হৃদরোগ চিকিৎসা ঢাকাকেন্দ্রিক
তবিবুর রহমান, ঢাকা ও শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৩
দেশে হৃদরোগে মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ হলেও এর চিকিৎসা ঢাকাকেন্দ্রিক। এ কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হয় দেশের নানা প্রান্তের সেবাপ্রত্যাশীদের। বর্তমানে দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে হৃদরোগ চিকিৎসার জন্য রয়েছে ৩৬টি সেন্টার। এগুলোর ২৮টি ঢাকায়। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে প্রতিদিন গড়ে ১৩০ থেকে ১৫০টি এনজিওগ্রাম, ১০০টি রিং পরানো এবং শতাধিক অস্ত্রোপচার হয়। ৭০০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন দ্বিগুণ রোগীর চাপে সেবার মান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে দেশে আজ সোমবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব হার্ট দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘প্রতিটি হৃদস্পন্দনই জীবন’। বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে মিলে বিশ্ব হার্ট ফেডারেশন প্রতিবছর ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হার্ট দিবস পালনের ঘোষণা দেয় ১৯৯৯ সালে। হৃদরোগ প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০০০ সাল থেকে দিনটি পালিত হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গ্লোবাল রিপোর্ট অন হাইপারটেনশন ২০২৫-এ বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতিবছর ২ লাখ ৮৩ হাজার মানুষ হৃদরোগে মারা যায়। এর ৫২ শতাংশের জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপ। প্রতিবেদনে ওষুধের প্রাপ্যতাকে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং অসংখ্য জীবন বাঁচানোর জন্য অন্যতম সুযোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সম্প্রতি আরও জানিয়েছে, উচ্চ রক্তচাপজনিত স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাকের কারণে প্রতি ঘণ্টায় বিশ্বে ১০০০ জনেরও বেশি মৃত্যু ঘটে, যার অধিকাংশই প্রতিরোধযোগ্য।
গ্লোবাল বারডেম অব ডিজিজ-২ এর তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ৩৬ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয় হৃদরোগে। ফুসফুসের বিভিন্ন সংক্রমণ ও যক্ষ্মায় মৃত্যু হয় ১৯ শতাংশের। দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগে ৯ শতাংশ, কোষের বৃদ্ধিজনিত টিউমারের কারণে ৮ শতাংশ, ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগে ৫ শতাংশ, শিশু ও মাতৃমৃত্যু ৫ শতাংশ, পরিপাকতন্ত্রের রোগে ৪ শতাংশ, অন্ত্রের প্রদাহের কারণে ৪ শতাংশ, স্নায়ুজনিত সমস্যায় ২ শতাংশ ও অন্যান্য কারণে ৮ শতাংশ মৃত্যু হয়।
হৃদরোগে আক্রান্তের হার সর্বোচ্চ
গ্লোবাল বারডেম অব ডিজিজের তথ্য বলছে, হৃদরোগে আক্রান্ত ১৮ শতাংশ মানুষ। ফুসফুসের বিভিন্ন সংক্রমণ ও যক্ষ্মায় ভোগে ১৩ শতাংশ মানুষ। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সমস্যা ১০ শতাংশ, আঘাত ও মানসিক সমস্যা ৭ শতাংশ করে, কোষের বৃদ্ধিজনিত টিউমার সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্র ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগে ৫ শতাংশ, ডায়াবেটিস, কিডনিজনিত সমস্যা, পরিপাকতন্ত্রের সমস্যায় ভোগে ৪ শতাংশ মানুষ। এ ছাড়া অন্ত্রের প্রদাহ, স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা, অপঘাত ও ইন্দ্রিয় অন্ত্রের সমস্যায় ভোগে ৩ শতাংশ মানুষ। অন্যান্য রোগে ভোগে ৯ শতাংশ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর প্রেসিডেন্ট ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, “হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমাতে সাধারণ জনগণসহ দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মরত সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে চিকিৎসাসেবা।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ আল শাফি মজুমদার বলেন, উচ্চ রক্তচাপ হার্টের রক্তনালি সরু করে এর কার্যকারিতা কমিয়ে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। হৃদরোগের ঝুকি কমাতে সঠিক সময়ে উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত ও ওষুধের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ইপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, হৃদরোগের সঙ্গে জড়িত ঝুঁকি কমিয়ে আনাই এবার বিশ্ব হার্ট দিবসের মূল প্রতিপাদ্য। তৃণমূল পর্যায়ে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের হার বাড়াতে পারলে হৃদরোগের প্রাদুর্ভাবও অনেকটা কমে আসবে।
চট্টগ্রামে পরিস্থিতি নাজুক
চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক নগরী বলা হলেও সেখানে চিকিৎসা অবকাঠামো এখনও অত্যন্ত নাজুক। নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ হৃদরোগ হাসপাতাল। বিভাগটিতে সরকারি হাসপাতালে একটি মাত্র এনজিওগ্রাম মেশিন প্রায়ই বিকল থাকে। দুটি ক্যাথল্যাবের মধ্যে একটি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। প্রতিদিন ৩০-৪০ রোগীর এনজিওগ্রামের প্রয়োজন পড়ে। এক মেশিনে গড়ে সেবা দেওয়া সম্ভব হয় মাত্র ১০ জনের। রোগীদের অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘ লাইনে। মাসের পর মাস সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
বিভিন্ন জেলার রোগীরা গুরুতর অবস্থায় চট্টগ্রামে আসেন। চিকিৎসকরা অনেক সময় পরামর্শ দেন ঢাকায় যাওয়ার। কিন্তু গরিব-অসহায় পরিবারের পক্ষে ঢাকা থেকে চিকিৎসা নেওয়া দুঃস্বপ্নের মতো। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে খরচ হয় কয়েক গুণ। সরকারি হাসপাতালে এনজিওগ্রামের খরচ ৫-৭ হাজার টাকা, বেসরকারিতে ২০ হাজার টাকার বেশি। রিং পরাতে খরচ হয় কয়েক লাখ টাকা।
ফেনীর মো. রমিজ উদ্দিনের ছেলে মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বাবার দুইটা রিং লাগবে, শুনছি। বেসরকারিতে করতে গেলে তিন লাখ লাগবে। আমাদের পক্ষে কোনোভাবেই তা সম্ভব না। ডাক্তার বলেছেন, দেরি করলে বিপদ হবে। আমরা অসহায়।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. নূর উদ্দিন তারেক বলেন, ‘প্রতিদিন বাড়ছে রোগীর চাপ। সে অনুপাতে বাড়ছে না যন্ত্রপাতি বা জনবল। একটি এনজিওগ্রাম মেশিন দিয়েই অনেক কিছু চালাতে হচ্ছে। রোগীরা দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও চিকিৎসা পাচ্ছেন না; আমরাও বিব্রত।’
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক প্রবীর কুমার দাশ বলেন, ‘হৃদরোগ এখন আর শুধু উন্নত দেশের সমস্যা নয়। আমাদের দেশের মানুষ, বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন না আসায় ঝুঁকি বেশি। কিন্তু চট্টগ্রামে এখনও কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে ওঠেনি। বারবার দাবি জানানো হলেও বাস্তবতা বদলায়নি।
চট্টগ্রামসহ দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে হৃদরোগ চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন না ঘটলে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটসহ রাজধানীর হাসপাতালগুলো আরও বেশি চাপে পড়বে। রোগীরা পড়বে আরও বেশি দুর্ভোগে। ঢাকার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, বরিশালসহ সব বিভাগে পূর্ণাঙ্গ হৃদরোগ হাসপাতাল গড়ে তোলা জরুরি।
- বিষয় :
- হৃদরোগ
