ঢাকা মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬

সেমিকন্ডাক্টরের বাজারে সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ

সেমিকন্ডাক্টরের বাজারে সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ
×

হাসনাইন ইমতিয়াজ

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন এক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু এখন সেমিকন্ডাক্টর বা মাইক্রোচিপ। একসময় কম্পিউটার কিংবা মোবাইল ফোনের একটি যন্ত্রাংশ হিসেবে পরিচিত এই ক্ষুদ্র চিপ এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা সেন্টার, বৈদ্যুতিক গাড়ি, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, চিকিৎসা সরঞ্জাম থেকে শুরু করে মহাকাশ গবেষণারও মূল চালিকাশক্তি। ফলে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে ঘিরে শুধু প্রযুক্তি নয়; বরং বিনিয়োগ, জ্বালানি, কাঁচামাল ও ভূরাজনীতিতেও শুরু হয়েছে নতুন কৌশলগত প্রতিযোগিতা।

এই পরিবর্তনের মধ্যেই বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজার ২০২৬ সালে প্রথমবারের মতো ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করতে পারে। বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলো এ বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশও এখানে নতুন সম্ভাবনা দেখছে। দেশে এখনও চিপ উৎপাদনের কারখানা না থাকলেও চিপ ডিজাইন ও ডিজাইন ভেরিফিকেশন খাতে বাংলাদেশি প্রকৌশলীরা আন্তর্জাতিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। সরকারও এ খাতকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করে কর-সুবিধা, নগদ প্রণোদনা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ করেছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এক ট্রিলিয়ন ডলারের এই বাজারে শক্তিশালী অংশীদার হওয়ার জন্য বাংলাদেশের এই প্রস্তুতি কী যথেষ্ট?

এআই বদলে দিয়েছে চিপের বাজার
মাত্র এক বছর আগেও বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজারের আকার ছিল প্রায় ৭৯২ থেকে ৭৯৬ বিলিয়ন ডলার। তবে বিশ্ব সেমিকন্ডাক্টর ট্রেড স্ট্যাটিস্টিকস (ডব্লিউএসটিএস), আইডিসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালেই এ বাজার এক ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলকে পৌঁছাবে। আর বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাজারের আকার দেড় ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এই প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। চ্যাটজিপিটি, জেমিনি, ক্লডসহ বিভিন্ন লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল পরিচালনায় প্রয়োজন হচ্ছে হাজার হাজার উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ), এআই অ্যাক্সিলারেটর এবং উন্নত মেমোরি চিপ। ফলে আগে যেখানে ব্যক্তিগত কম্পিউটার ও স্মার্টফোন ছিল চিপ শিল্পের প্রধান ক্রেতা, এখন সেই জায়গা দ্রুত দখল করছে ডেটা সেন্টার।
এআইয়ের পাশাপাশি উচ্চগতির হাই-ব্যান্ডউইথ মেমোরি (এইচবিএম), আধুনিক ডিআরএএম (ডায়নামিক র‍্যান্ডম-অ্যাক্সেস মেমোরি), বৈদ্যুতিক গাড়ি, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), ফাইভজি নেটওয়ার্ক, স্মার্ট কারখানা ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতেও উন্নত চিপের চাহিদা বহু গুণ বেড়েছে। একটি আধুনিক বৈদ্যুতিক গাড়িতে কয়েক হাজার সেমিকন্ডাক্টর ব্যবহার করা হয়, যা প্রচলিত গাড়ির তুলনায় অনেক বেশি।

এশিয়ার হাতেই উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণ
বিশ্বের সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের মূল কেন্দ্র এখনও এশিয়া। তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও জাপান মিলেই বিশ্বের প্রায় ৭৫ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করছে।প্রযুক্তিগত দিক থেকে তাইওয়ানের টিএসএমসি বিশ্বের সবচেয়ে বড় চুক্তিভিত্তিক চিপ নির্মাতা। দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ও এসকে হাইনিক্স উন্নত মেমোরি চিপ তৈরিতে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এনভিডিয়া, কোয়ালকম, ব্রডকম ও এএমডির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত চিপ ডিজাইনের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
চীনও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালে দেশটির একক সেমিকন্ডাক্টর বাজারের আকার প্রায় ২২৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশটি নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতেও ব্যাপক বিনিয়োগ করছে।

চিপ ঘিরে নতুন ভূরাজনীতি
সেমিকন্ডাক্টর এখন কেবল প্রযুক্তিপণ্যের বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কৌশলেরও প্রধান অংশ। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন চিপ।
চীনের উন্নত চিপ প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার সীমিত করতে যুক্তরাষ্ট্র রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কঠোর করেছে। একই সঙ্গে ‘চিপস অ্যাক্ট’-এর আওতায় নিজ দেশে উৎপাদন বাড়াতে শত শত বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা দিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারতও নিজস্ব সেমিকন্ডাক্টর শিল্প গড়ে তুলতে বড় বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তা ঘোষণা করেছে। কোম্পানিগুলো সরবরাহ ঝুঁকি কমাতে একাধিক দেশে উৎপাদন ছড়িয়ে দিচ্ছে।
চিপ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল নিয়েও প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে। গ্যালিয়াম, জার্মেনিয়াম, কোবাল্ট, ট্যান্টালাম, টাংস্টেন, বিরল মৃত্তিকা (রেয়ার আর্থ) উপাদান এবং উচ্চ বিশুদ্ধতার সিলিকন এখন কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশেষ করে গ্যালিয়াম ও জার্মেনিয়ামের উৎপাদনে চীনের আধিপত্য থাকায় বিকল্প উৎস নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। বিরল ধাতুর উৎস নিরাপদ করতে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন খনিজসমৃদ্ধ দেশের সঙ্গে সহযোগিতা, বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি জোরদার করছে। ইউক্রেনের বিরল খনিজ সম্পদ নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াও চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প উৎস গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, কাঁচামালের সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিও এই শিল্পের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। অত্যাধুনিক চিপ কারখানা ও এআই ডেটা সেন্টার পরিচালনায় বিপুল বিদ্যুতের প্রয়োজন হওয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তাও এখন শিল্পটির অন্যতম প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের সুযোগ ডিজাইন খাতে
বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মতো অত্যন্ত ব্যয়বহুল চিপ উৎপাদন কারখানা স্থাপনের পরিবর্তে বাংলাদেশ আপাতত ‘ফ্যাবলেস’ মডেলে এগোচ্ছে। অর্থাৎ, চিপ উৎপাদনের বদলে ডিজাইন, ডিজাইন ভেরিফিকেশন এবং প্রকৌশল সেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। কারণ, একটি আধুনিক চিপ কারখানা স্থাপনে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও ডিজাইন খাতে তুলনামূলক কম বিনিয়োগে উচ্চমূল্যের সেবা রপ্তানির সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআইএ) ২০৩০ সালের মধ্যে এ খাত থেকে এক বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বর্তমানে এ খাতের বার্ষিক রপ্তানি আয় প্রায় আট মিলিয়ন ডলার।
দেশে ইতোমধ্যে উল্কাসেমি, নিউরাল সেমিকন্ডাক্টর, সিলিকোনোভা এবং প্রাইম সিলিকন টেকনোলজির মতো প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য চিপ ডিজাইন ও প্রকৌশল সেবা দিচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশি প্রকৌশলীরা অ্যাপল, এএমডি এবং গ্লোবালফাউন্ড্রিজের মতো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রকল্পেও কাজ করছেন। ফলে দেশে চিপ উৎপাদন শুরু না হলেও বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

নীতিগত সহায়তা বাড়াচ্ছে সরকার
সরকার সেমিকন্ডাক্টরকে জাতীয় অগ্রাধিকার খাত হিসেবে ঘোষণা করেছে। সম্প্রতি ‘ন্যাশনাল সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম অ্যান্ড বিইএআর সামিট-২০২৬’-এর উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, তৈরি পোশাকশিল্পের পর সেমিকন্ডাক্টর বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হতে পারে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে চিপ ডিজাইন, টেস্টিং ও প্যাকেজিং খাতে ব্যবহৃত কাঁচামাল, সফটওয়্যার ও যন্ত্রপাতির ওপর রেগুলেটরি ডিউটি, ভ্যাট এবং অগ্রিম কর ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে। পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন সেবা রপ্তানির ওপর নগদ প্রণোদনা এবং বছরে ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ অনুদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রয়েছে চ্যালেঞ্জও
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি দক্ষ তরুণ প্রকৌশলী ও তুলনামূলক কম পরিচালন ব্যয়। বর্তমানে দেশে ৭০০-এর বেশি সক্রিয় চিপ ডিজাইনার রয়েছেন এবং প্রতিবছর কম্পিউটার বিজ্ঞান ও ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনেক শিক্ষার্থী স্নাতক হচ্ছেন।
তবে আন্তর্জাতিক মানের ভিএলএসআই (ভেরি লার্জ স্কেল ইন্টিগ্রেশন) দক্ষতা, গবেষণাগার, ক্লিনরুম, টেস্টিং ও প্যাকেজিং অবকাঠামো এখনও সীমিত। ভবিষ্যতে টেস্টিং ও প্যাকেজিং শিল্প গড়ে তুলতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উন্নত প্রযুক্তি অবকাঠামো এবং গবেষণায় আরও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ৫০টি ভিএলএসআই ডিজাইন কোম্পানি, তিনটি সেমিকন্ডাক্টর টেস্টিং সুবিধা এবং দুটি আধুনিক প্যাকেজিং শিল্পপ্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
প্রযুক্তিবিদ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, অল্প সময়ের মধ্যে তাইওয়ান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উৎপাদনশক্তি হয়ে ওঠা বাংলাদেশের পক্ষে বাস্তবসম্মত নয়। তবে চিপ ডিজাইন, প্রকৌশল সেবা, টেস্টিং ও প্যাকেজিংয়ে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর মূল্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হওয়া সম্ভব। বিশ্বের এক ট্রিলিয়ন ডলারের এই শিল্পে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে তৈরি পোশাকের পর সেমিকন্ডাক্টরই হতে পারে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত।

আরও পড়ুন

×