রঙিন সুতা আর সুঁইয়ের নিপুণ কারিকুরি
মুনসী লিটন, খোকসা (কুষ্টিয়া)
প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:৪৪
রঙিন সুতা আর সুঁইয়ের নিপুণ কারিকুরিতে এলাকার নারীদের ভাগ্য বদল করে চলেছেন গৃহবধূ রাশিদা খাতুন। তারা সবাই খণ্ডকালীন নকশিকাঁথা সেলাই ও কাপড়ের ওপর নানা ধরনের নকশা ফুটিয়ে তুলছেন আপন মনে। চোখ জুড়ানো কারুকর্ম করে আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে উঠেছেন। তাদের দেখাদেখি অন্য নারীরাও এ কাজের প্রতি ঝুঁকছেন। কোনো বড় কোম্পানির কাজ পেলে পরিধি বাড়াতে চান এই নারী।
কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলা সদরের ওসমানপুর ইউনিয়নের দেবীনগর গ্রামে ২০ বছর আগে বউ হয়ে আসেন রাশিদা খাতুন। স্বামী আব্দুল আলীমের দুই বিঘা জমির চাষাবাদের কাজে সহযোগিতা করেও অনেক সময় শুয়ে-বসে কাটাতে হতো। স্বামীকে দিয়ে হঠাৎ একদিন একটু রঙিন রেশমি সুতা আনিয়ে জামার পকেটে গোলাপ ফুল তৈরি করার মধ্য দিয়ে তাঁর সেলাইয়ের কাজের পরিচিতি ঘটে এলাকায়। এ বাড়ি-সে বাড়ি থেকে তরুণীদের কাজ শেখানোর ডাক পড়তে শুরু করে।
উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার দপ্তরের তথ্যমতে, গত আট বছরে এই দপ্তর থেকে প্রায় ৭০০ নারীকে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বুটিক-বাটিক, কাঁথা সেলাই, টেইলারিং ও বিউটিশিয়ান ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই রাশিদা খাতুনের। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলে পড়ালেখা করেছেন। কৈশোরে বান্ধবীর সঙ্গে সুতার কাজ করতে করতে তাঁর কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে নিজেই এখন রঙিন সুতার কাজের প্রশিক্ষক। নিজের ভাশুর (স্বামীর বড় ভাই) ও দেবরদের স্ত্রী তন্নী খাতুন, ফজিলা খাতুন, কাকলী খাতুন, সুমাইয়া খাতুনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাঁর দলে স্কুলছাত্রী লিমা, পিংকী, সানজিদাসহ ১২ জন নারীশ্রমিক কাজ করেন। তারা সবাই একসঙ্গে একই ঘরের বারান্দায় বসে নকশিকাঁথা ও কাপড়ে নকশা (ফুল) তোলার কাজ করেন। একসঙ্গে কাজ করলে কাজ বেশি হয়। তাই চারজন করে একটি কাঁথা সেলাই করে থাকেন। বেশি নকশা থাকলে মাসে একটি কাঁথার কাজ সম্পন্ন করা যায়। এ ধরনের কাঁথার মজুরি ৭-৮ হাজার টাকা হয়। তাঁকে দেখে গ্রামের অনেক নারী রঙিন সুতার কাজের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। প্রত্যেক শ্রমিক খণ্ডকালীন কাজ করে ৪-৫ হাজার টাকাও মাসে আয় করে থাকেন। এই নারীদের স্বামীরা কেউ প্রান্তিক কৃষক, কেউ আবার রাজমিস্ত্রির সহযোগী হিসেবে কাজ করেন।
গত ১৮ নভেম্বর সকালে সরেজমিনে দেবীনগর গ্রামের জিকের সাইড ক্যানেলের পাশের কাঁচা রাস্তা দিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার এগিয়ে গিয়ে দেখতে পাওয়া যায় রাশিদা খাতুন ও তাঁর সদস্যদের। ঘড়িতে তখন বেলা সাড়ে ১১টা। স্বামী-সংসার সামলে এক বারান্দায় বসে সবাই একটি রঙিন কাঁথায় নকশা ফুটিয়ে তোলার কাজে ব্যস্ত। ব্যস্ততার ফাঁকেই সবে কাজ শেষ হয়েছে এমন কাঁথা ও কাপড়ে রঙিন সুঁই-সুতার কারুকাজ দেখালেন।
রাশিদা খাতুন তিন সন্তানের মা। তাঁর বড় ছেলে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। মেয়ে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। নিজের সন্তানদের লেখাপড়া, জামা-কাপড়, অসুখ-বিসুখের খরচ সবই আসে তাঁর নিজের কাঁথা সেলাইয়ের উপার্জন থেকে। আগে দুই বিঘা জমিতে চাষাবাদ ছিল। এখন ইজারা নিয়ে পাঁচ বিঘা জমিতে চাষাবাদ করছেন তারা। সংসারের খরচ ও চাষাবাদের কাজে টাকা লাগলে স্বামীকেও মাঝেমধ্যে সহায়তা করে থাকেন তিনি।
রাশিদা খাতুন জানান, কাপড়ে রঙিন সুতার ফুল তুলে ও নকশিকাঁথা তৈরির কাজ দিয়ে শুধু নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করেননি। ভাগ্য বদলে দিয়েছেন তিন দেবর, ভাশুর ও প্রতিবেশী ৫-৬টি পরিবারের। তারা সবাই এখন নিজের মতো কাজ করতে শিখেছেন। অধিকাংশ কাঁথা খোকসা উপজেলা সদর থেকে প্রিন্ট করে এনে তার ওপর রঙিন সুঁই-সুতার কাজ করতে হয়। তিনি বলেন, আগে তাদের শ্রমিক সংকট ছিল। এখন কাজও বেড়েছে, শ্রমিকও বেড়েছে। বড় প্রতিষ্ঠানের কাজ পেলে তিনি বাড়িতে একটি কারখানা করবেন বলে মনের কোণে স্বপ্ন বুনছেন।
এই দলের সদস্য কাকলী খাতুন জানান, কাজ করতে করতে এখন অভিজ্ঞ শ্রমিক হয়ে গেছেন তারা। তাদের প্রচুর কাজ আছে। নিজের আয় থেকে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়াসহ সব চাহিদা পূরণ করতে পারেন। এই আয় থেকে স্বামী হাসান আলীকেও টাকা দিয়ে থাকেন তিনি। এখন আর স্বামীর ওপর ভরসা করতে হয় না।
ওসমানপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য আবু রাশেদ কিরণের ভাষ্য, গ্রামের বেশির ভাগ বাড়ির নারীরা রঙিন সুতার নকশা তোলার কাজ করেন। এ কাজ করে অনেক নারী দক্ষ হয়ে উঠেছেন। এখন প্রচুর পরিমাণে কাজ এলে তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের নারীদের ভাগ্য বদলে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
খোকসা উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা রুবি আক্তার বলেন, তাঁর দপ্তর থেকে অনেক নারীকে বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তাদের অনেকেই নিজেরা কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। কিন্তু এ নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য সরকারের কোনো প্রকল্প নেই। তাদের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে বড় প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, রঙিন সুতার কাজের দক্ষ নারী শ্রমিকের অভাব নেই। তাদেরও কিছু করার নেই।
- বিষয় :
- নকশিকাঁথা
- কুষ্টিয়া
- নারী উদ্যোক্তা
