ঢাকা মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬

অভিমত

বাংলাদেশের জন্য কেন বাণিজ্য চুক্তি জরুরি

বাংলাদেশের জন্য কেন বাণিজ্য চুক্তি জরুরি
×

ড. এম. মাসরুর রিয়াজ

ড. এম. মাসরুর রিয়াজ

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

গত ৪ আগস্ট দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সেপা) স্বাক্ষর প্রমাণ করে, দেশের বাণিজ্য কূটনীতি ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হচ্ছে। চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য দক্ষিণ কোরিয়ায় অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা পাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ দক্ষিণ কোরিয়ার ৮৭ শতাংশ পণ্যে একই ধরনের সুবিধা দেবে। এর ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে দেশের শিল্পকারখানাগুলো যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ, প্লাস্টিক ও কৃষি উপকরণ আরও প্রতিযোগিতামূলক দামে আমদানি করতে পারবে।

এই চুক্তি আরেকটি বিষয়ও সামনে নিয়ে এসেছে যে এতদিন বাংলাদেশ বড় বাণিজ্যিক সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল মাত্র ৪২১ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৯ শতাংশ কম। তবে এ চুক্তিকে শুধু শুল্ক কমানোর ব্যবস্থা হিসেবে দেখলে হবে না। বরং গত পাঁচ দশকের কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্কে রূপ দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা উচিত।

এর আগে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ জাপানের সঙ্গে প্রথম ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (ইপিএ) স্বাক্ষর করে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে এ দুটি চুক্তি অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এগুলো এটিও মনে করিয়ে দেয় যে আলোচনার মাধ্যমে বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক দেরিতে এগিয়েছে।
ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো অনেক আগেই বিস্তৃত বাণিজ্য চুক্তির নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। তারা সিপিটিটিপি, আরসিইপি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে পৃথক চুক্তির সুবিধা ভোগ করছে। ফলে ভিয়েতনামের রপ্তানিকারকরা কম শুল্ক ও স্থিতিশীল বাণিজ্য নিয়মের সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের অনেক ক্ষেত্রেই সেই সুবিধা নেই।

বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে গেলে এই ব্যবধান আরও বড় হয়ে উঠবে। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, তখন দেশের ৭০ শতাংশেরও বেশি রপ্তানি পণ্যের বর্তমান শুল্ক সুবিধায় পরিবর্তন আসতে পারে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ৭ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের দাম প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। কারণ ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং বিভিন্ন মানদণ্ড পূরণের অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ মোকাবিলা করছেন।
এ কারণে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব চুক্তির মাধ্যমে অস্থায়ী ও একতরফা শুল্ক সুবিধার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ও আলোচনার মাধ্যমে নিশ্চিত বাজার প্রবেশাধিকার পাওয়া সম্ভব। তবে এসব চুক্তির গুরুত্ব শুধু তৈরি পোশাক খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যদিও বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর দেশের মোট রপ্তানি সর্বোচ্চ ৩২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে ধারণা করা হয়। সম্ভাব্য এই রপ্তানি ক্ষতির প্রায় ৯৭ শতাংশই হবে তৈরি পোশাক ও জুতাশিল্পে। আর মোট ক্ষতির ৭৭ শতাংশের কারণ হবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এভরিথিং বাট আর্মস ( ইবিএ) কর্মসূচির অধীনে বর্তমানে পাওয়া শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানো।
বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে চামড়াজাত পণ্য, পাটজাত পণ্য, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা এবং দক্ষ পেশাজীবীদের সেবার জন্যও নতুন বাজার তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল ও আধুনিক প্রযুক্তি কম খরচে আমদানির সুযোগ বাড়বে। এতে দেশের শিল্পকারখানার উৎপাদনশীলতা, পণ্যের মান এবং বৈচিত্র্য বাড়বে। এখনকার বাণিজ্য চুক্তি শুধু শুল্ক কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এতে শুল্ক প্রক্রিয়া সহজ করা, পণ্যের উৎস নির্ধারণের নিয়ম, পণ্যের মান, সেবা বাণিজ্য, ডিজিটাল বাণিজ্য, মেধাস্বত্ব, প্রতিযোগিতা নীতি, সরকারি ক্রয়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, শ্রম অধিকার এবং পরিবেশগত মানসহ নানা বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে।

বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার বড় বাধাগুলোর অনেকগুলোই দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। জটিল কাস্টমস প্রক্রিয়া, অনিশ্চিত নিয়মকানুন, মান যাচাইয়ের সীমিত সক্ষমতা এবং উচ্চ বাণিজ্য ব্যয় অনেক সময় কম শুল্কের সুবিধাকেও কার্যকর হতে দেয় না। ভালোভাবে পরিকল্পিত বাণিজ্য চুক্তি এসব ব্যবস্থার সংস্কারে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে বাণিজ্যকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য করে তুলতে পারে। ফলে এসব চুক্তি অর্থনৈতিক সংস্কার ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের উচিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মতো বড় ও দ্রুত বিকাশমান বাজারের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া। তবে শুধু কূটনৈতিক সাফল্য দেখানোর জন্য একের পর এক চুক্তি করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। প্রতিটি আলোচনায় কোন পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, কোন খাতকে ধাপে ধাপে সুরক্ষা দেওয়া দরকার, কী ধরনের উৎস বিধি প্রয়োজন এবং কীভাবে সুরক্ষামূলক ও পর্যালোচনার ব্যবস্থা রাখা হবে– এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। জাপানের সঙ্গে ‘ইপিএ’ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ‘সেপা’ তাই শেষ গন্তব্য নয়; বরং বাংলাদেশের আরও বিস্তৃত বৈশ্বিক বাণিজ্য সংযুক্তিতে যাওয়া উচিত। 
লেখক : চেয়ারম্যান, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ

আরও পড়ুন

×