সমুদ্র বাণিজ্যে বিকল্প পথে ব্যয় বাড়তে পারে ৩০ শতাংশ
সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬ | ০৭:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯২ ভাগই হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। এ বন্দর দিয়ে পাঠানো হয় রপ্তানি পণ্যের ৯৮ ভাগ। সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা কিংবা মালয়েশিয়ার বন্দর হয়ে পণ্যবাহী জাহাজগুলো যায় ইউরোপ-আমেরিকায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের জের ধরে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় এই রুটে পণ্য পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ‘কেপ অব গুড হোপ’ হয়ে বিকল্প রুটে যেতে হবে জাহাজগুলোকে। এতে বেড়ে যাবে বীমা খরচ ও জাহাজের পরিবহন ব্যয়। পণ্য পৌঁছাতে সময় লাগবে দ্বিগুণ।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল আলম জুয়েল বলেন, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে সমুদ্র বাণিজ্যে কয়েক বছর ধরেই অস্থিরতা চলছে। হুতি বিদ্রোহীদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে কিছু জাহাজ মালিক অনেক দূর ঘুরে বিকল্প রুটে জাহাজ পরিচালনা করছেন। ইরানের সঙ্গে বর্তমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে সবাই বিকল্প রুটে জাহাজ চালাতে বাধ্য হবেন। তখন বীমা খরচ ও জাহাজের পরিচালন ব্যয় অন্তত ৩০ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। বাড়তি এ খরচের ভার মূলত পড়বে আমদানিকারক কিংবা রপ্তানিকারকের ওপর।’
নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিকল্প পথে হাঁটতে হবে আমাদের। খরচ বাড়লেও অগ্রাধিকার দিতে হবে নিরাপত্তাকে।’
পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাজার ইউরোপ। ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ পাঁচ বছরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ইইউতে ১৯ বিলিয়ন ইউরোর বেশি মূল্যমানের পোশাক রপ্তানি করেছে। অন্যিদেক যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের তথ্যউপাত্ত অনুযায়ী ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানির ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ হয়েছে বাংলাদেশ থেকে।
ইন্টারন্যাশানাল বিজনেস ফোরাম চট্টগ্রামের চেয়ারম্যান ও বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি এস এম আবু তৈয়ব বলেন, ‘দেশের সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্যের ৫১ শতাংশ হয় ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে। ২৫ শতাংশ বাণিজ্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। এ জন্য খরচ বাড়লেও নিরাপত্তার স্বার্থে আমাদের যেতে হবে বিকল্প রুটে।’
ছোট হয়ে গেছে আকাশপথ
নির্ধারিত সময়ে সমুদ্রপথে যেসব রপ্তানি পণ্য পাঠানো যেত না, সেগুলো আকাশপথে পাঠাতে রপ্তানিকারকরা দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ট্রানজিট পয়েন্টগুলোর ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। খরচ কমাতে আগে ভারতে নিয়েও বিকল্প আরেকটি রুট ব্যবহার করতেন রপ্তানিকারকরা। গত বছর থেকে তা বন্ধ আছে। এখন বন্ধ মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ। কবে নাগাদ সংঘাত শেষ হবে, তা অনিশ্চিত। তাই পশ্চিমা বাজার ধরে রাখতে জাহাজের বিকল্প পথকেই ভরসা মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। এলএনজি আমদানিকারকরাও খুঁজছেন বিকল্প পথ। বাংলাদেশে আসা এলএনজির ৮০ ভাগ জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসায় বেকায়দায় পড়েছেন তারা।
জ্বালানি আমদানিতে বাড়বে খরচ
ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, ‘বাংলাদেশের চাহিদার ৮০ শতাংশ তেল আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। প্রতি মাসে গড়ে সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ টন জ্বালানি আমদানি করে বাংলাদেশ। ৩০ শতাংশ খরচ বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি পড়বে কৃষক, শিল্পকারখানা ও সড়ক পরিবহনে।’ তিনি জানান, ইউরোপে সাগরপথে পণ্য পাঠাতে আগে ৩৫ থেকে ৪০ দিন সময় লাগত। এখন বিকল্প রুট ব্যবহার করলে সময় লাগবে অনেক বেশি।
হরমুজ প্রণালি গুরুত্বপূর্ণ কেন
হরমুজ প্রণালির একপাশে ইরান, অন্যপাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই পথ ধরে জাহাজগুলো আরব সাগর তথা ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে হয়। এ ছাড়া বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন হয় এই প্রণালি দিয়ে। এটি বন্ধ হওয়ায় কয়েক দিন ধরেই তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য কম, অন্যদের সঙ্গে বেশি
বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ-ইরানের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এক কোটি ডলারের সামান্য বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ইরানে এক কোটি ৯ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। একই অর্থবছরে ইরান থেকে বাংলাদেশে পাঁচ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি হয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ বাংলাদেশি পণ্যের উদীয়মান বাজার। এসব দেশে তৈরি পোশাক, শাকসবজি ও ফলমূল, হিমায়িত মাছ, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ইত্যাদি পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৪০ কোটি ৭৯ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। একই সময়ে সৌদি আরবে ২৪ কোটি ৬২ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। সর্বশেষ অর্থবছর বাংলাদেশ থেকে কাতারে দুই কোটি ৬০ লাখ, কুয়েতে দুই কোটি ৫৪ লাখ ও বাহরাইনে ৯০ লাখ ডলার পণ্য রপ্তানি হয়।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) জাহাজ কোম্পানিগুলোকে নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত না হওয়া পর্যন্ত বিকল্প রুটে জাহাজ চালানোর নির্দেশনা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ জলসীমা দিয়ে চলাচল এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে। মায়েরস্ক, হ্যাপাগলয়েড ও সিএমএ, সিজিএমসহ প্রধান কনটেইনারবাহী কোম্পানিগুলো হরমুজ প্রণালি, লোহিত সাগর, সুয়েজ খাল ও বাব এল-মানদেব প্রণালি এড়িয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত কেপ অব গুড হোপ ঘুরে জাহাজ পরিচালনা শুরু করেছে। ডেনমার্কভিত্তিক মায়েরস্ক জানিয়েছে, অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে তারা আপাতত বাব এল-মানদেব প্রণালি হয়ে ট্রান্স-সুয়েজ যাত্রা স্থগিত রাখবে। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনুকূলে এলে আবার ট্রান্স-সুয়েজ রুটকে অগ্রাধিকার দেবে। জার্মান লাইন হ্যাপাগ-লয়েড জানিয়েছে, তারা ভারত, মধ্যপ্রাচ্য, ভূমধ্যসাগরীয় আইএমএক্স সেবা পরিচালনা করবে দক্ষিণ আফ্রিকা ঘুরিয়ে। পাশাপাশি আপার গালফ, অ্যারাবিয়ান গালফ ও পারস্য গালফে যাওয়া-আসা করা কার্গোর ওপর যুদ্ধঝুঁকি সারচার্জ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এটি গত সোমবার কার্যকর হয়েছে। ফরাসি গ্রুপ সিএমএ সিজিএম জানিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যের বন্দর কিংবা লোহিত সাগর বন্দরসংশ্লিষ্ট চালানে জরুরি সংঘাত সারচার্জ আরোপ করবে। প্রতিষ্ঠানটি সুয়েজ খাল দিয়ে চলাচল স্থগিত করেছে এবং জাহাজ আফ্রিকা ঘুরিয়ে দিচ্ছে। মেডিটেরেনিয়ান শিপিং কোম্পানি জানিয়েছে, তারা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যগামী সব কার্গো বুকিং স্থগিত রাখবে। এমন অস্থিরতার কারণে বিকল্প রুটে বেড়ে যাচ্ছে জাহাজ ভাড়া। এই রুটে আগের চেয়ে ১২ থেকে ১৫ দিন বাড়তি সময় লাগবে।
- বিষয় :
- সমুদ্রপথ
