বাকস্বাধীনতা ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা
হায়দার আকবর খান রনো
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৩ | ২০:৩৬
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হলো বাকস্বাধীনতা। এটি গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। কেবল ভোট দেওয়াই গণতন্ত্র না। গণতন্ত্র অনেক স্বাধীনতার সমন্বয়। তার মধ্যে বাকস্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সমাবেশ করার স্বাধীনতা, সংগঠন করার স্বাধীনতা, ধর্মঘটের স্বাধীনতা আছে। এসব মিলিয়েই গণতন্ত্র। এটা এক ঐতিহাসিক পর্যায়ের মধ্য দিয়ে আসছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্রিটিশরা আসার আগ পর্যন্ত এখানে সংবাদপত্র ছিল না। ইংরেজদের হাত ধরেই প্রথম সংবাদপত্র এলো, কয়েকজন ইংরেজ সংবাদপত্রের সূত্রপাত ঘটান।
তারপর ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রথম রাজা রামমোহন রায় সংবাদপত্র প্রকাশ করে বাংলা ও ফারসিতে। সেখানে তিনি সতীদাহের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখার সুযোগ সৃষ্টি করেন। তার প্রভাব পড়েছে ব্যাপক। শেষ পর্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীলদের চরম বিরোধিতার মধ্যেও ইংরেজ সরকারের সময় সতীদাহ প্রথা রদ করতে পেরেছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় নীলকরের বিরুদ্ধে যেভাবে লিখেছিলেন, তার জন্য হরিশচন্দ্রকে অনেক খেসারত দিতে হয়েছে। অর্থের অভাবে তাঁকে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়েছে। তাঁকে হেনস্তা করা হয়েছে, এবং খুব অল্প বয়সে তিনি মারা যান। এমনকি যখন সিপাহি মিটিং চলছে তখন কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা অনেকে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় যেমন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কালীপ্রসন্ন সিংহ; তাঁর লেখা বই ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’তে ইঙ্গিত আছে; এর পক্ষে ছিলেন। কিন্তু সেই সময় প্রকাশ করতে পারেননি। হরিশচন্দ্র তাঁর পত্রিকায় খুব কায়দা করে আইন বাঁচিয়ে লিখেছেন। সংবাদপত্রের ইতিহাসে আরেকটি পত্রিকার নাম উল্লেখযোগ্য।
১৮৬৮ সালে যশোর জেলার অমৃতবাজার গ্রাম থেকে সাপ্তাহিক অমৃতবাজার পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। পত্রিকাটি নীলচাষিদের ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে লিখত। যখন দেশীয় ভাষায় পত্রিকা প্রকাশ নিষিদ্ধ হয়, তখন তা ইংরেজি ভাষায় প্রকাশ পেত। ১৮৯৯ সালে ভূপাল রাজ্যের শাসনব্যবস্থা সম্বন্ধে একটি গোপন দলিল অমৃতবাজারে ছাপা হলে ইংরেজ শাসকরা ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’ প্রবর্তন করতে বাধ্য হয়েছিল। হরিশচন্দ্রের মতো অমৃতবাজারের সম্পাদক শিশির কুমার ঘোষও সংবাদপত্র জগতে মতপ্রকাশের অনুসরণীয় ঐতিহ্য তৈরি করে গেছেন। আমার ব্যক্তিগত মত, হরিশচন্দ্র সাংবাদিকতা ও সম্পাদনায় যে মান নির্ণয় করে গেছেন, সেটা আজ পর্যন্ত অবর্ণণীয়। কবি নজরুলের ‘ধূমকেতু’ পত্রিকাটি খুব জনপ্রিয় ছিল। এটি প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হয়ে যেত। এই পত্রিকার বহু সংখ্যা বাজেয়াপ্ত হয়েছে। নজরুল কবিতা লেখার জন্য জেল খেটেছেন। তার পাঁচ-পাঁচটি বই নিষিদ্ধ হয়েছে। শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’ নিষিদ্ধ হয়েছে। এমনকি রবীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠি’র ইংরেজি সংস্করণ নিষিদ্ধ হয়েছিল। এগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হয়েছিল।
পাকিস্তান আমলের ঘটনা– খন্দকার ইলিয়াস খুব ভালো লিখতেন। তাঁর লেখা ভাসানী তখন ইউরোপে, বইটা খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। ভাসানী যখন স্টকহোমে গেছেন সেখানে কী বক্তব্য রেখেছেন, সেসব ছিল বইতে। সেটি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সেই নিষিদ্ধের বিরুদ্ধে পাকিস্তান আমলে রিট হয়। রিটে যিনি জজ ছিলেন তিনি নিষিদ্ধ রাখার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। বলেছেন, এই বইয়ে সূর্য সেনকে উজ্জ্বল করে তুলে ধরা হয়েছে, মওলানা ভাসানী বক্তৃতায় তার কথা বলেছেন, বইয়েও তা তুলে ধরা হয়েছে। কে এই সূর্য সেন? একজন ডাকাত, লুণ্ঠনকারী। প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিরুদ্ধে তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। তাঁকে যারা উঁচু করে ধরে সেই বই মুক্ত করায় অনুমতি দেওয়া যায় না।
এটা তো দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার। হ্যাঁ, আমরা বলব সবকিছুর স্বাধীনতা দেওয়া যায় না। স্বাধীনতার সীমা আছে। হাত ঘুরাতে পারেন। কিন্তু আপনার আঙুল মুখের এমন জায়গায় যেন না আসে, যেখানে নাক শুরু হয়– এমন একটা কথা আছে। যেমন ধরেন বাকস্বাধীনতার নামে সুইডেনে কোরআন পোড়াচ্ছে একদল। আইনের দরকার নেই। আপনি কারও ধর্মীয় আবেগের জায়গায় আঘাত করতে পারেন না। রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের ভক্ত। তার যে লেকচার– মানুষের ধর্ম। দ্য রিলিজন অব ম্যান আর মানুষের ধর্ম। ভাষান্তর নয়, দুটো আলাদা বই। দুটোয় উপনিষদের প্রশংসা, উদ্ধৃতি দিয়েছেন। সকালবেলা উঠে রবীন্দ্রনাথের বাবা একটা শ্লোক রোজ পড়তে বলতেন। তাঁর বাবার এটা ইচ্ছে ছিল। আর রবীন্দ্রনাথ তো নাস্তিক নন। সেই রবীন্দ্রনাথ বলছেন গীতাকে সমর্থন করতে পারছেন না। তার যুক্তি হলো– গীতায় শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করছেন। যে রবীন্দ্রনাথ উপনিষদকে প্রশংসা করছেন, তিনি গীতাকে করছেন না। যদি বলেন গীতা, বাইবেল, কোরআন শরিফকে পুড়িয়ে ফেলবেন, তা হয় না। অপমানও করা যায় না।
আপনি অশ্লীলতা কিংবা পর্নোগ্রাফিকে অনুমোদন দিতে পারেন না। ব্যক্তিস্বাধীনতা যা বলে ব্যক্তিশরীরটাও অনুরূপ। আপনার ঘরে যে কেউ চাইলেই ঢুকতে পারে না। কড়া নেড়ে জানান দিয়ে ঢুকবে। বাকস্বাধীনতা এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। নোবেলবিজয়ী অমর্ত্য সেন বলেছেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ও দুর্ভিক্ষের সম্পর্ক আছে। বলেছেন, দুর্ভিক্ষের বিরুদ্ধে প্রাচীর গড়ে তুলতে পারে সংবাদপত্র।
আরও বলেছেন, বাকস্বাধীনতার সঙ্গে উন্নয়নের সম্পর্ক আছে। এক দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক চিন্তা, বৈজ্ঞানিক চিন্তা এসেছে। পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘুরছে– এটা বলার জন্য দার্শনিক ও বিজ্ঞানী জিওর্দানো ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হলো। গ্যালিলিও চার্চের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বললেন, আমি ভুল বলেছি। পরবর্তী সময়ে তিনি তাঁর বক্তব্য গোপনে প্রচার করেছিলেন। গ্যালিলিওর মতো বিজ্ঞানীকে তো অপমান করা হলো। রাষ্ট্র যদি চেপে ধরে তাহলে বিজ্ঞানও তো এগোতে পারবে না। বিজ্ঞানের অগ্রগতির ক্ষেত্রে কোনো কোনো দার্শনিকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যেমন ফ্রান্সিস বেকন। একসময় ইউরোপে অ্যারিস্টটলের বিরোধিতা করা ছিল অপরাধ। অ্যারিস্টটল অত্যন্ত প্রজ্ঞাসম্পন্ন দার্শনিক। তাই বলে কি তাঁর সমালোচনা করা যাবে না?
ধর্মের বিষয়গুলোও এমন। মুসলিমরা বলবে রসুলের বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না। হিন্দু ধর্মের লোকজন বলবে শ্রীকৃষ্ণ, রামচন্দ্রের বিরুদ্ধে বলা যাবে না। খ্রিষ্টানরা বলবে যিশুখ্রিষ্টের বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না। এসব বিশ্বাস। বিশ্বাসে আঘাত করা ঠিক না। আবার, আপনার অধিকার আছে বিশ্বাস না করার। সেইসঙ্গে ধর্মের নামে অযৌক্তিক ও প্রতিক্রিয়াশীল নিয়ম, ব্যবস্থা ও বক্তব্যকেও সাহসিকতার সঙ্গে লড়তে হবে। তবে কোনো সম্প্রদায়ের বিশ্বাসে আঘাত করা যাবে না। কিন্তু গঠনমূলক পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানানো যাবে। আমার স্যার অজয় রায়ের ছেলে অভিজিৎ রায়। তাঁকে কুপিয়ে মারল। বেগম রোকেয়া নারীমুক্তির পক্ষে লেখালেখি ও প্রচারাভিযান চালিয়েছিলেন।
তাঁর কিছু লেখা আজকের যুগেও প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশে নারীমুক্তির পক্ষে এত শক্তিশালী রচনা তাঁর আগে আর কারও নেই। ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন তিনি। ফলে তাঁকে ধর্মের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনি বহু কষ্ট স্বীকার করে প্রতিক্রিয়াশীল মহলের নিন্দা ও ধিক্কার সয়ে মুসলমান মেয়েদের জন্য কলকাতায় স্কুল স্থাপন করেছিলেন। এমনকি পাঠ্যপুস্তকের বাইরে খেলাধুলার ব্যবস্থাও ছিল।
তবে, “ধর্মগ্রন্থগুলো পুরুষ-রচিত বিধিব্যবস্থা ভিন্ন আর কিছুই নহে” লিখলেও বাস্তবতাবোধসম্পন্ন বেগম রোকেয়া স্কুলবাসে পর্দার ব্যবস্থা রেখেছিলেন। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের ছেলে জাগৃতি প্রকাশনীর সাবেক প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে হত্যা করা হয়েছে। যারা মেরেছে তাদের দৃষ্টিতে বইটা তাদের মনমতো হয়নি। তার জন্য মেরে ফেলতে হবে? সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মানে হলো শুধু সরকারের দিক থেকে নয়, সব দিক থেকেই স্বাধীনতা থাকতে হবে। আমি একটা কিছু বলামাত্রই সরকার কিংবা অন্য কেউ ঝাঁপিয়ে পড়বে তা হয় না। এতে অরাজকতা বাড়ে।
লেখক প্রেসিডিয়াম সদস্য বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)