ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উদ্যমে উত্তরণে শতকোটি

উদ্যমে উত্তরণে শতকোটি
×

গত ৩১ মার্চ ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবর প্রাঙ্গণে আয়োজিত হয় ‘উদ্যমে উত্তরণে শতকোটি’ বা ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং দিবস

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১১ | আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | ২১:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

বসন্তের বিকেল। ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবর প্রাঙ্গণে তখন এক অন্যরকম উন্মাদনা। এই উন্মাদনা নিছক কোনো উৎসবের নয়; বরং শিকল ভাঙার, অধিকার আদায়ের এবং মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার। গত ৩১ মার্চ এ প্রাঙ্গণেই ধ্বনিত হলো লাখো নারীর মুক্তির স্পৃহা। ‘সাংগাত বাংলাদেশ’ এবং ‘ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত হলো ‘উদ্যমে উত্তরণে শতকোটি’ বা ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং দিবস। গানে, কবিতায়, নৃত্যে আর প্রতিবাদী উচ্চারণে মানবাধিকার ও সংস্কৃতিকর্মীরা এক হয়ে ডাক দিলেন বৈষম্যহীন এক নতুন পৃথিবীর।

‘ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং’ কেবল একটি স্লোগান বা এক দিনের আয়োজন নয়; বরং পিতৃতান্ত্রিক সমাজের শোষণের বিরুদ্ধে এক বৈশ্বিক প্রতিরোধ। বিশ্বব্যাপী শুরু হওয়া বৃহত্তম এই গণআন্দোলন এ বছর তার তেরোতম বার্ষিকী পূর্ণ করল। কিন্তু কেন এই ‘১০০ কোটি’ বা ‘ওয়ান বিলিয়ন’ নামকরণের উৎপত্তি? এর পেছনের পরিসংখ্যানটি রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। ২০১৩ সালে জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি প্রতিবেদনে উঠে আসে এক ভয়ংকর সত্য–পৃথিবীর প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে অন্তত একজন তাঁর জীবদ্দশায় কখনও না কখনও শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হন। বিশ্বের মোট জনসংখ্যা এবং তাতে নারীর অনুপাত হিসাব করলে, নির্যাতিত এই নারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১০০ কোটিরও বেশি! এই বিপুলসংখ্যক নারীর দীর্ঘশ্বাস, যন্ত্রণা, ক্ষোভ আর ঘুরে দাঁড়ানোর সম্মিলিত শক্তিরই প্রতীকী রূপ হলো ‘ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং’।

রবীন্দ্রসরোবরের এই বর্ণাঢ্য ও তাৎপর্যপূর্ণ আয়োজনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন মানবাধিকার কর্মী এবং ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং বাংলাদেশের সমন্বয়কারী খুশী কবির। তিনি বলেন, ‘আমরা লড়ছি নারীর জন্য মর্যাদাকর একটি সমাজের জন্য।’ তিনি সমাজের দ্বৈত নীতির সমালোচনা করে বলেন, ‘৩৬৫ দিনের মধ্যে কেবল এক দিন–ভ্যালেন্টাইন দিবসে নারীকে ফুল দিয়ে ভালোবাসা জানিয়ে আর বাকি ৩৬৪ দিন নির্যাতন চালিয়ে সমাজে কখনোই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। সেখানে অশান্তি লেগেই থাকে।’ খুশী কবির বিশ্বজুড়ে চলমান অস্থিরতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। দেশে দেশে চলমান যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং সংঘাতময় পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি মূল্য চোকাতে হয় নারীদেরই। পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর বৈষম্যমূলক আচরণ আজ কেবল কোনো নির্দিষ্ট সমাজে নয়, বরং গোটা বিশ্বেই এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, যা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্যই খুবই অমর্যাদাকর। 

প্রতিরোধ কেবল স্লোগানে হয় না, শিল্পের মাধ্যমেই তা সবচেয়ে গভীরভাবে মানুষের হৃদয় ছুঁতে পারে। রবীন্দ্রসরোবরের এই আয়োজনও তার ব্যতিক্রম ছিল না। নানা ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় দিবসটি উদযাপিত হয়।

কবিতার দৃপ্ত চরণে দ্রোহের আগুন ছড়িয়ে দেন সাংগাত-এর কোর কমিটির সদস্য ফওজিয়া খোন্দকার এবং ডালিয়া আহমেদ। নৃত্যের মুদ্রায় প্রতিবাদের ভাষা তুলে ধরেন শারাবান তহুরা এবং হোসাইন ইসলাম জয়। লাবিক কামাল, সমগীত এবং নাহিদ সুলতানার কণ্ঠে গীত হয় শিকল ভাঙার গান, যা উপস্থিত দর্শকদের গভীরভাবে আলোড়িত করে। এ ছাড়া বর্তমান সমাজে কন্যাশিশুদের ওপর চলমান নির্যাতনের এক রূঢ় বাস্তবতাকে অত্যন্ত মর্মস্পর্শীভাবে তুলে ধরেন ‘সাংগাত পারফর্মিং স্পেস বাংলাদেশ’-এর প্রতিভাবান শিল্পীরা। 

অনুষ্ঠানটি সাবলীল ও প্রাণবন্তভাবে সঞ্চালনা করেন নাজনীন পাপ্পু। তিনি সঞ্চালনার ফাঁকে ফাঁকে দর্শকদের কাছে ছুড়ে দেন কিছু চিরন্তন মানবিক আবেদন। তিনি মনে করিয়ে দেন, পরিবর্তন শুরু হতে হবে ঘর থেকে। মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, বোনের প্রতি মমত্ববোধ জাগিয়ে তোলা, স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত দায়িত্ব পালন করা এবং সর্বোপরি নিজের কন্যাসন্তানকে পুত্রসন্তানের সমান মর্যাদা ও সুন্দর জীবন নিশ্চিত করতে জন্য তিনি উদাত্ত আহ্বান জানান।

পুরুষতন্ত্রের এই জগদ্দল পাথর একদিনে সরবে না। কিন্তু ‘ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং’-এর মতো আয়োজনগুলো আমাদের চেতনায় আঘাত করে, মনে করিয়ে দেয়–আমরা একা নই। ১০০ কোটি নারী আজ জেগে উঠছে। সবার সম্মিলিত সদিচ্ছা, সচেতনতা এবং শ্রদ্ধাবোধই পারে প্রতিটি শিশুর, প্রতিটি নারীর জীবনকে নিরাপদ করতে। সমতার সেই মানবিক ভোরের প্রতীক্ষায় একতাবদ্ধ হোক গোটা বিশ্ব।

আরও পড়ুন

×