বিষাক্ত ধোঁয়ার নীরব শিকার
অলংকরণ :: বোরহান আজাদ
লাবণী মণ্ডল
প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১০ | আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | ২১:৪০
| প্রিন্ট সংস্করণ
একটি বিষাক্ত ধোঁয়ার কুণ্ডলী কেবল একজন ধূমপায়ীর ফুসফুসকেই পুড়িয়ে ছাই করে না, নিঃশব্দে তা গ্রাস করে নেয় তার আশপাশে থাকা মানুষদেরও। ‘টোব্যাকো অ্যাটলাস ২০২৫’-এর তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় দুই লাখ মানুষ তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের কারণে অকালে প্রাণ হারায়। এর বাইরে তামাকজনিত নানা জটিল রোগে ধুঁকছেন আরও প্রায় ১৫ লাখ মানুষ। বর্তমানে দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ৩৫.৩ শতাংশ। সবচেয়ে মর্মান্তিক সত্য হলো, তামাকের এ ভয়াবহ চিত্রপটের সবচেয়ে নীরব কিন্তু গুরুতর ভুক্তভোগী হলেন নারী ও শিশুরা; যাদের অনেকেই নিজেরা কখনও ধূমপান না করেও, পরোক্ষ ধূমপানের (সেকেন্ডহ্যান্ড স্মোক) কারণে প্রতিনিয়ত হৃদরোগ, স্ট্রোক, শ্বাসতন্ত্রের জটিল রোগ এবং ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধির শিকার হচ্ছেন।
উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণা (উবিনীগ)-এর পরিচালক সীমা দাস সীমু জানান, কর্মক্ষেত্রে ১৯ শতাংশ, গণপরিবহনে ৩৮ শতাংশ এবং নিজের বসতবাড়িতে ৩৭ শতাংশ নারী পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। গর্ভাবস্থায় এই ধোঁয়া গ্রহণ একজন মায়ের জন্য যতটা বিপজ্জনক, তার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর গর্ভস্থ সন্তানের জন্য। এর ফলে সন্তানের অপরিণত জন্ম, কম ওজন, এমনকি মৃত সন্তান প্রসবের মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটে থাকে।
জনস্বাস্থ্যের এই ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবিলার লক্ষ্যে গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুমোদন করেছিল। এই অধ্যাদেশে ই-সিগারেট নিষিদ্ধ এবং বিক্রয়স্থলে তামাকজাত পণ্যের প্রদর্শন নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। আশঙ্কা করা হচ্ছে, বর্তমান সরকার এ অধ্যাদেশটি সংশোধন করে ই-সিগারেট উৎপাদন ও বিক্রির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে যাচ্ছে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরীর মতে, ই-সিগারেট হলো তরুণদের আসক্ত করার এক নতুন ফাঁদ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) স্পষ্ট সতর্কবার্তা রয়েছে, ই-সিগারেটের নিঃসরণে নিকোটিনসহ বিভিন্ন বিষাক্ত ও ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান থাকে। এটি ধূমপান ছাড়তে সাহায্য তো করেই না, বরং তরুণদের নতুন করে নিকোটিন আসক্তিতে ধাবিত করে।
কোম্পানিগুলোর অনৈতিক প্রচারণার একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন ‘ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো-ফ্রি কিডস’-এর বাংলাদেশ অ্যাডভোকেসি ম্যানেজার আতাউর রহমান। তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, দেশের ৮৮ শতাংশ বিক্রয়কেন্দ্রে শিশুদের চোখের উচ্চতায় সিগারেট সাজিয়ে রাখা হয় এবং ৬৬ শতাংশ দোকানে শিশুদের আকৃষ্ট করতে ক্যান্ডি বা মুখরোচক খাবারের ঠিক পাশেই তামাকপণ্য রাখা হয়।
জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকিস্বরূপ এই আপসকামী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে এবং নারী-শিশু সুরক্ষায় অধ্যাদেশটিকে অপরিবর্তিত রাখার দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন তামাকবিরোধী আন্দোলনকারীরা। এরই ধারাবাহিকতায় ৪ এপ্রিল রাজধানীর সিরডাপ ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে “নারী স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন’ শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা” শীর্ষক একটি নীতি-সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। তাবিনাজ (তামাকবিরোধী নারী জোট) এবং উবিনীগ-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ সেমিনারে চিকিৎসক, গবেষক এবং নীতিনির্ধারকদের একটাই অভিন্ন দাবি ছিল–‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫’-কে কোনো প্রকার পরিবর্তন বা পরিমার্জন ছাড়াই দ্রুত জাতীয় সংসদে পাস করে পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত করতে হবে।
তামাকশিল্পের পক্ষ থেকে প্রায়ই রাজস্ব আয়ের খোঁড়া যুক্তি দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তামাকজনিত রোগে চিকিৎসা ব্যয় এবং অকাল মৃত্যুর কারণে কর্মক্ষমতা হারানোর ফলে দেশের অর্থনীতিতে যে বিশাল বোঝা তৈরি হচ্ছে, তা তামাক খাত থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের চেয়ে বহুগুণ বেশি। অনেক দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবার এ চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র বা ঋণের জালে আটকে পড়ছে।
সিরডাপের সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি। তিনি তামাক নিয়ন্ত্রণে বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ‘মানবসম্পদ ছাড়া আমাদের আর কোনো সম্পদ নেই, একে রক্ষা করতে হলে তামাক রোধ করা জরুরি।’ তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ই-সিগারেট নিষিদ্ধের ধারাসহ তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশটি যেন অবিকৃত অবস্থায় দ্রুত আইনে রূপান্তর করা হয়, সে জন্য তিনি সংসদে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।
