ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

‘নিরাপদ বিনিয়োগ’ তত্ত্বে ধাক্কা

যুদ্ধের বাজারেও স্বর্ণের দর পতন

যুদ্ধের বাজারেও  স্বর্ণের দর পতন
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ | ০৭:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ালেও প্রচলিত ধারা ভেঙে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে উল্টো পতন ঘটেছে। দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ বা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সময় স্বর্ণকে সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হলেও এবার সেই ধারণায় বড় ধাক্কা লেগেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আধুনিক আর্থিক বাজারে স্বর্ণের দামের গতিপথ এখন আর শুধু ‘নিরাপদ আশ্রয়’ তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বরং সুদের হার, ডলার শক্তি, তারল্য সংকট ও বিনিয়োগকারীদের আচরণ– সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে জটিল সমীকরণ।
ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে স্বর্ণের দামের পতন দেখিয়ে দিয়েছে বাজারের পুরোনো নিয়ম এখন আর আগের মতো সরল নয়। যুদ্ধ মানেই স্বর্ণের দাম বাড়বে– এ ধারণা এখন আর অটুট নয়। বরং আধুনিক আর্থিক ব্যবস্থায় স্বর্ণের আচরণ নির্ধারিত হচ্ছে বহুস্তরীয় অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের মাধ্যমে।

স্বর্ণের দরে সাম্প্রতিক প্রবণতা
গত দুই মাসেরও কম সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দরে প্রায় ২০ শতাংশ পতন হয়েছে। গতকাল শুক্রবার স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স স্বর্ণ চার হাজার ৪৬৬ ডলারের আশপাশে কেনাবেচা হয়েছে। গত ২৯ জানুয়ারি এ দাম পাঁচ হাজার ৬০৮ ডলার ছাড়িয়েছিল, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। 
সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে স্বর্ণের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি শুরু হয়েছিল ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছিল এক হাজার ৭০০ ডলারেরও কমে। দর বৃদ্ধি লাগাম ছাড়া হতেই ২০২৪ সালের শেষে প্রতি আউন্সের দর দুই হাজার ৬৫০ ডলার এবং ২০২৫ সালের শেষে চার হাজার ৫০০ ডলার ছাড়ায়।
আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির পেছনের প্রধান কারণগুলো ছিল বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রেকর্ড পরিমাণ স্বর্ণ ক্রয়, মার্কিন সুদের হার কমার ধারণা এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা।

বাংলাদেশে স্বর্ণের দর নির্ধারণ করে জুয়েলার্স ব্যবসায়ী সমিতি বাজুস। এ সমিতির ভাষ্য, আন্তর্জাতিক দরের সঙ্গে সমন্বয় করে দর নির্ধারণ করা হয়। সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার ২২ ক্যারেট মানের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে দুই লাখ ৩৪ হাজার ৮৮৫ টাকা। গত ২৯ জানুয়ারি যা ছিল দুই লাখ ৮৬ হাজার ১ টাকা। এ দর সরকার নির্ধারিত ৫ শতাংশ ভ্যাট ছাড়া। ভ্যাটসহ হিসাব করলে দেশে স্বর্ণের দর প্রতি ভরি তিন লাখ টাকা ছাড়িয়েছিল, যা এযাবৎকালের রেকর্ড।
ইরানকে কেন্দ্র করে সামরিক সংঘাত শুরু হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রথম দিন স্বর্ণের দাম কিছুটা বেড়েছিল, যা ছিল স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। তবে খুব দ্রুতই চিত্র পাল্টে যায়। মার্চ মাসজুড়ে স্বর্ণের দাম পড়ে যেতে থাকে এবং একপর্যায়ে তা বড় ধরনের পতনে রূপ নিয়েছে।

কেন ভাঙল ‘নিরাপদ বিনিয়োগ’ ধারণা
বিশ্লেষকরা বলছেন, গত বছর স্বর্ণের দাম প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগেই স্বর্ণের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় বড় বিনিয়োগকারীরা সুযোগ বুঝে লাভ তুলে নিতে শুরু করেন। রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাজারে অতিরিক্ত বিক্রির চাপে পতন ত্বরান্বিত হয়।

নগদ সংকটও বড় কারণ
যুদ্ধের কারণে শেয়ারবাজারসহ বিভিন্ন খাতে অস্থিরতা দেখা দিলে অনেক বিনিয়োগকারী নগদ অর্থের জন্য স্বর্ণ বিক্রি করেছেন বলে খবর প্রকাশ করেছে রয়টার্সসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।
ইকোনমিক টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে বড় বিনিয়োগকারীরা ঋণ নিয়ে শেয়ারে বিনিয়োগ করে থাকেন। যুদ্ধের ধাক্কায় শেয়ারবাজারে পতন হলে ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ‘মার্জিন কল’ দেয়। অর্থাৎ ঋণ আদায়ের সুরক্ষা আইনে বিনিয়োগকারীকে শেয়ারের বাজারদর অনুযায়ী ঋণ হার সমন্বয় করতে নোটিশ করা হয়। এ নোটিশ মেনে অর্থ না দিলে শেয়ার বিক্রি করে ঋণ হার সমন্বয় করা হয়। বিনিয়োগকারীরা মার্জিন দিতে নগদ অর্থের প্রয়োজনে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ বিক্রি করেন।

সুদের হার নিয়ে নতুন শঙ্কা
বিশ্ববাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মার্কিন সুদহার বড় ভূমিকা রাখে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ফলে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে দেশে মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি বেড়েছে। ফলে যু্ক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমানোর পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে পারে– এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া যুদ্ধের সময় বিনিয়োগকারীরা মার্কিন ডলারের দিকে ঝুঁকেছেন। ফলে ডলার শক্তিশালী হয়েছে, যা স্বর্ণের দাম কমার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

ফিরে দেখা
এভাবে স্বর্ণের দর কমে যাওয়ার ঘটনা গত তিন-চার দশকে একেবারে নজিরবিহীন নয়। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় না বেড়ে উল্টো খানিকটা কমেছিল স্বর্ণের দর। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক মন্দা এবং ২০২০ সালে করোনা অতিমারির সময়েও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল।
২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ‘সাব-প্রাইম মর্গেজ’ সংকট বিশ্বজুড়ে আর্থিক মন্দা তৈরি করলে তখনও শেয়ারবাজারে ব্যাপক দর পতন হয়েছিল। বিশ্বজুড়ে ওই দর পতনের সময় বিনিয়োগকারীরা নগদ অর্থের জন্য স্বর্ণ বিক্রি করতে বাধ্য হন। ফলে স্বর্ণের দাম সাময়িকভাবে পড়ে যায়, যদিও পরে তা দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়। আবার ২০২০ সালের মার্চে করোনা অতিমারির সময় বিশ্ববাজারে ধস নামলে প্রথম দিকে স্বর্ণের দামও কমে যায়। 

আগামী দিনে কী হতে পারে
বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে ইরান যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হয় এর ওপর। এ ছাড়া তেলের দাম কতটা বাড়ে, সুদের হার কমে কিনা, তাও প্রভাবিত করবে স্বর্ণের দরকে। মোট কথা যদি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা আসে, তাহলে আবার স্বর্ণে বিনিয়োগ বাড়তে পারে।

আরও পড়ুন

×