ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অভিমত

নির্মাণ শ্রমিকের নিরাপত্তার গুরুত্ব উপেক্ষিত

নির্মাণ শ্রমিকের নিরাপত্তার গুরুত্ব উপেক্ষিত
×

ড. মো. হেলাল উদ্দিন

প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৪৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের আবাসন ও নির্মাণ শিল্প খাত একটি ক্রমবর্ধনশীল খাত। দ্রুত নগরায়ন, সরকারের অবকাঠামো খরচ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এ খাতের বিকাশকে ত্বরান্বিত করেছে। আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প এবং অবকাঠামো নির্মাণে এ শিল্পে বর্তমানে ৩৫ লাখ শ্রমিক রয়েছে। বর্তমানে জিডিপিতে নির্মাণ খাতের অবদান প্রায় ৮ শতাংশ।

নির্মাণ শ্রমিকদের নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশের ঘাটতি প্রতিদিন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। নির্মাণকাজে পুরুষের পাশাপাশি অনেক নারী শ্রমিকও কাজ করছেন। তাদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এবং শ্রম ও দক্ষতায় গড়ে ওঠে অট্টালিকা, বিনোদন কেন্দ্র ও জনপদ। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের কাজ করতে হচ্ছে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে। 

একজন নির্মাণ শ্রমিক কীভাবে কাজ করবে এবং কীভাবে নিয়োগকর্তার সহযোগিতা পাবে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে বাংলাদেশ, ভারত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের আইনি ব্যবস্থা ও নিয়মকানুন পর্যালোচনা করা হয়েছে। অন্যান্য দেশ নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশের বিষয়ে গ্রহণযোগ্য নিয়ম অনুসরণ করে এবং তদারকি ব্যবস্থাও যথেষ্ট ভালো। কিন্তু বাংলাদেশে নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশের বিষয়টি উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। 
নির্মাণ শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশে দায়িত্ব পালনের জন্য বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কিছু বিষয় জরুরি।নির্মাণ শ্রমিককে কাজে নিযুক্ত হওয়ার আগে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুকি বিষয়ে ওরিয়েন্টেশন বা প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। নির্মাণসাইটে অনিরাপদ বস্তু ও জায়গা সম্পর্কে বোধগম্য নির্দেশকের ব্যবস্থা রাখতে হবে। কাজের সময় শ্রমিকের বৈদ্যুতিক ঝুঁকি সম্পর্কে অবহিত করতে হবে এবং অনিরাপদ জিনিস নিরাপত্তা বেষ্টনী দিয়ে রাখতে হবে। আগুনের ঝুঁকি এবং আগুন লাগলে যেন নিরাপদে বের হতে পারে, সে ধরনের সুযোগ রাখতে হবে এবং তাৎক্ষণিক আগুন নেভানোর জন্য যথেষ্ট পরিমাণ ফায়ার এক্সটিংগুইশার রাখতে হবে। প্রতিটি নির্মাণ সাইটে মালিক ও শ্রমিকদের প্রতিনিধি নিয়ে সেফটি কমিটি থাকতে হবে। যার মাধ্যমে শ্রমিকরা তাদের ঝুঁকির বিষয়টি জানাতে পারবেন। একজন শ্রমিক দৈনিক ওভারটাইমসহ কত ঘণ্টা কাজ করবেন, তার একটি সুনির্দিষ্ট শিডিউল থাকতে হবে। নির্মাণ সাইটে ওপর থেকে শ্রমিকদের পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং এটি নির্মাণ শ্রমিকদের মৃত্যু বা বড় আঘাতগ্রস্ত হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ। নির্মাণ সাইটে কোনো দুর্ঘটনা হলে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থা থাকতে হবে। 
বাংলাদেশের নির্মাণ শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষার জন্য শ্রম আইন ও জাতীয় বিল্ডিং কোড কার্যকর রয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং এর অধীন কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর রয়েছে। অন্যদিকে রাজউক ঢাকায় ও অন্যান্য ক্ষেত্রে আইন দ্বারা নির্ধারিত সংস্থা নির্মাণ ও তদারকির দায়িত্বে রয়েছে। বাস্তবে শ্রমিকদের পেশাগত  নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিষয়ে তাদের  উদ্যোগ চোখে পড়ে না। 

নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মক্ষেত্র এবং উপযুক্ত কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করে তাদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, রাজউক ও রিহ্যাব মিলে সবার ক্ষেত্রে অনুসরণীয় একটি ম্যানুয়াল তৈরি করতে পারে। কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর ও রাজউকের পক্ষ থেকে নির্মাণক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশের বিষয়টি নিয়মিত তদারকি ও আইনের প্রয়োগ আবশ্যক। 
লেখক: মহাসচিব, বিসিআই

আরও পড়ুন

×