ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

দক্ষিণ আফ্রিকায় নারীর প্রতি সহিংসতা

ঘরই যেখানে বড় বিপদ

ঘরই যেখানে বড় বিপদ
×
×

প্রতিদিন ছয়জন নারী খুন হন স্বামী বা সঙ্গীর হাতে। এর প্রতিবাদে নারীদের বিক্ষোভ কেপটাউনে / ছবি: এএফপি

হিল্লোল চৌধুরী

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫০ | আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

জোহানেসবার্গের সিফোসিলে নাভিম্বেলা অনেক বছর মার খেয়েছেন নিজের ঘরে। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থাতেও সে মার থামেনি। এক সময় বুঝলেন, এ ঘরে থাকলে তিনি বাঁচবেন না; বাঁচবে না তাঁর সন্তানরাও। সন্তানদের নিয়ে একদিন বেরিয়ে ঠাঁই নিলেন নির্যাতিত নারীদের আশ্রয়কেন্দ্রে। জার্মান সম্প্রচার মাধ্যম ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তাঁর বেঁচে ফেরার গল্প।

সিফোসিলে তবু ভাগ্যবতী। দেশটির অনেক নারী সেই দরজা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন না। সর্বশেষ বার্ষিক অপরাধ পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাঁচ হাজার ৫৭৮ নারী খুন হয়েছেন। অর্থাৎ দিনে গড়ে প্রায় ১৫ জন। জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেনের হিসাবে সেখানে নারীহত্যার হার বৈশ্বিক গড়ের পাঁচ গুণ। ২০২২ সালের এক সরকারি জরিপে দেখা যায়, প্রতি তিনজনে একজন নারী শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের ২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ছয়জন নারী খুন হন স্বামী, প্রেমিক বা সঙ্গীর হাতে। অর্থাৎ ঘাতক বেশির ভাগ সময় অচেনা কেউ নয়।

এই হিসাব রাখার কাজেও রাষ্ট্র পিছিয়ে। তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে অভ্যন্তরীণ প্রশ্ন তুলে ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে পুলিশ নারী ও শিশুহত্যার আলাদা পরিসংখ্যান প্রকাশ বন্ধ রেখেছে। যে মৃত্যু গোনা হয় না, তার বিচারও হয় না।

এ বছর আতঙ্ক আরও ঘনীভূত। জোহানেসবার্গের পূর্বে একুরহুলেনিতে দুই মাসে ৯ নারীর মরদেহ পাওয়া যায়। তাদের বয়স ২০ থেকে ৩৮; প্রায় সবার শরীর ছিল নগ্ন বা অর্ধনগ্ন; আঘাতের দাগে ভরা। সেখানকার নারীরা বলছেন, দেশটা যেন তাদের জন্য কারাগার হয়ে উঠেছে। 

কাগজে দক্ষিণ আফ্রিকার আইন যথেষ্ট কড়া। নির্যাতিত নারী আদালত থেকে সুরক্ষা আদেশ নিতে পারেন। কিন্তু সেই কাগজ ঘর পর্যন্ত পৌঁছায় না। পুলিশের নিজস্ব জরিপেই দেখা গেছে, মাত্র ৬২ শতাংশ থানা হাতে আসা সুরক্ষা আদেশ অভিযুক্তের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছে। প্রতিটি প্রদেশে দোষী সাব্যস্তের হার ২০ শতাংশের নিচে। গাউতেং ও কোয়াজুলু-নাটালে তা ১০ শতাংশেরও কম। একই সময়ে ১৮৬ পুলিশ সদস্য নিজেরাই পারিবারিক সহিংসতায় অভিযুক্ত হন।

সরকারি ন্যায়পাল দপ্তরের তদন্তে উঠে এসেছে আরও নির্মম চিত্র। অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতিত নারীকেই নিজ হাতে নির্যাতনকারীর কাছে সুরক্ষা আদেশ পৌঁছে দিতে বলা হয়, যা তাঁকে নতুন হামলার মুখে ঠেলে দেয়।

জাতিসংঘের নারী অধিকার কমিটি দেখেছে, কোনো কোনো সুরক্ষা আদেশে নির্যাতনকারীকে শুধু একই বাড়ির অন্য ঘরে ঘুমাতে বলা হয়েছে। কমিটি আরও বলেছে, রাষ্ট্র নিজে কোনো আশ্রয়কেন্দ্র না চালিয়ে দায় চাপিয়েছে পর্যাপ্ত অর্থ না পাওয়া বেসরকারি সংগঠনের ঘাড়ে। সিফোসিলের মতো নারীদের শেষ ভরসাটুকু তাই নড়বড়ে।

কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফ্লোরেটা বুনজায়ের দীর্ঘদিন এ বিষয়ে কাজ করছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুসারে, সংবাদমাধ্যম লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাকে কেবল কৃষ্ণাঙ্গ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সমস্যা হিসেবে দেখায়; নারীহত্যাকে বানায় চাঞ্চল্যকর দৃশ্য। এতে আসল প্রশ্ন ঢাকা পড়ে যায়। সহিংসতা শ্রেণি বা গায়ের রং মানে না; এটি ক্ষমতার প্রশ্ন। 

সঙ্গীকে হত্যার দায়ে কারাবন্দি ২০ জন পুরুষের একান্ত সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন এক দল গবেষক। তারা দেখেছেন, এ পুরুষরা নারীর ওপর চরম নিয়ন্ত্রণকেই পৌরুষের প্রমাণ ভাবতেন; হত্যা ছিল হারানো নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার শেষ উপায়। গবেষকদের মতে, এই সহিংসতার শিকড় রয়েছে বর্ণবাদী ও ঔপনিবেশিক অতীতে। অভিবাসী শ্রমব্যবস্থা আর দারিদ্র্যপীড়িত টাউনশিপ পুরুষের নিয়ন্ত্রণ প্রবণতাকে আরও উস্কে দিয়েছে। ঘরের ভেতরের মার তাই বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। সমাজ যে পৌরুষ শিখিয়েছে, এটি তারই ফল। ভয় এখন ক্রোধে রূপ নিচ্ছে।

২০২৫ সালের নভেম্বরে দেশজুড়ে নারীরা দুপুরে ১৫ মিনিট মাটিতে শুয়ে থাকেন প্রতিদিন খুন হওয়া ১৫ নারী স্মরণে। ১১ লক্ষাধিক মানুষ স্বাক্ষরিত আবেদনের পর দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও নারীহত্যাকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করে। কিন্তু আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা সাবরিনা ওয়াল্টার সতর্ক করেছিলেন, কাজ না হলে এ ঘোষণার কোনো মূল্য নেই। এক বছর পর একুরহুলেনির লাশগুলো সেই সতর্কতাকেই সত্য প্রমাণ করছে। 

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এখন দাবি তুলেছে নারীহত্যাকে আলাদা অপরাধ হিসেবে আইনে স্বীকৃতি দেওয়ার। সংস্থাটি জানায়, বিশ্বের ৩৩টি দেশ তা করেছে। তবে আফ্রিকায় কেবল গ্যাবন ও মরক্কো এ স্বীকৃতি দিয়েছে। 

রাষ্ট্রের অপেক্ষায় বসে নেই সাধারণ নারীরা। তারা পাড়ায় পাড়ায় আত্মরক্ষার কৌশল শিখছে। কোথাও আগ্নেয়াস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এমন এক দলের প্রশিক্ষক বলেন, বন্দুক শেষ উপায় মাত্র; আসল লক্ষ্য নারীরা নিজেদের কীভাবে দেখে, সেটা বদলানো। এ এক কঠিন সত্য। যে দেশে নারীকে বাঁচতে অস্ত্র হাতে নিতে হয়, সেখানে রাষ্ট্র তার প্রথম দায়িত্ব পালনেই ব্যর্থ। সিফোসিলে বেঁচে ফিরেছেন। প্রশ্ন হলো– এর পরের ১৫ জন ফিরবেন কিনা।

আরও পড়ুন

×