ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

নারী উদ্যোক্তা

টিপের বাক্স থেকে

টিপের বাক্স থেকে
×
×

 রিক্তা রিচি

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৯ | আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১৪:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

কপালের ছোট্ট একটা টিপ। দাম কয়েক টাকা। অনেকে একে সাজের সামান্য অনুষঙ্গের বেশি কিছু ভাবেন না। নওরিন আক্তার ভেবেছিলেন অন্যভাবে। সেই ভাবনা থেকে গড়ে উঠেছে তাঁর উদ্যোগ ‘সারানা’। শুরু হয়েছিল টিপ দিয়ে। এখন সেখানে আলতা, কুমকুম, কাচের চুড়ি আর পলা জায়গা পেয়েছে।

জীবনের মানে সবার কাছে এক নয়। কেউ সংসার আর চাকরির নিয়মে স্বস্তি খোঁজেন। কেউ চান নিজের হাতে নিজ পরিচয় গড়তে। নওরিন দ্বিতীয় দলের মানুষ। ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন। ভ্রমণের খরচ জোগাতে চাকরির পাশাপাশি বাড়তি আয়ের পথ খুঁজছিলেন। বেছে নিলেন শৈশবের প্রিয় দুটি জিনিস– টিপ আর ছিমছাম হাতের গহনা। তাঁর বিশ্বাস, যে পণ্যের প্রতি নিজের টান আছে, ব্যবসা হওয়া উচিত তা নিয়ে। অন্যের দেখাদেখি শুরু করলে আগ্রহ বেশি দিন টেকে না।

ঢাকায় জন্ম, ঢাকাতেই বেড়ে ওঠা। স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতক। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে টেলিভিশন ও ফিল্মে স্নাতকোত্তর। সাংবাদিকতার সূত্রেই একদিন মুখোমুখি হন ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেলের। তাঁর পেইন্টেড টিপ নওরিনকে আগেই টেনেছিল। সাক্ষাৎকারে জানতে চেয়েছিলেন, তাঁর কাজ দেখে অন্যরা টিপে নকশা করছেন– বিষয়টা তিনি কীভাবে দেখেন। বিবি রাসেল খুশিই হয়েছিলেন। বলেছিলেন, কেউ তাঁর কাজ থেকে প্রেরণা নিয়ে নিজের মতো নতুন কিছু বানালে সেটা আনন্দের। এই কথাটা নওরিনের সাহস বাড়িয়ে দেয়।

মোড় ঘোরে প্রায় এক দশক আগে। টিপে নকশা করতে গিয়ে নানা মাপের টিপ হাতের কাছে পাওয়া যেত না। কাজের সুবিধার জন্য একটা বড় অর্গানাইজার বাক্সে মাপ অনুযায়ী টিপ সাজিয়ে রাখেন। রঙিন খোপগুলোর ছবি তুলে নিজের ফেসবুক পেজে (সারানা) পোস্ট করেন। নাম দেন ‘আ বক্স অব লাভ’। রাতের মধ্যে ছবিটা ছড়িয়ে পড়ে। অসংখ্য মানুষ বাক্সটা কিনতে চান। বিক্রির কোনো পরিকল্পনা ছিল না। শেষে অল্প লাভ রেখে বিক্রি শুরু করেন। চাহিদা বাড়ায় গহনা থেকে মনোযোগ সরে আসে টিপে।

নকশা করা টিপের সঙ্গে আসে নানা রকম প্লেইন টিপের বাক্স। পুঁজি এসেছে বেতন থেকে। কোনো মাসে ১০ হাজার, কোনো মাসে ১৫ হাজার টাকা ব্যবসায় ঢেলেছেন।

শুরুটা মসৃণ ছিল না। এক বাক্স টিপের দাম এত কেন– এই প্রশ্ন আর কটূক্তি শুনতে হয়েছে বারবার। টিপ মানে সস্তা জিনিস– এ ধারণা ভাঙাই ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজ। তিনি চেয়েছেন টিপ শৌখিন অনুষঙ্গের মর্যাদা পাক।

এখন টিপে রঙের কাজের সঙ্গে কুন্দন, স্টোন আর মেটালের ব্যবহার হয়। উপকরণ আসে নানা দেশ থেকে। কিছু পলা আমদানি করা, কিছু তৈরি হয় নিজেদের নকশায়। নকশায় বারবার ফিরে আসে বাঙালির চেনা প্রতীক। কখনও কলকার নকশা, কখনও ইলিশের অবয়ব। ঐতিহ্যকে নতুন চোখে দেখানোই সারানার টিপের আকর্ষণ।

টিপ এ দেশে শুধু সাজ নয়। ২০২২ সালে রাজধানীতে টিপ পরার কারণে এক কলেজ শিক্ষক হেনস্তার শিকার হলে দেশজুড়ে প্রতিবাদ হয়েছিল। অনেক নারী-পুরুষ কপালে টিপ পরে ছবি দিয়েছিলেন। তখন স্পষ্ট হয়েছিল, কপালের এ ছোট্ট বিন্দুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নারীর নিজের পছন্দে বাঁচার অধিকার। সেই টিপ ঘিরেই একজন নারী দাঁড় করিয়েছেন নিজের ব্যবসা।

সারানার সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত আছেন ১০-১২ জন। ঢাকায় দুটি আর চট্টগ্রামে একটি অফলাইন কর্নার আছে। অনলাইনে টিপের মাপ ঠিকমতো বোঝা যায় না বলে অনেক ক্রেতা কর্নারে এসে দেখে কেনেন।

নতুনদের জন্য নওরিন বলেন, উদ্যোক্তা হওয়া এক জিনিস; বছরের পর বছর টিকে থাকা আরেক জিনিস। কম দামে বিক্রি করা সাফল্যের পথ নয়। সফল হতে লাগে নিজের আগ্রহ, খাটুনির মন আর ধাক্কা সামলানোর প্রস্তুতি।

আরও পড়ুন

×