দেশে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার আমের বাজার
আম উৎপাদনে শীর্ষে, রপ্তানি তলানিতে
গত ৭ থেকে ১৩ জুন মালয়েশিয়ার একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে। সফরকালে তাঁরা দেশের বিভিন্ন আমবাগান পরিদর্শন করেন সমকাল
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে আমের উৎপাদন বাড়ছে। চলতি বছর ৫ লাখ ৪ হাজার একর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। উৎপাদন ২৭ লাখ টন ছাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশের আমের বাজারের আকার এখন প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার। দেশীয় বাজার দ্রুত বাড়লেও রপ্তানিতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে গত বুধবার পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ২ হাজার ১৮০ টন আম রপ্তানি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি গেছে যুক্তরাজ্যে। সেদেশে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৫০০ টন। ইতালি ও সৌদি আরবে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ২৫০ টন করে। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সুইডেন, জার্মানি, ফ্রান্স, মালদ্বীপসহ বিভিন্ন দেশে আম রপ্তানি হয়েছে।
বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, আম উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় হলেও এখনও আন্তর্জাতিক আম বাণিজ্যে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। বছরে ২০ হাজার কোটি টাকার দেশীয় বাজারের বিপরীতে রপ্তানি আয় এখনও ১০০ কোটি টাকার নিচে।
ডিএইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ২ হাজার ১৯৪ টন আম রপ্তানি হয়েছিল। ২০২৪ সালে রপ্তানি হয়েছিল ১ হাজার ৩২১ টন। আর ২০২৩ সালে ৩ হাজার ১০০ টন রপ্তানি হয়েছিল, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। গত কয়েক বছরে রপ্তানির পরিমাণ আড়াই থেকে তিন হাজার টনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
রপ্তানিকারকেরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চ বিমান ভাড়া। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে আম রপ্তানিতে প্রতি কেজিতে শুধু বিমান ভাড়াই গুনতে হচ্ছে ৫০০ টাকার বেশি। ফলে উৎপাদন, বাছাই, প্যাকিং, পরিবহনসহ ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৭০০ টাকা। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ ছাড়া পরিকল্পিত কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের সীমাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক মানের গ্রেডিং ও প্যাকিং সুবিধার ঘাটতি, অ্যাক্রিডিটেশন ল্যাবের অভাব, বিমানবন্দরে পর্যাপ্ত কোল্ড চেইন সুবিধা না থাকা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতাও রপ্তানি বাড়ানোর পথে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দেশে আম চাষ লাভজনক হলেও সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও বাজার ব্যবস্থাপনা এখনও দুর্বল। এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি রপ্তানি সম্প্রসারণে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলেই দেশের ক্রমবর্ধমান আম অর্থনীতির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
নতুন সম্ভাবনা মালয়েশিয়ার বাজার
বাংলাদেশের আমের জন্য নতুন সম্ভাবনার বাজার হিসেবে সামনে আসছে মালয়েশিয়া। বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিএমসিসিআই) পরিচালক এবং এসপি অ্যাগ্রো কেয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও সরকারি সমন্বয়ের ফলে মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি তাজা আম রপ্তানির পথ এখন অনেকটাই সুগম হয়েছে। বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার ধারাবাহিকভাবে এ বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে চলতি মৌসুমেই মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি তাজা আম রপ্তানি শুরু করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় আমের বড় বাজার রয়েছে। দেশটিতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী বসবাস করেন। পাশাপাশি স্থানীয় ভোক্তাদের মধ্যেও মানসম্মত আমের চাহিদা বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশের সুস্বাদু আম সেখানে দ্রুত গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে।
আবু হেনা মোস্তফা কামাল আরও বলেন, মালয়েশিয়ার বাজার উন্মুক্ত হলে তা শুধু একটি নতুন রপ্তানি গন্তব্য তৈরি করবে না, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশেও বাংলাদেশের আম প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করবে। এতে দেশের কৃষিপণ্য রপ্তানির বহুমুখীকরণ হবে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি কৃষিপণ্যের গ্রহণযোগ্যতা আরও শক্তিশালী হবে।
তাঁর মতে, এখন প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মান ও খাদ্য নিরাপত্তার সব শর্ত পূরণ করে ধারাবাহিকভাবে রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন নিশ্চিত করা। সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় এবং আধুনিক প্যাকেজিং ও কোল্ড চেইন ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে বাংলাদেশের আম বিশ্ববাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক আরিফুর রহমান বলেন, গত কয়েক বছরে রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। উত্তম কৃষি চর্চা, কন্ট্রাক্ট ফার্মিং, স্বাস্থ্যসম্মত উৎপাদন ব্যবস্থা এবং আধুনিক প্যাক হাউস ব্যবহারের ফলে রপ্তানির ভিত্তি শক্তিশালী হয়েছে। রপ্তানির প্রতিবন্ধকতা দূর করা জরুরি। তা না হলে চাষিরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
তিনি জানান, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের আম রপ্তানির জন্য নতুন বাজার উন্মোচনের প্রচেষ্টা সফলতার পথে রয়েছে। ২০২৩ সালে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়। সে সময় মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমের বালাই ঝুঁকি বিশ্লেষণ (পিআরএ) এবং স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথিপত্র পাঠানো হয়। গত ৭ থেকে ১৩ জুন মালয়েশিয়ার একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে। সফরকালে তারা দেশের বিভিন্ন আমবাগান, উৎপাদনব্যবস্থা, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ, রপ্তানি প্রস্তুতি ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো পরিদর্শন করেন। প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। এখন মালয়েশিয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা। অনুমোদন মিললে শিগগিরই মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি আম রপ্তানির নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য বাজারেও প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
- বিষয় :
- সমৃদ্ধি