গাজার ধ্বংসস্তূপে এক বাবার হাহাকার
মোহাম্মদ লুব্বাদ
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ১৯:৪২ | আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ | ১৮:৩৪
ইট-পাথরের ধ্বংসস্তূপ থেকে যখন মোহাম্মদ লুব্বাদকে টেনে বের করা হচ্ছিল, তিনি তখনও জানতেন না, সেটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায়ের মাত্র শুরু। গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের ভয়াবহতা শুধু মৃত্যু আর অবকাঠামো ধ্বংসের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি জন্ম দিয়েছে এমন সব মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটের, যার কোনো সহজ সমাধান নেই। মোহাম্মদ লুব্বাদের গল্পটি গাজার সেই অগণিত অদৃশ্য ক্ষতেরই এক জীবন্ত দলিল, যেখানে একজন পিতা এমন এক সন্তানের অধিকার ফিরে পেতে লড়ছেন, যাকে তিনি কোনো দিন দেখেননি, এমনকি যার পৃথিবীতে আগমনের খবরটিও তিনি নিশ্চিতভাবে জানেন না।
দিনটি ছিল ১৩ অক্টোবর ২০২৩। যুদ্ধ শুরুর মাত্র কয়েক দিন পরের কথা। উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ায় লুব্বাদের বাড়িতে আঘাত হানে ইসরায়েলি বিমান। নিমেষেই ধূলিসাৎ হয়ে যায় ৩৫ বছর বয়সী এই সফটওয়্যার প্রোগ্রামারের সাজানো সংসার।
ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করে লুব্বাদকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় ইন্দোনেশিয়ান হাসপাতালে। জ্ঞান ফেরার পর একটু একটু করে দুঃসংবাদগুলো তাঁর কানে আসতে থাকে। হামলায় তাঁর মা, ভাই, ভাবি এবং তাদের সন্তান মারা গেছেন। তাঁর দুই মেয়ের মধ্যে কেবল চার বছর বয়সী জানা বেঁচে আছে; পাঁচ বছরের আদরের কন্যা রানা চিরতরে হারিয়ে গেছে। কিন্তু তাঁর আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আমাল কোথায়?
হাসপাতাল থেকে লুব্বাদকে জানানো হয়, আমালকে প্রথমে কামাল আদওয়ান হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর একটি সুস্থ ছেলেসন্তান জন্ম নেয়। কিন্তু যুদ্ধের চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে মুমূর্ষু আমালকে আল-শিফা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ২২ অক্টোবর, মাথায় ও পেটে গুরুতর আঘাত নিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি। স্ত্রী-কন্যা ও স্বজন হারানোর এই নিদারুণ শোকের মাঝেই লুব্বাদের মনে দানা বাঁধে এক নতুন উদ্বেগ–তাঁর সদ্যোজাত সন্তান কি বেঁচে আছে? কোথায় সে?
লুব্বাদ বলেন, ‘ভাবুন তো, প্রিয়জন হারানোর প্রতিটি খবরের পর আমরা পরিবারের বেঁচে থাকা সদস্যরা এক হতাম, নিজেদের সান্ত্বনা দিতাম, আর বারবার একটি প্রশ্নই করতাম–বাচ্চাটা কোথায়?’
অক্টোবরের শেষ দিকে একটি ক্ষীণ আশার আলো দেখা যায়। লুব্বাদের শ্যালক জানতে পারেন, আল-শিফা হাসপাতালের ইনকিউবেটরে থাকা অপরিণত বা প্রিম্যাচিউর শিশুদের মধ্যে তাদের সন্তানও থাকতে পারে। হাসপাতালের কর্মীরা জানান, ১৩-১৪ অক্টোবরের দিকে কামাল আদওয়ান থেকে আসা আট মাস গর্ভে থেকে জন্ম নেওয়া একটি শিশুর সঙ্গে তাদের বর্ণনার মিল রয়েছে।
গাজার সে সময়কার পরিস্থিতি ছিল নরকতুল্য। নথিপত্রের কোনো ঠিকঠিকানা ছিল না। এই প্রশাসনিক শূন্যতার বিভ্রান্তিতে প্রায় একই রকম শারীরিক বিবরণ ও পরিস্থিতিতে জন্ম নেওয়া শিশুটিকে অন্য একটি পরিবার নিজেদের সন্তান বলে দাবি করে এবং তাদের নামে নিবন্ধন করে ফেলে। শুরু হয় পিতৃত্বের এক তিক্ত দ্বন্দ্ব।
গাজার পুলিশের তদন্ত বিভাগ জানায়, সে সময় প্রায় একই পরিস্থিতিতে দুই নারী অপরিণত সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। ইসরায়েলি হামলা ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে আল-শিফায় সে সময় এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় চলছিল। বিশ্ববাসী যখন ইনকিউবেটরে ধুঁকতে থাকা শিশুদের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠছিল, ঠিক তখনই অক্সিজেন ও বিদ্যুতের অভাবে অনেক শিশু প্রাণ হারায়। হাসপাতালের কর্মীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, মৃত মায়েদের সন্তানদের মধ্যে একজন মারা যায়। আর বেঁচে থাকা একমাত্র শিশুটিকে ঘিরেই তৈরি হয় এই পরিচয় সংকট।
নভেম্বর ২০২৩। আল-শিফা হাসপাতাল অবরুদ্ধ। চিকিৎসা ব্যবস্থা পুরোপুরি বিপর্যস্ত। শিশুটির সঠিক পরিচয় প্রমাণের জন্য একজন চিকিৎসক ডিএনএ পরীক্ষার পরামর্শ দিলেও যুদ্ধের বাস্তবতায় তা ছিল আকাশকুসুম কল্পনা।
জীবন বাঁচাতে ডিসেম্বর মাসে ওই অপরিণত শিশুদের মানবিক কারণে মিসরে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। খবর পেয়ে লুব্বাদ রাফাহ সীমান্তে ছুটে যান। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে; শিশুদের নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সগুলো মিসর পাড়ি দিয়েছে। লুব্বাদকে বাধ্য হয়ে শুরু করতে হয় দীর্ঘ প্রতীক্ষা।

দীর্ঘ সময় পর, গত ৩১ মার্চ সেই শিশুরা গাজায় ফিরে আসে। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর মায়েরা তাদের সন্তানদের বুকে জড়িয়ে কাঁদছেন। কিন্তু খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে ছুটে গিয়েও লুব্বাদের কপালে সেই সুখ সইল না। সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, দাবিদার অন্য পরিবারটিও উপস্থিত।
‘সেখানে আমাদের মধ্যে ছোটখাটো একটা বিবাদ তৈরি হয়,’ লুব্বাদ বলেন। ‘চিকিৎসকরা অবাক হয়ে খেয়াল করেন যে দুই পরিবারের দাবির মধ্যেই প্রবল যৌক্তিকতা রয়েছে।’
পুলিশ জানায়, শিশুটির হাতে থাকা পরিচয়-ব্যান্ড অনুযায়ী সে লুব্বাদের সন্তান নয়। কিন্তু কামাল আদওয়ান হাসপাতালের সব রেকর্ড ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এই প্রাথমিক নিবন্ধনটিকে চূড়ান্ত সত্য বলে মানতে নারাজ লুব্বাদ।
লুব্বাদ নিশ্চিত, এই শিশুটি তাঁরই। কিন্তু প্রমাণের একমাত্র বৈজ্ঞানিক উপায়–একটি ডিএনএ পরীক্ষা–গাজায় এখন অসম্ভব। ইসরায়েলি হামলায় গাজার সমস্ত উন্নত গবেষণাগার ও চিকিৎসাকেন্দ্র ধ্বংস হয়ে গেছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, এখন একমাত্র উপায় হলো গাজায় ডিএনএ পরীক্ষার যন্ত্রপাতি নিয়ে আসা অথবা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় মিসর বা জর্ডানের কোনো ল্যাবে রক্তের নমুনা পাঠানো। ‘এই বৈজ্ঞানিক সমাধানটুকু না হওয়া পর্যন্ত দুটি পরিবারই নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে,’ তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘অ্যাম্বিগিউয়াস লস’ বা অস্পষ্ট ক্ষতি, যেখানে প্রিয়জনের পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। এই ধরনের ক্ষতি মানুষের মনকে সবচেয়ে বেশি কুরে কুরে খায়, কারণ এখানে শোক পালনের কোনো সমাপ্তি নেই।
লুব্বাদ ঠিক এই যন্ত্রণার মধ্য দিয়েই যাচ্ছেন। অত্যন্ত হতাশ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে। আমি ঠিকমতো কাজ করতে পারি না, স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পারছি না। আমার জীবনটা থমকে আছে।’
যুদ্ধ লুব্বাদের স্ত্রীকে কেড়ে নিয়েছে, কন্যাকে কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন, তাঁর রক্তের একটি অংশ এখনও বেঁচে আছে। চার বছরের কন্যা জানার একমাত্র অভিভাবক লুব্বাদ এখন আন্তর্জাতিক মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। প্রয়োজনে আল-শিফা হাসপাতালের সামনে অবস্থান ধর্মঘটে বসারও প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।
গাজার ধ্বংসস্তূপ হয়তো একদিন সরিয়ে ফেলা হবে। কিন্তু মোহাম্মদ লুব্বাদের মতো বাবাদের হৃদয়ে ‘ও কি আমারই সন্তান?’–এই অনন্ত হাহাকারের অবসান কি কখনও হবে? এই প্রশ্ন আজ এক নীরব আর্তনাদ হয়ে ঝুলে আছে।
তথ্যসূত্র: আলজাজিরা
- বিষয় :
- গাজা
- শাহেরীন আরাফাত
- গাজা গণহত্যা
