বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের গুরুত্ব
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৯ | আপডেট: ২৮ জুলাই ২০২৬ | ১২:৪০
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভাইরাল হেপাটাইটিসে সংক্রমণ ঘটতে পারে সংক্রমিত রক্তের সংস্পর্শে (এইচবিভি, এইচসিভি ও এইচডিভি), সংক্রমিত দেহ তরলের মাধ্যমে (এইচবিভি ও এইচডিভি), দূষিত পানির মাধ্যমে (এইচএভি ও এইচইভি) এবং দূষিত খাদ্যের মাধ্যমে (এইচএভি)। যেখানে এইচবিভি (হেপাটাইটিস বি ভাইরাস) সংক্রমণ ব্যাপক, সেখানে অধিকাংশ দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ঘটে। এটি সাধারণত জন্মের সময় মা থেকে শিশুর মধ্যে সংক্রমণ অথবা খোলা ক্ষত বা ঘায়ের উপস্থিতিতে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়।
এইচসিভি (হেপাটাইটিস সি ভাইরাস) সংক্রমণের সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো অনিরাপদ ইনজেকশন ও চিকিৎসা পদ্ধতি, যথাযথভাবে পরীক্ষা না করা রক্ত সঞ্চালন এবং মাদক ইনজেকশন ব্যবহারকারীদের মধ্যে একই সূচ ও সিরিঞ্জ ভাগাভাগি করে ব্যবহার করা।
সব ধরনের ভাইরাল হেপাটাইটিসই তীব্র লিভারের প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। তবে এইচবিভি, এইচসিভি এবং এইচডিভি (হেপাটাইটিস ডি ভাইরাস) দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে, যারা শৈশবে বা ৫ বছরের কম বয়সে এইচবিভিতে আক্রান্ত হয়, তাদের দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি- প্রায় ৯৫ শতাংশ।
বিশ্বব্যাপী ভাইরাল হেপাটাইটিসজনিত মোট মৃত্যুর ৯৫ শতাংশেরও বেশি ঘটে এইচবিভি ও এইচসিভি সংক্রমণের কারণে। অবশিষ্ট মৃত্যুর জন্য দায়ী এইচএভি (হেপাটাইটিস এ ভাইরাস), এইচডিভি এবং এইচইভি (হেপাটাইটিস ই ভাইরাস)। ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ১১ লাখ মানুষ এইচবিভিজনিত লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারে মারা গেছেন। একই বছরে আনুমানিক ২ লাখ ৪০ হাজার মানুষ এইচসিভিজনিত সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারে মারা গেছেন।
১৯৯০-এর দশক থেকে ৯৫ শতাংশ কার্যকারিতা সম্পন্ন হেপাটাইটিস বি টিকা দীর্ঘস্থায়ী এইচবিভি সংক্রমণের জন্য কার্যকর (যদিও আজীবন গ্রহণযোগ্য) অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা। ২০১৫ সাল থেকে চালু হেপাটাইটিস সি-এর জন্য মাত্র ১২ সপ্তাহের অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসায় নিরাময়ের হার প্রায় ৯৫ শতাংশ। এই চিকিৎসা সহজলভ্য থাকা সত্ত্বেও ভাইরাল হেপাটাইটিস এখনও বিশ্বের অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে।
বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের তাৎপর্য
বিশ্বব্যাপী রোগী কল্যাণ সমিতি এবং জনমতের ব্যাপক প্রচার প্রচারণার কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১০ সালের ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলি একটি নীতি গ্রহণ করে। হেপাটাইটিস বি-এর আবিষ্কারক প্রফেসর বারুচ স্যামুয়েল ব্লমবার্গের জন্মদিনকে স্মরণীয় করে রাখতে ২৮ জুলাইকে ‘বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস’ ঘোষণা করা হয়। প্রফেসর বারুচ স্যামুয়েল ব্লমবার্গ শুধু হেপাটাইটিস বি-এর আবিষ্কারকই নন, তিনি এই ভাইরাসের প্রতিষেধক বা টিকাও আবিষ্কার করেন; যে কারণে তিনি ১৯৭৬ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। বিভিন্ন বছর বিভিন্ন স্লোগান নিয়ে এই দিবস পালিত হয়ে আসছে।
হেপাটাইটিস বি-এর অতি কার্যকরী টিকা এবং হেপাটাইটিস বি ও সি-এর নিরাময়যোগ্য ওষুধ নাগালযোগ্য হওয়ায় ২০১৬ সালে ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলি একটি উচ্চাভিলাষী প্রস্তাব গ্রহণ করে; যেখানে ২০২০ সালের মধ্যে সব সদস্য দেশগুলোকে নীতিমালা প্রণয়ন করতে বলা হয়, যেন ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিসকে বিশ্ব থেকে নির্মূল করা যায়। এসডিজি অর্জনে এই প্রস্তাবকে একটি মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয়েছে।

এইচবিভি সংক্রমণের বর্তমান অবস্থা
২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ২৪ কোটি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী এইচবিভি সংক্রমণে আক্রান্ত ছিলেন; যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২ দশমিক ৯ শতাংশ। তাদের মধ্যে ৫ শতাংশেরও কম ব্যক্তি চিকিৎসা পাচ্ছিলেন, যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ (২০২৪) নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রায় ৫০ শতাংশ রোগী চিকিৎসার উপযুক্ত।
বাংলাদেশে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় ২০০৩ সাল থেকে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জন করেছে।
এইচসিভি চিকিৎসার বর্তমান অবস্থা
২০১৫ সাল থেকে চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত মোট ৬ কোটি ৮০ লাখ এইচসিভি আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মাত্র ২০ শতাংশ চিকিৎসা পেয়েছেন।
২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিসকে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি হুমকি হিসেবে নির্মূল করার বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনের অগ্রগতি বর্তমানে সঠিক পথে নেই। ভাইরাল হেপাটাইটিস প্রতিরোধ ও চিকিৎসার জন্য কার্যকর ও প্রমাণভিত্তিক হস্তক্ষেপ ইতোমধ্যেই বিদ্যমান। তবে বিশেষ করে যেসব দেশে রোগের বোঝা সবচেয়ে বেশি, সেখানে এসব কর্মসূচির দ্রুত ও ব্যাপক সম্প্রসারণ এখন অত্যন্ত জরুরি। এর মাধ্যমেই ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিসকে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি হুমকি হিসেবে নির্মূল করার বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।
অধ্যাপক ডা. মো. গোলাম আযম
সাধারণ সম্পাদক, হেপাটোলজি সোসাইটি, ঢাকা, বাংলাদেশ।
বিভাগীয় প্রধান, লিভার ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগ, বারডেম।
Email: [email protected]
- বিষয় :
- দিবস আজ