ঢাকা রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস

টিকে থাকতে চাওয়া মেয়েরা

টিকে থাকতে চাওয়া মেয়েরা
×

অলংকরণ:: বোরহান আজাদ

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) হিসাবে, দেশে নারীর আত্মহত্যার ঘটনা জুনে ছিল ১৭টি, জুলাইয়ে ২৮, আগস্টে ৩৯–দুই মাসে যথাক্রমে ৬৫ ও ৩৯ শতাংশ বৃদ্ধি। এমএসএফের প্রতিবেদন অনুসারে, এই উচ্চহার সামাজিক নিপীড়ন ও বিচারহীনতার মানসিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে; ধর্ষণ বেড়ে যাওয়াকেও তারা দেখছে নারী ও শিশুর নিরাপত্তাহীনতার ইঙ্গিত হিসেবে। নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের বাস্তব অবস্থা, আত্মহত্যার কারণ ও সমাধানের পথ অনুসন্ধান করে লিখেছেন শাহেরীন আরাফাত

ফিরে আসার দুটি ঘটনা
বিয়েটি টেকেনি। দুই সন্তানের দায় স্বামী নেননি। উল্টো সন্তানসহ তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। ভাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় জুটেছিল, স্বস্তি জোটেনি। ‘তালাকপ্রাপ্ত’ তকমাটা সেঁটে গিয়েছিল স্থায়ীভাবে। অপমান জমতে জমতে এক রাতে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। ঠিক তখন দুই ছেলে এসে জড়িয়ে ধরে তাঁকে।
তারপর একটি সংস্থা থেকে সামান্য পুঁজি। সেলাই তিনি জানতেন। কাপড়ে নকশা, ছোট ব্যবসা, তারপর নিজের প্রতিষ্ঠান; যেখানে এখন অনেক নারীর কাজ জোটে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় তাঁকে সফল উদ্যোক্তার সম্মাননা দিয়েছে। গল্পটা বলতে গিয়ে এক জায়গায় তিনি থেমে গিয়েছিলেন, ‘সেদিন ছেলেরা জড়িয়ে না ধরলে আজ আমি এই পৃথিবীতে থাকতাম না।’
ফরিদপুরের সানজিদা (ছদ্মনাম) কথা বলেছেন পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে। তাঁর বিয়ে হয়ে যায় এসএসসি পরীক্ষার পরপরই। কলেজে আর যাওয়া হয়নি; সংসার পাতেন রাজধানীর কদমতলীতে। তিন বছরের সংসারে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের হাতে অনেকবার মারধরের শিকার হয়েছেন; দুবার হাসপাতালে যেতে হয়েছে। স্বামী জড়িয়েছিলেন অন্য সম্পর্কে–প্রশ্ন করলে মার জুটত তাঁর হাতেও। একপর্যায়ে সানজিদা নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন। প্রাণ বেঁচেছে, সংসার বাঁচেনি। বাবার বাড়িতে ফিরে দেখলেন, সেখানেও অপেক্ষা করছে আরেক রকম শাস্তি–লোকের কথা।
সানজিদা এ প্রতিবেদককে জানান, এখন তিনি ঢাকায় একটি সংস্থার সহযোগিতায় শিশুদের স্কুলে পড়ান, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলেজে ভর্তি হয়েছেন, থাকেন একটি হোস্টেলে। লোকের কথা থামেনি। সানজিদাও থামেননি।
ফিরে আসার এমন গল্প আমাদের হাতে কম। হিসাবটা উল্টোদিকেই ভারী।

সংখ্যাটা কত বড়, কেউ ঠিক জানে না
পুলিশের নথি বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৪–এই পাঁচ বছরে দেশে আত্মহত্যায় মারা গেছেন ৭৬ হাজার ৩৬১ জন। ভেঙে দেখলে দাঁড়ায়, প্রতি ৩৫ থেকে ৪০ মিনিটে একজন। অথচ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১ সালের অনুমান ছিল ৪ হাজার ৭১৪। একই বছর পুলিশের নথিতে ১৫ হাজার ৫০। মাঝখানে হারিয়ে যায় বিপুল সংখ্যা– লোকলজ্জায় পরিবার চেপে যায়, থানায় খবর যায় না। আইসিডিডিআর,বির গবেষক আনীকা তাসনিম হোসেনের কথায়, ‘আত্মহত্যা বললে আইনি ঝামেলা পোহাতে হয়।’ যে সমস্যার আকার জানা নেই, তার নীতি দাঁড়াবে কিসের ওপর?
ঝিনাইদহে সরেজমিন পাওয়া চিত্রটা আরও ভয়াবহ। মানবাধিকার সংগঠন আরডিসির হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জেলাটিতে আত্মহত্যায় মারা গেছেন ১৮৯ জন; আগের বছরের একই সময়ে ১২৫। এই ১৮৯ জনের ৯৭ জন নারী।

কারণ কী? সিভিল সার্জন ডা. মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘এখানকার মানুষ অনেকটা আবেগপ্রবণ।’ সমাধান হিসেবে চান সামাজিক সচেতনতা আর কাউন্সেলিং বাড়ানো। ব্যাখ্যাটা আঙুল তুলে ব্যক্তির স্বভাবের দিকে। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অন্য কথা বলেন।
মেয়েশিশুকে ছোটবেলা থেকে শেখানো হয়– ‘তুমি মেয়ে; বাইরে কম যেয়ো; নরম থেকো, চুপ থেকো।’ বোঝার আগে সে নিজেকে দ্বিতীয় সারির মানুষ ভাবতে শেখে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় বাল্যবিবাহ। ইউনিসেফ, ইউএন উইমেন ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের যৌথ প্রতিবেদন বলছে, দেশে ২০-২৪ বছর বয়সী নারীর ৫১ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর হওয়ার আগে। বিয়ের পর মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতেও অনুমতি লাগে অনেক ঘরে। চাকরি করবেন কী করবেন না, সে সিদ্ধান্তও প্রায়ই নেন অন্যরা।

বিষণ্নতা সবচেয়ে বড় কারণ
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৮-১৯ সালের যৌথ সমীক্ষা বলছে, প্রাপ্তবয়স্কদের ১৭ শতাংশ গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন–নারী ১৯, পুরুষ ১৫ শতাংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল চৌধুরীর মতে, এককভাবে সবচেয়ে বড় কারণ বিষণ্নতা। ‘এটি কোনো ব্যক্তির দায় নয়’ বলছিলেন তিনি। সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারিবারিক নির্যাতন আর সামাজিক নিরাপত্তার অভাব। বিচ্ছেদের পর ঝুঁকি বাড়ে সবচেয়ে বেশি–বাবার বাড়িতে ফেরার পথ প্রায়ই বন্ধ, দোষটাও চাপে নারীর ঘাড়ে।
সহিংসতার নতুন চেহারাটা অনলাইনে। সম্মতি ছাড়া ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় দিনাজপুরে একই পরিবারের কিশোরী আর তার মা–দুজনকেই হারিয়েছে পরিবার। রাজধানীতে এক তরুণ রাজনৈতিক সংগঠক ধর্ষণ ও হত্যার হুমকির মুখে থানায় জিডি করেছিলেন। সুরক্ষা মেলেনি, মাসখানেক পর আসে তাঁর মৃত্যুর খবর। হয়রানির শিকার নারীর দিকে যখন আঙুল ওঠে, চাপটা অসহনীয় হয়ে দাঁড়ায়।

মাটি সরে যাচ্ছে পায়ের নিচ থেকে
চাপের আরেকটা স্তর অর্থনৈতিক। তৈরি পোশাক খাতে নারী শ্রমিকের সংখ্যা দ্রুত কমছে। দক্ষতার প্রশ্ন এলে অগ্রাধিকার পান পুরুষরা। কারখানা বন্ধ হলে গ্রামে ফেরা নারীর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাজের দরজা আর খোলা থাকে না, রাষ্ট্রের হাতে বিকল্প পরিকল্পনাও নেই। আর্থিক নির্ভরশীলতা বাড়লে ঘরের নির্যাতনও মেনে নিতে হয়।

ভুক্তভোগী অপরাধী নয়
দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারা এখনও আত্মহত্যার চেষ্টাকে অপরাধ গণ্য করে। ১৭১টি দেশের গবেষণা বলছে, চেষ্টাকে অপরাধ ধরলে প্রবণতা উল্টো বাড়ে। শ্রীলঙ্কা ও সিঙ্গাপুরে সরে আসার পর সংখ্যা কমেছে। গত ২৩ আগস্ট ‘লাইভ লাইফ’ প্রকল্পের এক সভায় এমন সুপারিশও উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন ও গবেষণা) অধ্যাপক ফোয়ারা তাসমিম বলেন, ‘আত্মহত্যার চেষ্টাকে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যায় কিনা, সে বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে। বাদ যদি না-ও দেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে আইন সংস্কার করতে হবে।’
জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ পরিকল্পনা ২০২৬-২০৩০ এখন খসড়া পর্যায়ে; ঝিনাইদহের শৈলকুপাসহ চার উপজেলায় চলছে পাইলট প্রকল্প। হাসপাতাল, থানা আর কমিউনিটি–তিন উৎসের তথ্য মিলিয়ে নির্ভরযোগ্য জাতীয় ডেটাবেজ দাঁড় করানো এখন সবচেয়ে জরুরি।

কামাল চৌধুরীর প্রস্তাব বাস্তবসম্মত–প্রতিটি উপজেলায় প্রশিক্ষিত কমিউনিটি মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করা হোক। সঙ্গে চাই ২৪ ঘণ্টার হটলাইন। কারণ গবেষণা বলছে, বেশির ভাগ ঘটনা ঘটে রাতে। ‘অনেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও একটু স্বস্তির আশায় একটা ফোন করতে পারেন’ বলছিলেন তিনি। ‘সেই একটা ফোন কলই হয়তো তাঁকে ফিরিয়ে আনবে।’
আরডিসির নির্বাহী প্রধান মো. আব্দুর রহমানের কথায়, সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম না নামলে সচেতনতা কাগজে থেকে যাবে।
১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। এবারের ডাক–কথা শুরু করুন। হোস্টেলের ঘরে বসে সানজিদা বলছিলেন, ‘জীবন যেমনই হোক। আমি শুধু টিকে থাকতে চাই।’ প্রশ্নটা তাই নয় যে কতজন চলে যাচ্ছেন। প্রশ্নটা হলো, টিকে থাকতে চাওয়া মানুষগুলোর পাশে আমরা সময়মতো দাঁড়াতে পারছি কিনা।  

আরও পড়ুন

×