মুনাফার সীমানা পেরিয়ে
ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে আর্থসামাজিক উন্নয়নে নীরব ভূমিকা রেখে চলেছে ইউনিলিভার বাংলাদেশ
হিল্লোল চৌধুরী
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬ | ০৭:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বর্তমান বিশ্বে ব্যবসার সংজ্ঞা প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। কেবল হিসাবের খাতায় মুনাফা অর্জনই এখন আর সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়; বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দেশীয় শিল্পের বিকাশ, জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষায় একটি প্রতিষ্ঠানের অবদানও তার সাফল্য ও দায়িত্বশীলতার অংশ। এই পরিবর্তিত ও মানবিক বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে আর্থসামাজিক উন্নয়নে নীরব অথচ জোরালো ভূমিকা পালন করে চলেছে ইউনিলিভার বাংলাদেশ।
১৯৬৪ সালে চট্টগ্রামের কালুরঘাটে একটি সাধারণ সাবান কারখানার মধ্য দিয়ে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা আজ দেশের অন্যতম বৃহৎ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করার পাশাপাশি প্রকৃতির প্রতি নিজেদের দায়বদ্ধতার ছাপ রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষ করে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বর্জ্য দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ভয়াবহ সংকট মোকাবিলায় তারা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২২ সাল থেকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও সমাজসেবী সংস্থা ইপসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে তারা গড়ে তুলেছে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ‘চক্রাকার অর্থনীতি’ বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য অর্থনীতির প্রসার ঘটানো।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এ প্রকল্পের আওতায় ৩২ হাজার টনের বেশি বর্জ্য সংগ্রহ করে তা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ আরও ৮ হাজার টন বর্জ্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে তারা এগিয়ে যাচ্ছে। একবার ব্যবহারযোগ্য দূষণকারী উপাদানগুলো সংগ্রহে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা।
এ উদ্যোগ কেবল পরিবেশই বাঁচাচ্ছে না, বদলে দিচ্ছে পিছিয়ে পড়া বর্জ্যকর্মীদের জীবনমান। ইতোমধ্যে প্রায় তিন হাজার বর্জ্যকর্মীকে স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এ কাজে সুরক্ষার জন্য দুই হাজার সংগ্রহকারীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাসামগ্রী। সামাজিক সুরক্ষার বলয় সুদৃঢ় করতে ২০২৫ সাল থেকে এক হাজার ৮২৭ জন বর্জ্যকর্মী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে যৌথ স্বাস্থ্যবীমার আওতায় আনা হয়েছে। ফলে দুর্ঘটনা বা অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুতে তারা পাচ্ছেন আর্থিক নিরাপত্তা। পাশাপাশি অনেক পুরোনো সামগ্রী ক্রেতাকে তাদের ব্যবসার আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন ও ব্যাংক হিসাব খুলতেও সহায়তা করা হয়েছে; যা তাদের জীবনে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলেছে।
পরিবর্তনের এই ইতিবাচক হাওয়া লেগেছে সাধারণ মানুষের ঘরেও। ব্যাপক সচেতনতা কার্যক্রমের ফলে চট্টগ্রাম নগরীর প্রায় ২৫ হাজার পরিবারের মধ্যে ৪০ শতাংশই এখন নিজ উদ্যোগে বর্জ্য আলাদা করে রাখার চর্চা শুরু করেছেন। পরিবেশ রক্ষায় তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করতে গড়ে তোলা হয়েছে ৪১০ সদস্যের একটি স্বেচ্ছাসেবক দল। ১১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বসানো হয়েছে তিন স্তরের বর্জ্য ফেলার পাত্র।
পরিবেশের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাতেও প্রতিষ্ঠানটির অবদান অনস্বীকার্য। নদীমাতৃক এই দেশের দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের জন্য ভাসমান ‘লাইফবয় ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল’-এর মাধ্যমে গত দুই দশকে ১৫ লাখের বেশি প্রান্তিক মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে; যা জনস্বাস্থ্য খাতে এক অভূতপূর্ব অর্জন।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি দেশের টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্র, শিল্প খাত ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। ইউনিলিভার বাংলাদেশ তাদের কাজের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছে, কীভাবে একটি সফল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশ ও মানবতার কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করতে পারে। জনকল্যাণ
ও অংশীদারিত্বের এ অনন্য মডেল আগামী দিনের বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রাকে আরও গতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে।
- বিষয় :
- মুনাফা
