ঢাকা রোববার, ১৪ জুন ২০২৬

সাইবার বুলিং

অতিষ্ঠ নারীর জীবন

অতিষ্ঠ নারীর জীবন
×

সাইবার বুলিং কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নারীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল অলংকরণ :: বোরহান আজাদ

লাবণী মণ্ডল

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রযুক্তির বিস্ময়কর উৎকর্ষের এই যুগে ইন্টারনেট আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে পৃথিবী আজ হাতের মুঠোয়। এই অবাধ তথ্যপ্রবাহ আর যোগাযোগের সুবিধার উল্টো পিঠে লুকিয়ে আছে এক গভীর অন্ধকার। অনলাইনের এই বিশাল দুনিয়ায় কৌতুকের ছলে ট্রল, আক্রমণাত্মক মিম, বডিশেমিং, মিথ্যাচার কিংবা দল বেঁধে কদর্য ভাষায় আক্রমণ করার মতো ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক। এই সাইবার বুলিংয়ের সবচেয়ে বড় এবং সহজ লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন নারীরা। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে এ হেনস্তার শিকার। ব্যক্তিগত জীবন, শিক্ষাঙ্গন, বিনোদন জগৎ কিংবা রাজনীতির মাঠ–কোথাও রেহাই পাচ্ছেন না তারা। লিখেছেন লাবণী মণ্ডল

এক নীরব আর্তনাদ 
রাজধানীর একটি স্বনামধন্য স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাইসা (ছদ্মনাম)। পড়াশোনার পাশাপাশি ভালো গান করত। একদিন স্কুলের অনুষ্ঠানে গাওয়া নিজের একটি গানের ভিডিও শখের বশেই ফেসবুকে আপলোড করে মাইসা। এরপরই শুরু হয় দুঃস্বপ্ন। অচেনা কিছু আইডি থেকে ভিডিওর নিচে শুরু হয় অকথ্য ভাষায় আক্রমণ, তার শারীরিক গঠন নিয়ে তীব্র বডিশেমিং। এখানেই শেষ নয়, রাইসার ছবি বিকৃত করে বিভিন্ন গ্রুপে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে ১৪ বছরের এই কিশোরী। খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেয়, বন্ধ করে দেয় স্কুলে যাওয়া। নিজেকে ঘরে বন্দি করে ফেলে। এক পর্যায়ে আত্মহননের মতো ভয়ংকর চিন্তাও গ্রাস করে তাকে। পরিবারের সহযোগিতায় মাইসা সেই ভয়াবহ অবস্থা থেকে বের হতে সক্ষম হয়। তবে মাইসার মতো এমন হাজারো কিশোরী প্রতিদিন নিজেদের ঘরে বসেই সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে মানসিকভাবে তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছে, যার খবর হয়তো তাদের কাছের মানুষরাও জানেন না।

পরিসংখ্যানে ভয়াবহতার চিত্র
ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাউকে ক্রমাগত ভয় দেখানো, লজ্জা দেওয়া বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার নামই সাইবার বুলিং। সরাসরি বুলিংয়ের চেয়ে এটি বেশি ভয়ংকর। কারণ এর পরিধি বিশাল এবং এটি ইন্টারনেটে স্থায়ী ‘ডিজিটাল পদচিহ্ন’ রেখে যায়।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এ সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউএনএফপিএ’র এক যৌথ সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী নারীর প্রায় ৮৯ শতাংশই জীবনে অন্তত একবার অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো, সামাজিক কলঙ্ক ও বৈষম্যের ভয়ে প্রায় ৭৫ শতাংশ ভুক্তভোগী এ বিষয়ে কোনো অভিযোগই করেন না।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্যমতে, গত বছর ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণের জন্য তারা ১৩ হাজার ২৩টি অভিযোগ পেয়েছিল; যার মধ্যে অভিযোগকারীর প্রায় ৯০ শতাংশই ছিলেন নারী। অন্যদিকে পুলিশের তথ্য বলছে, ‘ডক্সিং’ বা অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের শিকার হওয়া ব্যক্তির মধ্যে ৪৮ শতাংশই নারী।

সংকুচিত হচ্ছে নারীর ডিজিটাল বিচরণক্ষেত্র
সাইবার স্পেসে নারীদের কীভাবে কোণঠাসা করা হচ্ছে, তার বাস্তব উদাহরণ ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়ার ডক্টরাল রিসার্চ প্রজেক্টের রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট উজমা তাজরিয়ানের অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, ‘আমি সম্প্রতি একটি মিম শেয়ার করার পর শত শত বট আইডি থেকে আমার ওপর আক্রমণ শুরু হয়। আমার সদ্য প্রয়াত বাবাকে জড়িয়ে অত্যন্ত কুৎসিত ও কদর্য পোস্ট দেওয়া হতে থাকে। আমার ব্যক্তিগত তথ্য খুঁজে বের করে তা নিয়ে আক্রমণ করা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সবচেয়ে হতাশার জায়গা হলো, এই বট অ্যাটাকের কোনো আইনি সমাধান আমার জানা নেই। ফেক আইডির পেছনে কে আছে, তা বের করে শাস্তি দেওয়ার মতো কোনো কাঠামো আমরা দেখতে পাই না। ইনবক্সে অকথ্য গালাগালের শিকার হওয়ার কারণে বাধ্য হয়ে আমাকে সব মেসেজ বক্স এবং ফেসবুক আইডি লক করে ফেলতে হয়েছে। রাস্তাঘাটে ইভটিজিং হলে যেমন মেয়েদের ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়, তেমনি অনলাইনে আক্রমণের ফলে আমার ডিজিটাল পরিসরকেই সীমিত করে ফেলা হলো।’

ভিন্নমতের মূল্য যখন চরিত্রহনন
রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় নারীর অবস্থা আরও শোচনীয়। তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ বা যুক্তির বদলে চরিত্র, জন্মপরিচয় ও ব্যক্তিগত জীবনকে নিশানা করা হয়। রাষ্ট্র সংস্কার ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি লামিয়া ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমি সাইবার বুলিংয়ের শিকার। সামাজিক মাধ্যমে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের কারণে আমাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ও মানসিক হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে।’
তিনি যোগ করেন, ‘‘দলমত নির্বিশেষে ভিন্নমত প্রকাশকারী অসংখ্য নারী রাজনৈতিক কর্মী এমন আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। পুরুষ রাজনৈতিক কর্মীদের ক্ষেত্রে কিন্তু এমনটা ঘটে না। এর মূল কারণ হলো, নারীকে ‘মানুষ’ হিসেবে বিবেচনা না করে কেবল ‘নারী’ হিসেবে দেখা হয়। এর ফলে অনেক নারী ভয় ও মানসিক চাপে রাজনীতি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন। ভিন্নমত থাকতেই পারে, কিন্তু সেটির কাউন্টার তো রাজনৈতিক সমালোচনার মাধ্যমেই হওয়া উচিত, ব্যক্তিগত আক্রমণের মাধ্যমে নয়।’’
আরেক শিক্ষার্থী ও সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট তাসমিন সিদ্দিকী জানান, ‘মতামতের অমিল হলেই একদল মানুষ মেসেজ রিকোয়েস্টে আপত্তিকর ছবি ও কুপ্রস্তাব পাঠায়। সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, অচেনা গ্রুপে যুক্ত করে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় নারীরা একপর্যায়ে এ হয়রানিকেই জীবনের অংশ হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত কমেন্ট ও মেসেজ ফিল্টারিংয়ের ব্যাপারে আরও কঠোর হওয়া।’

কেন নারীই প্রধান লক্ষ্যবস্তু? 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. রাশেদা রওনক খান এই পুরো বিষয়টির মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণগুলো বিশ্লেষণ করে বলেছেন, ‘‘নারী লক্ষ্যবস্তু হওয়ার পেছনে প্রথম কারণটি হলো–আমাদের মজ্জাগত পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এ সমাজব্যবস্থায় নারীকে ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ বা পরনির্ভরশীল ভাবা হয়। পুরুষতান্ত্রিক মনস্তত্ত্ব মনে করে নারী হলো সম্পত্তি–সে ঘরের নারী হোক, বিনোদন জগতের হোক বা রাজনীতির মাঠের। ফলে নারীকে খুব সহজেই টার্গেট করা যায়। দ্বিতীয়ত, সমাজ এমনভাবে তৈরি; যেখানে অনলাইনে একজন নারীকে বুলিং করা হলে সহজেই তাঁর সম্মানহানি ঘটে, কিন্তু একজন পুরুষকে নিয়ে কথা হলে তাঁর তেমন কিছু যায় আসে না। একজন নারীর চরিত্রে দাগ লাগলে তাঁর ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। বুলিং এড়াতে অনেক নারী বাধ্য হয়ে সামাজিক মাধ্যম বন্ধ করে দিচ্ছেন।’’
ড. রওনক তৃতীয় কারণ হিসেবে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘নারী বুলিংয়ের শিকার হলে কোথায় যাবেন? পরিবারকে জানালে তারা উল্টো সামাজিক সম্মানহানির ভয়ে চুপ থাকতে বলে। এ ছাড়া আইনি সহায়তা চাওয়ার ক্ষেত্রেও নারীকে পদে পদে প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হয়। পুলিশ প্রশাসনও অনেক সময় সাইবার আইনের খুঁটিনাটি সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন নয়।’

প্রতিকার ও উত্তরণ কোন পথে 
সাইবার বুলিংয়ের ফলে নারী হতাশা, হীনম্মন্যতা ও একাকিত্বে ভোগেন, যা তাদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি।
সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইনি সহায়তার জন্য জাতীয় হটলাইন ‘১৬৬৯৯’ এবং পুলিশের সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন হটলাইন ‘০১৩২০০০৮৮৮’ চালু রয়েছে। ভুক্তভোগীরা চাইলেই এসব মাধ্যমে সহায়তা নিতে পারেন।
তবে শুধু আইন দিয়ে এই ব্যাধির মূলোৎপাটন সম্ভব নয়। সাইবার বুলিং কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নারীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে তাদের প্ল্যাটফর্মে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীকে সম্মান করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। অনলাইনে নারীর নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করতে হলে অফলাইনেও তা করতে হবে। কারণ মানুষ বাস্তব জীবনে যা ধারণ করে তার প্রতিফলনই ঘটে অনলাইনে। নারী তথা অর্ধেক সমাজের 
নিরাপদ পদচারণা ছাড়া বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাও সম্ভব নয়। 

আরও পড়ুন

×