ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

মায়ের গয়নার বাক্স থেকে বিশ্বরাজনীতির টেবিলে

মায়ের গয়নার বাক্স থেকে বিশ্বরাজনীতির টেবিলে
×
×

সোনিয়া তাসনিম

সমতা ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬:৫৫

আমাদের সমাজে একটা পুরোনো ভাগাভাগি এখনো টিকে আছে। নারী লিখবেন ঘরের কথা, সম্পর্কের কথা, মনের কথা। যুদ্ধ, বাজার, কূটনীতি আর ক্ষমতার হিসাব নিয়ে লিখবেন পুরুষ। ভাগটা কেউ ঘোষণা দিয়ে করেনি, কিন্তু পত্রিকার মতামত পাতায় চোখ রাখলেই তা টের পাওয়া যায়। ভূরাজনীতি বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে যাঁরা নিয়মিত লেখেন, তাদের বেশির ভাগই পুরুষ। বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমে নারীর উপস্থিতি নিয়ে কাজ করা গ্লোবাল মিডিয়া মনিটরিং প্রজেক্টের ২০২০ সালের প্রতিবেদন বলছে, সংবাদে বিশেষজ্ঞ হিসেবে যাদের মত নেওয়া হয়, তাদের মধ্যে নারী মাত্র ২৪ শতাংশ। প্রতি চারজন বিশেষজ্ঞের তিনজনই পুরুষ।

সোনিয়া তাসনিম এই অলিখিত সীমানা মানেননি। তিনি সম্পর্কের টানাপোড়েন আর মনের জটিল গলিপথ নিয়ে গল্প লেখেন। ভ্রমণ আর রহস্যের রোমাঞ্চে পাঠককে টেনে নেন। আবার একই কলমে খুলে বসেন বিশ্বরাজনীতির দাবার ছক। কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট, এই তিন পরিচয় মিলিয়েই তিনি গড়ে নিয়েছেন নিজের স্বর। সময়ের সমাজবাস্তবতা আর বৈশ্বিক সংকটকে নিজের চোখে পড়ার চেষ্টাই তাঁর লেখার মূল জোর।

এ পর্যন্ত সোনিয়া তাসনিমের নয়টি বই প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলো হলো ‘মায়ের গয়নার বাক্স’, ‘অসমাপ্ত’, ‘আগন্তুক’, ‘ফোর্থ ফ্লোর’, ‘বিস্তীর্ণ জলছবি’, ‘কেনিয়া ভয়ংকর’, ‘বীক্ষণ’, ‘জি-ভেনম’ ও ‘কেরালার গহীনে’।

বইয়ের নামগুলোর দিকে তাকালেই তাঁর পরিসর বোঝা যায়। ‘মায়ের গয়নার বাক্স’ পাঠককে টানে ঘরের ভেতরের স্মৃতির দিকে, যেখানে একটা বাক্সে জমা থাকে কয়েক প্রজন্মের নারীর গল্প। আবার ‘কেনিয়া ভয়ংকর’ আর ‘কেরালার গহীনে’ পাঠককে নিয়ে যায় দূরের অচেনা ভূগোলে। এসব বইয়ে মানুষের সম্পর্ক আর মনের অন্তর্লোকের খোঁজ যেমন আছে, তেমনি আছে ইতিহাস, ভ্রমণ, বিজ্ঞান ও রহস্যের মিশেল। এক লেখকের হাতে এত রকম স্বাদ সচরাচর মেলে না।

কল্পকাহিনিতেই নিজেকে আটকে রাখেননি সোনিয়া। রাষ্ট্রচিন্তা, অর্থনীতি, ভূরাজনীতি, জলবায়ু সংকট আর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো বিষয়ে তিনি নিয়মিত তথ্যনির্ভর কলাম ও প্রবন্ধ লেখেন। দুই বাংলার গণমাধ্যমেই তাঁর উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। দেশে প্রথম আলো, খবরের কাগজ, জনকণ্ঠ, আজাদী এবং বণিক বার্তার ‘সিল্করুট’-এ তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়। পশ্চিমবঙ্গের পুবের কলমেও তিনি নিয়মিত লেখেন। ইংরেজিতে তাঁর বিশ্লেষণ প্রকাশিত হচ্ছে দ্য এশিয়ান এজ, দ্য প্যারিস মেইল, প্যারিস টাইমস, ইনফোনাউ ও এশিয়া টেলিস্কোপে।

এই জায়গায় একজন নারীর কলম কেন জরুরি, সে প্রশ্নের উত্তর খুব জটিল নয়। যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি কিংবা জলবায়ু বিপর্যয়ের সিদ্ধান্ত হয় ক্ষমতার টেবিলে। কিন্তু তার বোঝা সবচেয়ে ভারী হয়ে নামে নারী আর প্রান্তিক মানুষের কাঁধে। বাজারে চালের দাম বাড়লে হাঁড়ির হিসাব মেলাতে হয় ঘরের নারীকে। নদীতে ভিটা হারানো পরিবারকে আগলে রাখেন তিনিই। এই অভিজ্ঞতা যে কলমে ধরা পড়ে, সেই কলম বিশ্লেষণের টেবিলে না থাকলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সোনিয়ার লেখা সেই শূন্যতার একটা অংশ পূরণ করছে।

সোনিয়া তাসনিমের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার বড় একটা জায়গা জুড়ে আছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুলের সাম্যবাদ, মানবতাবাদ আর মুক্তির দর্শনকে তিনি আজকের বাস্তবতায় মিলিয়ে দেখছেন তাঁর গবেষণায়। নারী-পুরুষের সমতার প্রশ্নে নজরুল এক শতাব্দী আগেই স্পষ্ট করে লিখেছিলেন–
বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।

সেই সাম্যের ভাবনা আজও কতটা অপূর্ণ, তা মনে করিয়ে দেওয়াই নজরুলচর্চার বড় দায়। এই নিষ্ঠা আর সাহিত্যিক অবদানের জন্য সোনিয়া তাসনিম ২০২৬ সালের ‘প্রমীলা নজরুল অ্যাওয়ার্ড’-এর জন্য মনোনীত হয়েছেন। প্রমীলা নজরুল, বিয়ের আগে যাঁর নাম ছিল আশালতা সেনগুপ্ত, ১৯২৪ সালে সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ভিন্ন ধর্মের নজরুলকে বিয়ে করেছিলেন। দারিদ্র্য, সন্তান হারানোর শোক আর নিজের দীর্ঘ পক্ষাঘাতের মধ্যেও তিনি ছিলেন কবির পাশে। নজরুলের জীবনের আড়ালে থাকা এক নারীর নামে দেওয়া সম্মাননায় আরেক নারীর মনোনয়ন যেন এক নীরব ঋণস্বীকার।

সোনিয়া এখন লিখছেন নতুন উপন্যাস ‘বিপ্রতীপ’। শব্দটির মানে বিপরীতমুখী। নামের মতোই উপন্যাসে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে নানা বিরোধ। আছে আদর্শের সংঘাত, শ্রেণিবৈষম্য, পুঁজির কাঠামো আর শ্রমজীবী মানুষের টিকে থাকার লড়াই। সঙ্গে আছে সম্পর্কের ভাঙাগড়া। অমর একুশে বইমেলা ২০২৭-এ অবসর প্রকাশনা সংস্থা থেকে উপন্যাসটি প্রকাশের কথা রয়েছে।

গল্প আর গবেষণাকে পাশাপাশি এগিয়ে নিতে চান সোনিয়া তাসনিম। মানুষের ভেতরের সত্য আর সমাজের ক্ষত, দুটোকেই তিনি শব্দে ধরতে চান। তাঁর লেখা এক জরুরি কথা মনে করিয়ে দেয়। নারীর কলম ঘরের চৌকাঠে আটকে থাকার জিনিস নয়। মায়ের গয়নার বাক্স যে হাত খুলতে জানে, সেই হাত বিশ্বের মানচিত্রও খুলে পড়তে পারে।

আরও পড়ুন

×