বাণিজ্য ও শ্রম ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত নিয়ে বিশ্লেষকরা
উদ্বেগ নয়, সতর্কতা প্রয়োজন
আবু হেনা মুহিব
প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ | ০৭:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
বেশ কয়েক বছর ধরে প্রধান শিল্প বস্ত্র ও পোশাক উৎপাদন কাঠামোয় অটোমেশন যুক্ত হয়েছে। এতে শ্রমিকের চাহিদা কমেছে। নিয়ম মেনে অনেক শ্রমিককে কাজ থেকে বিদায় দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অনেক শ্রমিকই পেশা বদল করেছে। এই বাস্তবতা বলছে, দেশে জোরপূর্বক শ্রমিকদের কাজ করানোর কোনো প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদনের সুযোগ নেই দেশের কোনো খাতে। ফলে অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি তদন্তে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই বলছেন উদ্যোক্তারা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নে এক ধরনের নৈতিক চাপ তৈরি করতেই এ ধরনের তদন্তের কথা বলা হয়েছে বলে মনে করেন বাণিজ্য বিশ্লেষকরা। এ কারণে বাংলাদশকে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) সম্প্রতি অতিরিক্ত উৎপাদন বা সক্ষমতার বিষয়ে বাংলাদেশসহ ১৬ দেশের ওপর তদন্ত শুরুর কথা জানায়। এরপর বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশে জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ কিনা তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন। এই তদন্তের মাধ্যমে যেসব দেশের বিরুদ্ধে ‘অন্যায্য’ বাণিজ্য কার্যক্রমে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যাবে সেসব দেশের পণ্যের ওপর আমদানি কর আরোপ করতে পারবে।
দেশভেদে ভিন্ন হারে উচ্চ আমদানি শুল্ক আরোপ সর্বোচ্চ আদালতে বাতিল হওয়ায় অন্য কোনো পন্থা খুঁজছিল যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। এরই অংশ হিসেবে এবার বাংলাদেশসহ ১৫ দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে কিনা, তা নিয়ে তদন্ত শুরু করতে যাচ্ছে দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর-ইউএসটিআর। গত বুধবার ইউএসটিআর এ ঘোষণা দেয়। এসব দেশের আইন, নীতি এবং চর্চা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের জন্য অযৌক্তিক, বৈষম্যমূলক বা প্রতিবন্ধকতামূলক কিনা, তা বের করা তদন্তের উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশ গত ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করে। চুক্তিটি এখনও কার্যকর হয়নি। চুক্তিতে বাংলাদেশের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিতে বাড়তি ১৯ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা রয়েছে। গত বছরের এপ্রিল মাসে ট্রাম্প ঘোষিত পাল্টা শুল্কহার ছিল ৩৭ শতাংশ। বাংলাদেশ সে দেশ থেকে পণ্য আমদানি বাড়ানোর নানা পদক্ষেপ নিলে ট্রাম্প প্রশাসন তা কমিয়ে ২০ শতাংশ করেছিল। তবে অর্থনীতিবিদরা বাণিজ্য চুক্তিটিতে যুক্তরাষ্ট্রকে বেশি সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে মত দিচ্ছেন। তারা বলছেন, চুক্তির কিছু ধারা অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্যকে সীমিত করে।
তদন্তের আওতায় ট্রাম্প প্রশাসন খতিয়ে দেখবে যে এসব দেশ তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে রাষ্ট্রীয়ভাবে এমন কোনো সহায়তা দিচ্ছে কিনা, যার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য ঢুকতে সমস্যা হচ্ছে। বিশেষত কোনো দেশে যদি নিজ দেশের শিল্পের জন্য ভর্তুকি, কর সুবিধা বা নীতি সহায়তা দিয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় বেশি উৎপাদন করার কারণে পণ্যের দাম যৌক্তিক দামের থেকে কম থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র অন্যায্য বাণিজ্য চর্চা মনে করবে এবং সে দেশের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপ করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান সমকালকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত দুটির একটি বৈশ্বিক শিল্প খাতে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা এবং অন্যটি জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ নিয়ে। দেশের রপ্তানি কাঠামো বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত মূলত পোশাক রপ্তানি থেকেই আসে। ফলে ‘অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা’ নিয়ে তদন্ত ভবিষ্যতে শুল্ক বৃদ্ধি বা বাণিজ্য সীমাবদ্ধতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজারকে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।
ড. সেলিম রায়হান বলেন, জোরপূর্বক শ্রম সংক্রান্ত তদন্ত শ্রমমান ও কর্মপরিবেশের প্রশ্নটিকে সামনে নিয়ে এসেছে। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশের পোশাক খাতে নিরাপত্তা ও নজরদারিতে অনেক উন্নতি হলেও শ্রম প্রশাসন ও তদারকিতে এখনও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই বাংলাদেশের জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো শ্রমমান উন্নয়ন, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। একই সঙ্গে রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্য করা ও উচ্চমূল্যের পণ্যে এগিয়ে যাওয়া জরুরি। কারণ ভবিষ্যতের বৈশ্বিক বাণিজ্যে শুধু কম খরচে উৎপাদন নয়; বরং মান, বিশ্বাসযোগ্যতা ও শক্তিশালী নীতিগত কাঠামোই প্রতিযোগিতার মূল ভিত্তি হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. হাফিজুর রহমান সমকালকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া বাণিজ্য চুক্তি এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড-এআরটি যেন বাস্তবায়নে বাংলাদেশ পিছপা না হয়, সে ব্যাপারে এক ধরনের নৈতিক চাপ তৈরি করতেই এ ধরনের তদন্তের কথা বলা হয়েছে। অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার অভিযোগ করা হয়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও সিমেন্টের বেলায়। কিন্তু সিমেন্টকে যুক্ত করার কোনো কারণ ছিল না। সিমেন্ট যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয় না। আর তৈরি পোশাক খাতে এ ধরনের পরিস্থিতি আছে বলে মনে হয় না। জোরপূর্বক শ্রমের যে কথা বলা হয়েছে, সেটা বাংলাদেশে নেই। জোর করে কাউকে দিয়ে কাজ করানো হয় না।
তিনি মনে করেন, সমস্যা হতে পারে সংজ্ঞায়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, যদি কোনো শ্রমিক নিরুপায় হয়ে যোগ্য মজুরির চেয়ে কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হয়, তাকেই জোরপূর্বক শ্রম বলা যায়। এখানেও বাংলাদেশের খুব বেশি উদ্বেগের কিছু নেই। তারপরও তদন্তের বিষয়ে বাংলাদেশের যতটুকু উদ্বেগের বিষয় তা হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত যদি নতুন করে বাড়তি শুল্ক আরোপ করা হয় এবং শুল্কের হার যদি প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে বেশি হয়, তখন সমস্যা হতে পারে।
তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান বাবলু সমকালকে বলেন, বাংলদেশের শিল্পের ইতিহাসে জোরপূর্বক শ্রমের নজির কখনোই ছিল না। রানা প্লাজা ধসের পর তৈরি পোশাক খাতের সংস্কার তদারকিতে মার্কিন ব্র্যান্ড ক্রেতাদের নেতৃত্বাধীন জোট ‘অ্যালায়েন্স’ ও ইউরোপিয়ানের ব্র্যান্ড-ক্রেতাদের জোট ‘অ্যাকর্ড’-এর তৎপরতার ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের কমপ্লায়েন্স এখন বিশ্বস্বীকৃত। সেখানে জোরপূর্বক শ্রমের প্রশ্নই আসে না। ১৯৯৬ সালে শতভাগ শিশুশ্রমমুক্ত শিল্প হিসেবে তৈরি পোশাক খাতকে ঘোষণা করা হয়েছে। এর পর থেকে শিশুশ্রমও নেই শিল্পে। অতীতেও যুক্তরাষ্ট্র বহুবার এ ধরনের তদন্ত করেছে। তারা আবারও করবে, এতে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তের অংশ হিসেবে শুনানির জন্য বাংলাদেশের কাছে তারিখ চেয়েছে ইউএসটিআর। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চ এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে শুনানির সম্ভাব্য তারিখ জানতে চেয়েছেন। ঈদের দীর্ঘ ছুটির পরপরই শুনানির সম্ভাব্য তারিখ জানানো হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জারি করা নোটিফিকেশন প্রথম দৃষ্টিতে দেখলে মনে হতে পারে যে বিষয়টি কেবল জোরপূর্বক শ্রম দিয়ে উৎপাদিত পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা বা শুল্ক সংক্রান্ত। তবে সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এ তদন্তের প্রভাব আমদানি ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই পড়তে পারে। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, সম্ভাব্য শুনানিতে বিভিন্ন শিল্প ও উৎপাদন খাতের উৎপাদন সক্ষমতা, শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধের অবস্থা, ওভারটাইম, শ্রম আইনের হালনাগাদ, রপ্তানি সক্ষমতা, সরকারি ভর্তুকি এবং শ্রম সংক্রান্ত নীতিমালা বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চাইতে পারে ইউএসটিআর।
- বিষয় :
- সমৃদ্ধি
