জলবায়ুর অভিঘাত
নারী শ্রমিকের লড়াই
অলংকরণ:: শেখ শাহাদ
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৩ | আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
আকাশ থেকে নামছে তাপপ্রবাহ; কারখানার মেঝে থেকে উঠছে বয়লারের আঁচ। দুইয়ের মাঝখানে আটকে আছেন দেশের পোশাক খাতের নারী শ্রমিকরা। তাপে অনিয়মিত হচ্ছে মাসিক; ঝুঁকিতে পড়ছে গর্ভের সন্তান। টার্গেটের চাপে বাড়ছে হয়রানি। অর্ধেকের বেশি শ্রমিক মাতৃত্বকালীন পূর্ণ সুবিধা পান না। এর ওপর যন্ত্র এসে কেড়ে নিচ্ছে হাতের কাজ। জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে বড় দাম শোধ করছে নারীর শরীর। অথচ নীতির খাতায় সেই হিসাব নেই। লিখেছেন শাহেরীন আরাফাত
---------------------------------------------
টঙ্গীর একটি সাততলা কারখানার একেবারে ওপরতলায় কাজ করেন ফারহানা (ছদ্মনাম)। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর– সব পাখা ঘুরলেও বাতাস ঠান্ডা হয় না। জুন মাসে প্রায় রোজ তাঁর ফ্লোরে কেউ না কেউ মাথা ঘুরে পড়ে যান। কয়েক বছর ধরে এটা প্রায় সাধারণ চিত্র। গাজীপুরের এক কারখানার শ্রমিক সাহিদা (ছদ্মনাম) বলেন, বেলা বাড়লে ওই ভবন তপ্ত উনুন মনে হয়। পাশের কারখানার ট্রেড ইউনিয়ন নেত্রী হালিমা (ছদ্মনাম) জানালেন, বছর তিনেক আগেও তাদের কারখানায় নিরাপদ খাওয়ার পানি ছিল না। অনেকে একসঙ্গে বেহুঁশ হওয়ার পর স্যালাইন আর ঠান্ডা পানির ব্যবস্থা করা হয়। এই উনুনে যারা বসে থাকেন, তাদের বড় অংশই নারী।
কারখানা আর ঘরের টিনের চাল
পোশাক কারখানা চলে গ্যাসের বয়লারে। ডায়িং, ওয়াশিং, আয়রনের তাপ ছড়িয়ে পড়ে শ্রমিকের গায়ে। গ্যাস না থাকলে চলে ডিজেল জেনারেটরে। ম্যাপড ইন বাংলাদেশের জরিপে দেখা যায়, রপ্তানিমুখী কারখানার বিদ্যুতে সৌরশক্তির ভাগ মাত্র ৩ শতাংশ। বাইরে বাড়ছে জলবায়ুর উত্তাপ, ভেতরে জ্বলছে বয়লার। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫ সালের গবেষণা অনুসারে, ৮৭ শতাংশ পোশাক শ্রমিক হিট স্ট্রেসে ভোগেন। বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির (বিসিডব্লিউএস) জরিপে এই হার ৯৮ শতাংশ।
ছুটির পরও নারীর মুক্তি নেই। ঢাকার টিনের চালের বস্তিতে তাপমাত্রা আশপাশের চেয়ে ১২ ডিগ্রি পর্যন্ত বেশি। কারখানা থেকে ফিরে সেই ঘরে চুলার পাশেই দাঁড়াতে হয় অনেক নারীকে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সময় ব্যবহৃত জরিপ ২০২১ বলছে, একজন নারী দিনে গড়ে প্রায় ৬ ঘণ্টা মজুরিহীন গৃহস্থালি ও পারিবারিক যত্নের কাজ করেন; পুরুষের ক্ষেত্রে তা ১ ঘণ্টারও কম। কারখানার ৮-১০ ঘণ্টার সঙ্গে এই ৬ ঘণ্টা যোগ হলে বিশ্রাম বলে কিছু থাকে না। বিদ্যুৎ সংকটে এ সমস্যা আরও বাড়ে। প্রায় নির্ঘুম রাত শেষে ভোরে আবার কারখানার লাইনে দাঁড়াতে হয়।
শরীরের যে হিসাব খাতায় ওঠে না
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি চার নারী শ্রমিকের একজনের মাসিক অনিয়মিত। ১৭ শতাংশ বলেছেন গর্ভপাতের ঝুঁকির কথা; ১০ শতাংশ গর্ভকালীন জটিলতার কথা। গরম আর রাসায়নিকের যুগল চাপে বন্ধ্যত্বের আশঙ্কা জানিয়েছেন ১৪ শতাংশ।
ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে (বিএমজে) ২০২০ সালে প্রকাশিত অনেক দেশের গবেষণার সমন্বিত বিশ্লেষণ: তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি বাড়লে অকাল প্রসবের ঝুঁকি বাড়ে ৫ শতাংশ; তাপপ্রবাহের দিনে ১৬ শতাংশ। মৃত সন্তান প্রসবের ঝুঁকিও প্রতি ডিগ্রিতে বাড়ে ৫ শতাংশ। কারখানা ও জলবায়ু বিপর্যয়ের তাপ ঢুকছে গর্ভের শিশুর শরীরেও।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বলছে, পোশাক খাতের ২৪ শতাংশ শ্রমিক ইচ্ছা করে কম পানি খান। কারণ শৌচাগার নোংরা, নয়তো দূরে। এতে বাড়ে পানিশূন্যতা আর হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি। মাসিকের দিনে পরিচ্ছন্ন শৌচাগার না পেলে সংক্রমণ হতে পারে। একই গবেষণায় দেখা গেছে, চট্টগ্রামের ৮ শতাংশ নারী শ্রমিক মূত্রনালির সংক্রমণের কথা জানিয়েছেন। শৌচাগার এখানে সুবিধাজনক নয়, যা নারীর স্বাস্থ্যের প্রথম শর্ত।
সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের রাজেকুজ্জামান রতন জানান, কোনো কোনো কারখানা পানির বদলে সামান্য কিছু টাকা ধরিয়ে দেয়। পানি আর স্যালাইন শ্রমিক কেনেন নিজের পয়সায়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীর কথায়, ‘কোনো মানুষ বা শ্রমিককে অস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যহানি এবং রোগাক্রান্ত হওয়ার পথে ঠেলে দেওয়ার অধিকার কারও নেই।’
টার্গেট, গরম আর সুপারভাইজারের মুখ
গরমে উৎপাদন অনেক কমেছে বলে যারা জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে নারীর হার পুরুষের চেয়ে ১৭ শতাংশ বেশি। টার্গেট না মিললে চাপ নামে লাইনের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির ওপর। বিশ্বব্যাংক ২০২৬ সালের গবেষণায় তাপজনিত চাপের সঙ্গে নারী শ্রমিকের ওপর সহিংসতা ও হয়রানি বাড়ার সম্পর্ক পেয়েছে। বিসিডব্লিউএসের জরিপে ৮০ শতাংশ নারী শ্রমিক লিঙ্গভিত্তিক হয়রানির কথা বলেছেন। ৩৯ শতাংশের কারখানায় অভিযোগের ব্যবস্থাই নেই। বছিলার এক নারী শ্রমিক প্রচণ্ড গরমে একটু কম কাজের অনুরোধ করায় সুপারভাইজার অশালীন কথা বলেন। প্রতিবাদ করলে চাকরি খাওয়ার হুমকি দেন।
ইউনিভার্সিটি অব সিডনির গবেষকরা গবেষণাগারে ঢাকার কারখানার গরম তৈরি করে দেখেছেন, সাদা প্রতিফলক ছাদ তাপ আড়াই ডিগ্রি কমায়; পাখা আর পানি কর্মক্ষমতা ফেরায় (ল্যানসেট প্ল্যানেটারি হেলথ, ২০২৫)। কিন্তু এসব ব্যবস্থা পুরুষের ক্ষেত্রে বেশি কাজ করেছে। নারীর শরীর আর কাজের ধরন আলাদা করে না ভাবলে একই সমাধান নারীকে সমান সুরক্ষা দেবে না।
এমন ঘটনার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ দেখা গেল গত ১৬ অক্টোবর (শুক্রবার) আশুলিয়ার এক পোশাক কারখানায়। ছুটির দিনেও আশুলিয়ার এক পোশাক কারখানায় উৎপাদন চলছিল। অসুস্থ শ্রমিক সুমি আক্তার মিশু (২৬) ছুটি চেয়েও পাননি। মানবসম্পদ বিভাগ জানায়, তিনি ফ্লোরে মাথা ঘুরে পড়ে যান। কারখানার মেডিকেল সেন্টার থেকে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। শ্রমিক নেতা খাইরুল মামুন মিন্টুর অভিযোগ, সিসিটিভি ফুটেজ ও সহকর্মীদের ভাষ্যে দেখা যায়, ছুটির সময় পেরোনোর পরও অসুস্থ শরীরে তাঁকে কাজ করতে হয়েছে। এক কর্মকর্তা তাঁকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনও করেন।
চিকিৎসার বাড়তি খরচ, ঝুঁকিতে মাতৃত্ব
করনেল গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের হিসাবে গ্রীষ্মের খরতাপের সময়ে একজন শ্রমিকের ওষুধ আর বাড়তি বিদ্যুৎ বিলে যায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা, যা গড় ঘর ভাড়ার ৬১ শতাংশ। অসুখে মাসে গড়ে তিন দিন কামাই হলে কাটা যায় আরও এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা। এই টাকা জোগাতে অনেকে চড়া সুদে ধার করেন।
মাতৃত্বকালীন সুবিধার আওতায় আছেন মাত্র ৪৮ শতাংশ শ্রমিক। শেফালির (ছদ্মনাম) ছেলের বয়স তখন ৪১ দিন। শাশুড়ির কোলে তাকে রেখে কাজে ফেরেন তিনি। ‘সেই যে ডিউটি শুরু করেছি, আজও চলছে। কখনও বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পাইনি’– বলেন শেফালি। শ্রম আইনের ৪৬ ধারায় প্রসূতি কল্যাণ ছুটি ১২০ দিন মজুরিসহ। শেফালির কাগজে ছুটি ছিল ১১২ দিন, ফিরেছেন ৯০ দিনের আগেই।
রুমার (ছদ্মনাম) কারখানায় ছুটি মেলে, টাকা মেলে না। ‘কারখানা কয়েক মাস বন্ধের পর আবার খুলেছে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর। খোলার পর আর কাউকে মাতৃত্বকালীন ছুটির টাকা দেওয়া হয়নি’– বলেন তিনি। গ্যাস সংকটে গত তিন বছরে প্রায় ৪০০ কারখানা বন্ধ হয়েছে। কারখানা বন্ধ হলে এ সুবিধাই আগে কাটা যায়। সন্তান জন্মের আগে-পরে চাকরি হারানো নারীর কাছে জ্বালানি সংকট তখন বেঁচে থাকার লড়াই।
রূপান্তরের দরজার বাইরে নারী
এক শ্রমিক নেতা জানান, এমন যন্ত্র এসেছে, যা ১০০ জনের কাজ করে, চালাতে লাগে দুজন। অটোমেশিনের প্রথম আঘাত পড়ছে সেলাই, ফিনিশিং, কোয়ালিটি সেকশনে, যেখানে নারী সবচেয়ে বেশি। বিআইডিএসের গবেষণায় পোশাক খাতে নারীর ভাগ ২০১৪ সালের ৫৬ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে নেমেছে ৫৩ শতাংশে। কারণের তালিকায় যান্ত্রিকীকরণ স্পষ্ট।
অথচ সৌর প্যানেল দেখাশোনা, আধুনিক বয়লার চালানোর মতো নতুন কাজ প্রায় পুরোটাই পুরুষের দখলে। কারণ নারীর অক্ষমতা নয়; প্রশিক্ষণের দরজা নারীর জন্য খোলা হয়নি। জাহাঙ্গীরনগরের জরিপে দেখা যায়, ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর কথাটা জানেন ২০ শতাংশেরও কম শ্রমিক। তবে বুঝিয়ে বলার পর ৮২ শতাংশ একে নিরাপদ চাকরি আর নতুন দক্ষতার সুযোগ হিসেবে দেখেছেন।
অক্সফাম ইন বাংলাদেশের ড. মোহাম্মদ এমরান হাসান ন্যায্য রূপান্তরের চার স্তম্ভের কথা বলেন– স্বীকৃতি, অংশগ্রহণ, সুফলের ন্যায্য বণ্টন ও ক্ষতিপূরণ। যন্ত্র এনে কাউকে সরাতে হলে এমন ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, যেন বাকি জীবন সম্মানের সঙ্গে চলা যায়। এর প্রথম দাবিদার নারী শ্রমিক।
মালিকপক্ষ কী বলছে
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সৌরবিদ্যুতে কর ছাড়কে স্বাগত জানালেও ছোট ও মাঝারি কারখানার ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতাকে মূল সংকট হিসেবে দেখেন। ক্রেতাদের নিয়ে তাঁর অভিযোগ, ‘তাদের দিক থেকে কোনো আর্থিক সহযোগিতা আমরা এখনও পাইনি। আশ্বাসও পাইনি।’ সেই চাপ শেষে নামে শ্রমিকের ঘাড়ে।
যা করতেই হবে
শ্রম আইনে কারখানার সর্বোচ্চ তাপমাত্রার সীমা বাঁধতে হবে। নিরাপদ পানি, ছায়াযুক্ত বিশ্রামের জায়গা আর নারীবান্ধব শৌচাগার হতে হবে মালিকের আইনি দায়। তাপপ্রবাহের দিনে অন্তঃসত্ত্বা শ্রমিককে কম তাপের কাজে সরাতে হবে। কারখানা বন্ধ হলেও মাতৃত্বকালীন সুবিধা থামানো যাবে না। গরমে অসুস্থতার হিসাব কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরকে রাখতে হবে নারী-পুরুষ আলাদা করে।
সৌর রক্ষণাবেক্ষণ আর বয়লার চালানোর প্রশিক্ষণে নারীর জন্য নির্দিষ্ট আসন লাগবে। সেই সঙ্গে হয়রানিবিরোধী কমিটি সচল করতে হবে। স্ট্যান্ড আর্থ, অক্সফাম ও বিসিডব্লিউএসের রোডম্যাপে এ প্রসঙ্গে বলা হয়, অভিযোজনের খরচ ধরতে হবে প্রতিটি অর্ডারের দামে, দিতে হবে ব্র্যান্ডকে। রূপান্তর তদারকির জাতীয় কমিটিতে যুক্ত করতে হবে নারী শ্রমিকের প্রতিনিধি; নিজের কথা নিজে বলতে। কার্বন কমানোর বিল যেন নারীর শরীর আর মজুরি থেকে কাটা না হয়। সেলাই মেশিনের পাশে ঘামে ভেজা যে নারী দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁকে বাদ দিয়ে কোনো রূপান্তর সবুজ হয় না; ন্যায্যও হয় না।
- বিষয় :
- নারী
- শাহেরীন আরাফাত
- নারী শ্রমিক
- জলবায়ু সংকট