প্রবীণদের জন্য যত্ন আন্তরিকতা
ছবি :: মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান
রিক্তা রিচি
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
একসময় পরিবারের ছায়াবৃক্ষ ছিলেন তারা। সংসারের যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাদের পরামর্শই ছিল শেষ কথা। বিপুল অভিজ্ঞতা আর মূল্যবোধের ধারক হিসেবে পরিবার ও সমাজে তাদের অবস্থান ছিল অনন্য। জীবনের দীর্ঘ সময় যাদের ঘাম ও শ্রমে এ সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মিত হয়েছে, তারাই আজকের প্রবীণ। সময়ের নির্মম বাস্তবতায় আজ বদলে গেছে দৃশ্যপট। যৌথ পরিবারের উষ্ণতা ভেঙে তৈরি হয়েছে ইট-পাথরের যান্ত্রিক একক পরিবার। নগরায়ণ আর প্রযুক্তির অভাবনীয় উৎকর্ষের এই যুগে এসে জীবনের গোধূলি বেলায় অনেক প্রবীণই আজ হয়ে পড়ছেন উপেক্ষিত, নিঃসঙ্গ কিংবা নিদারুণভাবে ‘অপ্রয়োজনীয়’।
জনমিতিক পরিসংখ্যান বলছে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বর্তমানে দেশে প্রবীণ নাগরিকের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটির বেশি, যা ২০৫০ সাল নাগাদ মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশে দাঁড়াবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। প্রবীণের সংখ্যা বাড়লেও তাদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কি ততটা মানবিক হচ্ছে? নাকি একাকিত্ব, অবহেলা আর মানসিক শূন্যতা তাদের প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খাচ্ছে?
প্রবীণদের প্রতি আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই দ্বৈত। একদিকে তাদের সম্মান করার পারিবারিক ও ধর্মীয় শিক্ষা আমাদের মজ্জাগত, অন্যদিকে বাস্তবজীবনে অনেক প্রবীণই অবহেলার শিকার। সমাজের নানা স্তরের মানুষের সঙ্গে কথা বলে এই মিশ্র অভিজ্ঞতার চিত্রই ফুটে ওঠে।
তরুণ প্রজন্মের অনেকেই প্রবীণদের প্রতি সহানুভূতিশীল। ঢাকার একটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী স্বর্ণা আক্তার ইভা জানান, রাস্তায়, সিঁড়িতে বা রাস্তা পারাপারের সময় কোনো প্রবীণকে দেখলে তিনি সাধ্যমতো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। তবে এর উল্টো পিঠও রয়েছে। একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আরেক শিক্ষার্থীর মতে, বর্তমানে প্রতারণার কৌশল বদলেছে। অনেকেই বয়সের দোহাই দিয়ে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করেন। ফলে রাস্তায় কোনো অসহায় প্রবীণকে দেখলেও অনেক সময় প্রতারিত হওয়ার ভয়ে সাহায্যের হাত গুটিয়ে নিতে হয়।
জীবিকার তাগিদে ছুটে চলা মধ্যবিত্তের কাছে প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ববোধ অনেক সময় আক্ষেপ হয়ে দাঁড়ায়। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী মোহাম্মদ ফজলুর রহমান জানান, শহরের যান্ত্রিক ব্যস্ততায় পথেঘাটে সব সময় সাহায্য করা হয়ে ওঠে না। তবে গ্রামে গেলে বা রাস্তায় কোনো বয়স্ক বিক্রেতা দেখলে প্রয়োজন না থাকলেও তিনি জিনিসপত্র কেনেন। রাজধানীর গোলাপবাগের বাসিন্দা আফরোজা খানম এবং মধুবাগ এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বিউটি বেগমের কণ্ঠেও একই সুর। তাদের মতে, প্রবীণরা সারাজীবন সমাজ ও পরিবারের জন্য নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছেন। এখন তাদের সেবা করার সময়। তবে বিউটি বেগম একটি রূঢ় বাস্তবতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন–অর্থনৈতিক টানাপোড়েন থাকলে অনেক পরিবারের পক্ষেই বয়স্ক সদস্যদের যথাযথ দেখভাল করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।
এই অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের নির্মম শিকার রাজধানীর কুনিপাড়া এলাকার মাছ ব্যবসায়ী জলিল মিয়া। ৭০ ছুঁইছুঁই বয়সেও তাঁকে সংসারের ঘানি টানতে হচ্ছে। দুই ছেলের সামান্য আয়ে সংসার চলে না বলে নিজের ওষুধের খরচ জোগাতে এখনও তাঁকে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয়। আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, ‘কারও কাছে হাত পাততে চাই না। তবে শেষ বয়সে একটু নিশ্চিন্তে থাকতে পারলে ভালো লাগত।’
অন্যদিকে, অর্থনৈতিক সচ্ছলতা থাকলেও মানসিক নিঃসঙ্গতার শিকার হন অনেক প্রবীণ। মহানগরের মুদি দোকানি ৬২ বছর বয়সী নওশাদ জামান একসময় বড় পাইকারি ব্যবসা করতেন। এখন সময় কাটাতে নিজের বাড়ির নিচে ছোট একটি দোকান চালান। পরিবার থেকে তিনি অবহেলার শিকার নন; বরং বয়সেরও যে একটি আলাদা সৌন্দর্য আছে, সেটি তিনি বিশ্বাস করেন। তবে তাঁর আক্ষেপ অন্য জায়গায়। তিনি বলেন, ‘আগে পরিবারের সবাই মিলে গল্পগুজব হতো, মতবিনিময় হতো। এখন ছেলেমেয়েরা ঘরে থাকলেও যার যার মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকে।’ এই নীরব বিচ্ছিন্নতা অনেক প্রবীণকেই মানসিকভাবে একা করে দিচ্ছে।
প্রশ্ন হলো–প্রবীণদের এ সুরক্ষার দায়িত্ব কি শুধুই পরিবারের? বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘নিজেরা করি’-এর সমন্বয়কারী খুশী কবির মনে করেন, বয়সের ভারে যখন মানুষের আয় করার সক্ষমতা কমে যায়, তখন সন্তানরাই মা-বাবার দায়িত্ব নেবে–এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সমাজকাঠামো পরিবর্তনের কারণে অনেক পরিবারই এখন সেই দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করতে পারে না।
খুশী কবির বলেন, ‘যখন ব্যক্তি বা পরিবার এই মৌলিক চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই দায়ভার রাষ্ট্রের ওপরই বর্তায়। সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা আরও বাড়িয়ে প্রবীণদের খাদ্য, চিকিৎসা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি প্রতিবেশীদেরও মানবিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। আর্থিকভাবে না হলেও অন্তত একজন প্রবীণের খোঁজখবর নেওয়া বা প্রয়োজনে তাঁকে সরকারি-বেসরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া সমাজের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।’
আমাদের মনে রাখা দরকার, আজকের তারুণ্যই আগামী দিনের প্রবীণ। আজ যদি সমাজ প্রবীণদের জন্য একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কাঠামো তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও তা এক অশনিসংকেত। প্রবীণরা সমাজের বোঝা নন, তারা আমাদের শিকড়। সেই শিকড়কে বাঁচিয়ে রাখার মধ্যেই নিহিত রয়েছে একটি সুস্থ ও মানবিক সমাজের ভিত্তি।
- বিষয় :
- প্রবীণ
