ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ধর্ষণ: ভয় ও ক্ষমতার ভাষা

ধর্ষণ: ভয় ও ক্ষমতার ভাষা
×

শিল্পকর্ম:: দেবযানী মজুমদার

রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৩ | আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১৯:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণের ঘটনাগুলোর যে ধারাবাহিকতা দৃশ্যমান হয়েছে, সেটিকে যদি কেবল অপরাধ বাড়ার একটি পরিসংখ্যানগত প্রবণতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে এ সংকটের কাঠামোগত গভীরতা আড়াল হয়ে যায়; বরং এ ঘটনাগুলোকে বুঝতে হলে একটি বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন, যেখানে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক মনস্তত্ত্বের রূপান্তর এবং ডিজিটাল সহিংসতার মাধ্যমে নির্মিত সমষ্টিগত চেতনা একসঙ্গে কাজ করে। লিখেছেন রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা
----------------------------------------------

প্রেক্ষিত ও সাম্প্রতিক প্রবণতা
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে অন্তত ৭০টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ৩১টি, যার মধ্যে ১০টি ছিল সংঘবদ্ধ ধর্ষণ। একইসঙ্গে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে মোট ৫৭টি ধর্ষণের ঘটনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক ভুক্তভোগী। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ধারাবাহিকভাবে উঠে এসেছে, যৌন সহিংসতার একটি বড় অংশই ঘটে পরিচিত সামাজিক বৃত্তের ভেতরে–পরিবার, প্রতিবেশ, আত্মীয়তা বা স্থানীয় ক্ষমতার সম্পর্কের মধ্যে; যা এ ধারণাকে ভেঙে দেয় যে, ধর্ষণ প্রধানত ‘অপরিচিতের আক্রমণ’; বরং এটি একটি অভ্যন্তরীণ সামাজিক সহিংসতা, যা আস্থার কাঠামোর মধ্যেই উৎপন্ন হয়। গত বছরের একই সময়ের ঘটনাগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে আরও স্পষ্ট হয়, যেখানে একাধিক আলোচিত মামলায় দেখা গেছে ভুক্তভোগী ও অপরাধীর মধ্যে পূর্বপরিচিতি ছিল এবং সেই সম্পর্কের ভেতরেই ক্ষমতার অসমতা সহিংসতায় রূপ নিয়েছে; যা প্রমাণ করে যে ধর্ষণ কেবল শারীরিক আগ্রাসন নয়, বরং একটি সামাজিক সম্পর্কের বিকৃত রূপ।

রাষ্ট্র ও বিচারহীনতার কাঠামো
এই প্রবণতাকে বিশ্লেষণ করতে গেলে প্রথমেই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সীমাবদ্ধতা সামনে আসে। কারণ বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তের দুর্বলতা এবং ভুক্তভোগী সুরক্ষার অভাব একটি ‘নিরাপদ অপরাধ পরিবেশ’ তৈরি করে, যেখানে অপরাধ সংঘটনের ঝুঁকি তুলনামূলক কম। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং ইউএন উইমেনের বিশ্লেষণে বারবার উঠে এসেছে; যেখানে আইনি প্রক্রিয়া ধীর ও অনিশ্চিত, সেখানে যৌন সহিংসতা কেবল ঘটে না, বরং পুনরাবৃত্তি হয়।

আস্থার ভেতরের সহিংসতা
এ সহিংসতার একটি বড় অংশ শিশু ও কিশোরীর ওপর সংঘটিত হচ্ছে; যেখানে প্রায় অর্ধেক ভুক্তভোগী অপ্রাপ্তবয়স্ক। গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ধর্ষণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি ধারাবাহিক সামাজিক প্রবণতা। তবে এই তথ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো–ধর্ষণ প্রধানত অপরিচিত ব্যক্তির দ্বারা সংঘটিত হয় না; বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধী পরিচিত। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় গবেষণা উভয়ই দেখায়–যৌন সহিংসতার বড় অংশ ঘটে ‘ট্রাস্টেড এনভায়রনমেন্ট’ বা ভুক্তভোগীর চেনা পরিবেশে, যেখানে ভুক্তভোগী অপরাধীকে আগে থেকেই চেনে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ বাস্তবতা আরও তীব্র। কারণ পরিবার, আত্মীয়তা এবং স্থানীয় ক্ষমতার সম্পর্কের মধ্যেই এ সহিংসতা উৎপন্ন হয়। ফলে ধর্ষণ এখানে একটি ‘বহিরাগত হুমকি’ নয়; বরং একটি ‘অভ্যন্তরীণ সহিংসতা’, যা সামাজিক আস্থার ভেতরেই জন্ম নেয়।

ক্ষমতা, সমাজ ও সহিংসতা
এই সামাজিক রূপান্তরকে বোঝার জন্য মিশেল ফুকোর ক্ষমতা তত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে ক্ষমতা কোনো কেন্দ্রীয় উৎস থেকে পরিচালিত হয় না; বরং এটি ছড়িয়ে থাকে এবং দৈনন্দিন সম্পর্কের মধ্য দিয়ে কাজ করে। ধর্ষণ এ কাঠামোর মধ্যে একটি ‘ডিসিপ্লিনারি প্র্যাকটিস’, যা নারীর স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করার একটি সহিংস পদ্ধতি হিসেবে কাজ করে। একইভাবে পিয়েরে বুর্দোর ধারণা দেখায়, কীভাবে এই সহিংসতা অনেক সময় দৃশ্যমান না হয়েও সাংস্কৃতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। ফলে এটি সামাজিকভাবে পুনরুৎপাদিত হয়। এ প্রেক্ষাপটে ধর্ষণ একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং এটি একটি কাঠামোগত অনুশীলন, যা সামাজিক সম্পর্কের মধ্যেই নিহিত।

মনস্তত্ত্ব বনাম কাঠামো
মনোবিশ্লেষণধর্মী ব্যাখ্যায়, বিশেষত সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ধারায়, যৌন সহিংসতাকে অনেক সময় দমিত প্রবৃত্তি, অবদমিত আকাঙ্ক্ষা বা ব্যক্তিগত মানসিক বিকারের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়েছে। কিন্তু এ ব্যাখ্যা প্রায়ই সহিংসতার সামাজিক ও ক্ষমতাগত মাত্রাকে পর্যাপ্তভাবে ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়। এর বিপরীতে সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক ও নারীবাদী তাত্ত্বিক ধারাগুলো দেখায়–ধর্ষণ কেবল ব্যক্তির বিকার নয়; বরং এটি একটি সামাজিকভাবে নির্মিত আচরণ, যা ক্ষমতার অসমতা, লিঙ্গভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ এবং সাংস্কৃতিকভাবে স্বীকৃত সহিংসতার মাধ্যমে পুনরুৎপাদিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে সমসাময়িক চতুর্থ তরঙ্গের নারীবাদ, যা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংগঠিত ও দৃশ্যমান, ধর্ষণকে শুধু একটি অপরাধ হিসেবে নয়, বরং একটি কাঠামোগত সহিংসতা হিসেবে চিহ্নিত করে, যেখানে অনলাইন হেট স্পিচ, ধর্ষণের হুমকি এবং ট্রলিং বাস্তবজীবনের সহিংসতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

হুমকি হিসেবে ধর্ষণ
সাম্প্রতিক সময়ে যে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তা হলো ধর্ষণের ‘হুমকীকরণ’ অর্থাৎ ধর্ষণকে একটি সম্ভাব্য সহিংসতা হিসেবে ব্যবহার করা এবং এই ব্যবহারের প্রতি সামাজিক সহনশীলতা তৈরি হওয়া। বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণ সংঘটনের আগেই তার হুমকি ব্যবহার করে নারীদের নিয়ন্ত্রণ করা হয়; যা সুসান ব্রাউন মিলারের আলোচনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে ধর্ষণকে একটি সংগঠিত ভয়ের কাঠামো হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ফলে ধর্ষণ এখানে কেবল একটি ঘটনা নয়, বরং একটি সামাজিক ভাষা। এই হুমকি পারিবারিক সম্পর্ক, স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কিংবা রাজনৈতিক সংঘাতে ব্যবহৃত হয় এবং এর কার্যকারিতা নির্ভর করে এই ধারণার ওপর যে নারীর শরীর একটি আক্রমণযোগ্য ক্ষেত্র। 

ডিজিটাল সহিংসতা ও সমষ্টিগত চেতনা
যুদ্ধক্ষেত্রে ধর্ষণকে বহুবার একটি কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে এটি একটি সম্প্রদায়কে অপমান ও ভীত করার মাধ্যম। এই সংঘবদ্ধ চেতনা আজকের বাস্তবতায় বিশেষভাবে ডিজিটাল স্পেসের মাধ্যমে নির্মিত হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে নারীর বিরুদ্ধে অবমাননাকর বক্তব্য, ইনবক্সে ধর্ষণের হুমকি এবং অনলাইন ট্রলিং–সব মিলিয়ে একটি নতুন ধরনের সহিংসতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে নারীকে নিয়মিতভাবে ‘ধর্ষণযোগ্য’ হিসেবে কল্পনা করা হয়। এ প্রক্রিয়াটি কেবল ব্যক্তিগত নয়; বরং এটি একটি সমষ্টিগত অংশগ্রহণের ফল। যেখানে অসংখ্য মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই ভাষা ব্যবহার করে। 

নৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ধর্ষণ প্রবণতা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধবাড়ার প্রতিফলন নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক পুনর্গঠনের অংশ, যেখানে রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক মনস্তত্ত্ব এবং ডিজিটাল সহিংসতা একে অপরকে শক্তিশালী করে একটি সহিংস চক্র তৈরি করেছে। এই চক্র ভাঙতে হলে কেবল আইন কঠোর করা যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন একটি সমন্বিত সামাজিক পরিবর্তন, যেখানে সহিংসতার প্রতি নীরবতা ভেঙে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে এবং নারীর প্রতি সহিংসতাকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হবে। 

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×