হামলায় ৭০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন।

বাস্তবতা এতটাই নির্মম যে, আনন্দের দিনগুলোতেও মৃত্যুর ছায়া লেগেই থাকে। যেদিন এই আট শিশু মা-বাবার কাছে ফিরেছে, তার পরদিনও (৩১ মার্চ) ইসরায়েলি বিমান হামলায় গাজায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন।

আরও পড়ুন

×