নারী উদ্যোক্তা
শিকড়ের টানে ঐতিহ্যের স্বাদে
নিজের রেস্তোরাঁয় উসাইন্দা মারমা প্রিনি
আহমেদ কুতুব
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা নাম না জানা ঝিরির কলতান, চারপাশের ঘন সবুজ বাঁশবন আর মায়াবী সেগুন গাছের ছায়া–এমন নৈসর্গিক পরিবেশে বসে যদি পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু খাবারের স্বাদ নেওয়া যায়, তবে কেমন হয়? নাগরিক কোলাহল থেকে দূরে, বান্দরবানের লামা উপজেলার কলেজ গেট এলাকায় ঠিক এমনই এক প্রশান্তির আবহে গড়ে উঠেছে ভিন্নধর্মী খাবারের রেস্তোরাঁ ‘চাঃলি কংলি’; যার পেছনের কারিগর হলেন উসাইন্দা মারমা প্রিনি।
পাহাড়ের কোলে বেড়ে ওঠা তরুণী প্রিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর–উভয় পরীক্ষাতেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এটি ২০২৩ সালের কথা। ক্যারিয়ার গড়তে তিনি পাড়ি জমান জাদুর শহর ঢাকায়। যোগ দেন একটি ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ঢাকার যান্ত্রিক জীবন, ট্রাফিক জ্যাম আর কংক্রিটের দেয়াল তাঁকে বেশিদিন বেঁধে রাখতে পারেনি। শেষমেশ ২০২৫ সালের শুরুর দিকে লামায় ফিরে আসেন প্রিনি। স্বামী চাকরি করেন বান্দরবানের রোয়াংছড়ির একটি বেসরকারি সংস্থায়। স্বামীর অনুপ্রেরণা আর নিজের ভেতরের প্রবল ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে একই বছরের ১৯ ডিসেম্বর তিনি শুরু করেন সম্পূর্ণ পাহাড়ি খাবারের ব্যতিক্রমী রেস্তোরাঁ ‘চাঃলি কংলি’। নতুন এক সংগ্রামের পাশাপাশি শুরু হয় তাঁর উদ্যোক্তা জীবন।
মারমা ভাষার শব্দ ‘চাঃলি কংলি’র বাংলা অর্থ হলো, ‘যত খাবেন, তত মজা পাবেন’। রেস্তোরাঁর নামের মতো এর প্রতিটি পরিবেশনায় লুকিয়ে আছে পাহাড়ের আদি ও অকৃত্রিম আতিথেয়তা। এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান শেফ, ব্যবস্থাপক এবং পরিচালক–সবই প্রিনি নিজে।
‘চাঃলি কংলি’ শুধু একটি খাবারঘর নয়, এটি মারমা সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রদর্শনী। প্রতিষ্ঠানটির ইন্টেরিয়র ডিজাইনও করেছেন প্রিনি নিজের হাতে। পাহাড়ের আদি বাসিন্দাদের ভোজনরীতির আদলে সাজানো হয়েছে এর অন্দরমহল। মাটিতে বিছানো পাহাড়ি থামি কাপড়ের ওপর বসে খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে, যার সামনে পাতা থাকে এক ফুট উচ্চতার ছোট্ট টেবিল। ছাদের কাঠামোতে টাঙানো রয়েছে আদি কড়ই গাছের ‘কেওড়া ফলের’ বাকল এবং ছোট ছোট পাহাড়ি টুকরি। সেগুন কাঠ ও বাঁশের নিপুণ ব্যবহারে তৈরি করা হয়েছে পুরো কাঠামো। রেস্তোরাঁর দ্বিতীয় অংশে, ঝিরির ঠিক পাশে রয়েছে একটি ব্যালকনি, যেখানে বসে জলের ঝিরঝির শব্দ শুনতে শুনতে খাবার উপভোগ করার সুযোগ রয়েছে। প্রকৃতিকে বিরক্ত না করে, সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব উপায়ে তৈরি এই রেস্তোরাঁটি দূর থেকে যে কারও নজর কাড়ে।
ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এখন ‘কালিনারি ট্যুরিজম’ বা রন্ধন পর্যটন অত্যন্ত জনপ্রিয়। সেই চাহিদাকে যেন পূর্ণতা দিচ্ছে চাঃলি কংলি। এখানকার মেনুতে রয়েছে পাহাড়ের ২৭ রকমের বৈচিত্র্যময় ও সুস্বাদু পদ। পাহাড়ি মাটির খাঁটি স্বাদ আর জুম চাষের সতেজ চাল থেকে শুরু করে এখানে মেলে পাহাড়ের নিজস্ব সিগনেচার ডিশ।
উসাইন্দা মারমা প্রিনি তাঁর এই যাত্রা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি পাহাড়ের মেয়ে। পাহাড়ের টানেই আবার পাহাড়ে ফিরে এসেছি। নিজের মেধা, যোগ্যতা ও শ্রম দিয়ে চাঃলি কংলি প্রতিষ্ঠা করেছি। পাহাড়ি খাবারের আসল স্বাদ নিতে যে কেউ এখানে আসতে পারেন। নতুন স্বাদের অভিজ্ঞতা নিতে এলে কেউ হতাশ হয়ে ফিরবেন না।’ বর্তমানে তাঁর সঙ্গে কাজ করছেন পাঁচজন কর্মী, আর রেস্তোরাঁর আয় দিয়ে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে চলছে তাদের কার্যক্রম।
প্রিনির এই উদ্যোগ শুধু একটি ব্যবসায়িক সফলতার গল্প নয়; এটি শিকড়ের প্রতি ভালোবাসা, নিজস্ব সংস্কৃতিকে তুলে ধরার প্রয়াস এবং নারীর ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। v
- বিষয় :
- নারী উদ্যোক্তা