ঢাকা রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সই করতে পারা সাক্ষরতা নয়

সই করতে পারা  সাক্ষরতা নয়
×

ছবি:: ওমর ফারুক টিটু

রাশেদা কে চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক, গণসাক্ষরতা অভিযান সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ইউনেস্কোর সাক্ষরতার সংজ্ঞার সঙ্গে বাংলাদেশ একমত পোষণ করেছে। সংজ্ঞাটি সহজ–একজন মানুষ যে কোনো একটি ভাষায় একটি অনুচ্ছেদ পড়তে পারবেন, লিখতে পারবেন এবং বুঝতে পারবেন। তিনটি শর্তের একটিও বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের দেশে অসংখ্য মানুষ কোরআন শরিফ পড়তে পারেন। লিখতে বা অর্থ বুঝতে পারেন না। মুখস্থ করে নিজের নামটা লিখে ফেলা কিংবা সই করতে পারা– এসব আর সাক্ষরতার আওতায় পড়ে না। এটি একটি বৈশ্বিক মানদণ্ড, আমাদেরও সেই মানেই হিসাব কষতে হবে।

সরকারি হিসাবে দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ এখনও নিরক্ষর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রায়োগিক সাক্ষরতা জরিপে হারটি নেমে আসে ৬৩ শতাংশের ঘরে। অর্থাৎ যাদের সাক্ষর দেখানো হচ্ছে, তাদের একটি বড় অংশ পড়ে বুঝতে বা হিসাব কষতে পারে না।

এই যেটুকু অর্জন, তার মূল কৃতিত্ব প্রাথমিক শিক্ষার। যে শিশু প্রাথমিক স্তর শেষ করে, সে অন্তত মাতৃভাষায় মোটামুটি পড়তে, লিখতে ও বুঝতে পারে। প্রাথমিকে ভর্তির হার প্রায় শতভাগ, ছাত্রী-ছাত্রের সমতাও এসেছে–সাক্ষরতার হার বাড়ার হিসাবটা মূলত ওখান থেকে আসছে। বয়সভিত্তিক হিসাবে গেলে ছবিটা বদলে যায়। পঁয়তাল্লিশ, এমনকি পঁয়ত্রিশোর্ধ্ব জনগোষ্ঠীকে ধরলে হার হুড়মুড় করে নামে। কারণ ওই বয়সীদের জন্য আমরা কার্যত কিছু করিনি।

দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকার এসেছে, সরকার গেছে; বয়স্ক ও যুব সাক্ষরতার জন্য নেওয়া হয়েছে কেবল কিছু প্রকল্পভিত্তিক কাজ। উপআনুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো একসময় এসব নিয়ে কাজ করেছে। প্রকল্প শেষ, খবরও শেষ। নতুন প্রকল্প আসতে বছর গড়িয়ে যায়। এর মধ্যে যাদের অক্ষরজ্ঞান দেওয়া হয়েছিল, চর্চার অভাবে তারা সব ভুলে বসে থাকেন। তারা সাক্ষরতা থেকে ঝরে পড়েন। সাক্ষরতা এক-দুই বছরে অর্জনের বিষয় নয়; একটি কর্মসূচি অন্তত পাঁচ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে চালাতে হয়।
সময়সূচিও একটা বড় প্রশ্ন। এ মানুষগুলো দিনের বেলা জীবিকার তাগিদে মাঠে-ঘাটে থাকেন, কেন্দ্রে আসার ফুরসত পান না। যেখানে কেন্দ্রগুলো সন্ধ্যায় চালানো হয়েছে, সেখানে ভালো ফল মিলেছে কিন্তু প্রকল্প ফুরোনোর সঙ্গে সঙ্গে সাফল্যও মুছে গেছে।
পরিসংখ্যানের ভেতরে ঢুকলে বৈষম্যটা আরও স্পষ্ট। নারীর সাক্ষরতার হার পুরুষের চেয়ে কম। শহরের সঙ্গে গ্রামের ব্যবধান ১০ শতাংশের কাছাকাছি। চর, হাওর ও প্রত্যন্ত এলাকার চিত্র দেখলে হার আরও নেমে যায়। ঠিক এখানে বৈষম্যটা প্রকট, দৃশ্যমান।

করণীয় নিয়ে তিনটি কথা বলতে চাই। প্রথমত, মূলধারার শিক্ষা যেহেতু সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে, সেটিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। 
দ্বিতীয়ত, যে জনগোষ্ঠী এখনও সাক্ষরতার আলো পায়নি, তাদের জন্য চাই আলাদা কর্মসূচি। প্রকল্প না–দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি, তা টানা চালাতে হবে। সারাদেশে ঢালাওভাবে নয়, যেসব এলাকায় হার কম, সেই উদ্দিষ্ট এলাকা ও জনগোষ্ঠীকে ধরে। এখানে বেসরকারি সংস্থাকে যুক্ত করা যেতে পারে, তবে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকতে হবে। আগের ‘সাক্ষরতা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প’-এ যাদের কাজের এলাকা গাজীপুরে, তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে উত্তরবঙ্গে। অভিযোগ এসেছে, কোনো আমলার স্ত্রী নতুন এনজিও খুলেছেন, দায়িত্বও পেয়ে গেছেন তিনি। রাতারাতি গজানো সংস্থা কিংবা যারা জীবনে শিক্ষা কর্মসূচি চালায়নি, বিশেষত ক্ষুদ্রঋণনির্ভর সংস্থা–তাদের দিয়ে এ কাজ হয় না।
আমাদের প্রস্তাব ছিল, সরকারের নিজস্ব স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান পিকেএসএফ তিনশরও বেশি সংগঠন নিয়ে কাজ করে; যাচাই করে সেখান থেকে দায়িত্ব দেওয়া যেত। গণসাক্ষরতা অভিযানের নিজস্ব ডেটাবেজ আছে–কোথায় কারা কাজ করছে, কার কী দক্ষতা, সব তথ্য সেখানে মেলে। এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট আহ্বান করে প্রাথমিক বাছাইয়ের পর তালিকাটি মতামতের জন্য আমাদের বা পিকেএসএফের কাছে পাঠানো যেত। 

তৃতীয়ত, তদারকি। বাংলাদেশে নিয়মিত মনিটরিং না থাকলে কোনো কাজ ঠিকমতো হয় না। আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন দিয়ে এ তদারকি হবে না। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কিংবা এলাকার কোনো অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে নিয়ে এলাকাভিত্তিক কমিটি গড়ে দিলে কাজ হয়– আমাদের হাতে সফল মডেল আছে।
আমাদের কমিউনিটি এডুকেশন ওয়াচ গ্রুপ ৪৫টি ইউনিয়নে কাজ করছে; ঝরে পড়া বহু শিশুকে স্কুলে ফিরিয়ে এনেছে। একটি ঘটনা বলি। এক এলাকায় প্রধান শিক্ষক মাঝিকে নদী পার করে দিতে বললেন। মাঝি সাফ জানিয়ে দিলেন, ‘স্যার, আমি আপনাকে পার করব না।’ শিক্ষক অবাক হয়ে কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘আমার বউ ওয়াচ গ্রুপের মেম্বার, ছেলে আপনার স্কুলে পড়ে। আপনি নাকি কোনোদিন এগারোটার পর স্কুলে থাকেন না!’ শিক্ষক লজ্জা পেয়ে ফিরে গেলেন। সরকার কি একা এমন কাজ পারত? পারত না।
শুধু পুঁথিগত সাক্ষরতায় কাজ হবে না। তারা শ্রমজীবী মানুষ। কারিকুলাম তাদের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে মেলাতে হবে। কৃষক হলে ফসলের দরকারি তথ্য, মৎস্যজীবী হলে তার পেশার বিষয়গুলো পড়ার সামগ্রীতে থাকতে হবে। একে ট্রেড কোর্স বলব না, কিন্তু জীবিকার প্রশ্নটা বাদ দিলে কেবল ‘অ, আ, ক, খ’ কিংবা বিশিষ্টজনের জীবনী পড়ে তাদের লাভ নেই। মাঠের বাস্তবতা বুঝে কর্মসূচি সাজাতে হবে। 

আরও পড়ুন

×