ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

স ম সা ম য়ি ক

আইন হাতে তুলে নেওয়া: অপরাধের পুনরাবৃত্তি

আইন হাতে তুলে নেওয়া: অপরাধের পুনরাবৃত্তি
×
×

অলংকরণ:: বোরহান আজাদ

মো. রাশেদুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫১ | আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮:০৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ‘নো মোর সাইলেন্স’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপ বিভিন্ন সংবাদ ও আলোচিত ঘটনার পোস্টে নারীদের নিয়ে অশালীন মন্তব্য করা ব্যক্তিদের ছবি, নাম-পরিচয় ও ফেসবুক আইডির লিঙ্ক প্রকাশ করছে। ফেসবুকে এমন আরও কিছু গ্রুপ সক্রিয়। গ্রুপটির ভাষ্য, কিছু ঘটনায় কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অভিযুক্তদের সতর্ক করা হয়েছে। তবে ভুল ব্যক্তিকে চিহ্নিত করার নজিরও এর মধ্যে সামনে এসেছে। আইন ও বিচারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচার প্রক্রিয়া ছাড়া কারও ব্যক্তিগত তথ্য জনপরিসরে প্রকাশ করা আরেক ধরনের মব সংস্কৃতির জন্ম দিতে পারে।
---------------------------------------------

আজ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ একই সামাজিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে। যে কোনো প্রচারিত বা প্রকাশিত খবরই হোক না কেন; প্রতিটির ক্ষেত্রেই অসংখ্য মন্তব্য দেখা যায়। প্রত্যেকে নিজের বোঝাপড়া থেকে দুকথা লিখে দিচ্ছেন। কিন্তু সেই মন্তব্য কাকে কতটা আঘাত করবে, এই বোধ আমাদের সমাজে এখনও অনেকের মাঝে তৈরি হয়নি। 

আমাদের এখন দুটো জীবন। একটা বাস্তবিক, আরেকটা ভার্চুয়াল। বাস্তবে কথা বলার যে শিষ্টাচার; ভার্চুয়াল জীবনেও তা মেনে চলা আবশ্যক। এর দায় যেমন শিক্ষাব্যবস্থার, তেমনি সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদেরও। অথচ এ জাতীয় সচেতনতার জন্য বড় কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। আমাদের অনেক আইন রয়েছে, কিন্তু তার বাস্তবিক প্রয়োগ তেমন লক্ষ্য করা যায় না। একটি মন্তব্য লেখার সময়ে তিনি নিজের মতোই লিখে দেন। কিন্তু প্রকাশের মুহূর্তে তা গোটা পৃথিবীর সামনে চলে আসে। বেশির ভাগ মানুষ এটা না বুঝেই লেখেন। অনেকেই অন্যের মতকে সম্মান না দেখিয়ে নিজের মত প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট। এ ধরনের প্রবণতায় নারী ও শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তবে এ ধরনের অপরাধের প্রতিকার আইনে নেই, তা নয়। বিশেষ করে দণ্ডবিধির ২৯৪ ধারায় প্রকাশ্যে অশালীন আচরণ, গান বা কথার জন্য তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। ৫০৯ ধারায় নারীর শালীনতার অমর্যাদা করে এমন কথা, ইঙ্গিত বা অঙ্গভঙ্গির শাস্তি এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা দুটোই।
অনলাইনে হয়রানির জন্য আছে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬। এ আইনের ২৫ ধারায় নারী বা শিশুকে লক্ষ্য করে হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল বা অশ্লীল কনটেন্ট প্রকাশের শাস্তি পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে। ভুক্তভোগী চাইলে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন।

এই বিচার প্রক্রিয়ায় না গিয়ে যখন কোনো ব্যক্তি নিজেই আইন হাতে তুলে নেন, তা পূর্বোক্ত অপরাধেরই পুনরাবৃত্তি। এই অধিকার বিদ্যমান কোনো আইনই কাউকে দেয়নি। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিককে আইনানুযায়ী আচরণ পাওয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছে। বিচারের জন্য আদালত; তদন্তের জন্য পুলিশ আছে। জনসমক্ষে কারও নাম প্রকাশ করাও এক ধরনের অপরাধ। কেউ সত্যিই অপরাধ করে থাকলেও তার শাস্তি নির্ধারিত হবে বিচার প্রক্রিয়ায়; কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নির্ধারিত উপায়ে নয়।

এই বিচারবহির্ভূত প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে ঝুঁকিতে নিরপরাধ মানুষ। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো ব্যক্তির ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করে সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে তা চালানো হচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব অ্যাকাউন্ট অসাধু কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়। এমন ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে মর্যাদাহানিকর কোনো মন্তব্য করলে বাছবিচার ছাড়াই উক্ত ব্যক্তিকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে যদি তা সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা হয়, তাতে ওই ব্যক্তির ব্যক্তিগত, পেশাগত ও সামাজিক জীবনে ব্যাপক বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। আর এই ক্ষতি কোনো কিছুতেই নিরাময়যোগ্য হয়। ইতোমধ্যে প্রকাশিত খবরে দেখা গেছে, সামাজিক মাধ্যমে ভুল মানুষকে চিহ্নিত করা হয়েছে। 

এটা ঠিক, অনেক ক্ষেত্রেই নারীকে বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এবং বিচারের বিভিন্ন স্তরে হয়রানির শিকার হতে হয়। এ ছাড়া লোকলজ্জার ভয় তো আছেই। এই হতাশা থেকেই হয়তো এমন গ্রুপের জন্ম। এমন সমাধান প্রতিশোধ নেওয়ার পথ সহজ করতে পারে; কিন্তু তা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। যারা সত্যিই ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়াতে চান, তারা প্রমাণ সংগ্রহে সহযোগিতা করে বিচার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারেন। 

প্রতিশোধের এই সংস্কৃতিকে বাড়তে দেওয়া যায় না। আজ আমি কাউকে আঘাত করলে কাল সে আমাকে আঘাত করার চেষ্টা করবে। এতে সমাজ আরও আগ্রাসী হবে; সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হবে। এইরূপ কার্যক্রম বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। তবে ব্যক্তিগতভাবে কাউকে দোষারোপ নয়। বেশ কিছুদিন ধরে দেখা যাচ্ছে, মুখের লাগাম ধরে রাখার চর্চাই যেন আমরা হারিয়ে ফেলেছি। অনলাইন তো বটেই, প্রকাশ্যে মানুষকে কুৎসিত ভাষায় অপমান বা গালি দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা বারবার গণমাধ্যমে দৃশ্যমান। এই প্রক্রিয়াকে আমাদের থামানো প্রয়োজন। বাকস্বাধীনতার নামে কাউকে আঘাত করা নয়। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে, নিজের অধিকারের সীমা এবং অন্যের অধিকারের শুরু।

এ অবস্থা থেকে বেরোতে সময় লাগবে। প্রথমত, আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অনলাইনে কথা বলার রীতি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শেখাতে হবে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে। কাকে কী বলা যায়, কোথায় থামতে হয়– এই জ্ঞান আজ সবচেয়ে জরুরি। তৃতীয়ত, তরুণেরা যাদের কথা শোনেন, সেই পরিচিত মুখদেরও এগিয়ে আসতে হবে। অপমানের জবাব অপমান নয়। তা হবে বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। 

লেখক: আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী

আরও পড়ুন

×