ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

গৃহশ্রমিকদের সামাজিক মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে

গৃহশ্রমিকদের সামাজিক মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে
×

--

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

দেশে গৃহশ্রমিক নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন বেড়ে চলেছে। এ বিষয়ে সরকার নীতিমালা প্রণয়ন করলেও এর যথাযথ বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ এবং আইনি কাঠামো না থাকায় নির্যাতন থামানো যাচ্ছে না। একে তো গৃহশ্রমিকরা তীব্র অর্থকষ্টে ভোগেন, করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে তারা পড়েছেন নতুন সংকটে। তাদের কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে এসেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক পেশায় রূপ নিয়ে প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান এবং আইনি স্বীকৃতির মাধ্যমে গৃহশ্রমিকের সামাজিক মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। গত ২৫ জুন বৃহস্পতিবার সকালে এক অনলাইন সেমিনারে বক্তারা এ দাবি জানান। আন্তর্জাতিক গৃহশ্রমিক দিবস উপলক্ষে সুনীতি প্রকল্পের উদ্যোগে এ সেমিনার আয়োজন করা হয়। এতে সহযোগিতা করে দৈনিক সমকাল। সেমিনারে সরকারি নীতিনির্ধারক, নিয়োগকারী, ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ, গবেষক, শিক্ষাবিদ, মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠনের প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং সাংবাদিক ও মিডিয়া প্রতিনিধিরা মতামত ব্যক্ত করেন।
মো. হাবিবুর রহমান সিরাজ
সমাজে গৃহশ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে আইএলও কনভেনশন-১৮৯ প্রণয়নে সরকার আইএলসিতে ভোট দেয়। তার আলোকে একটি নীতিমালাও প্রণীত হয়েছে। তবে শুধু নীতিমালা প্রণয়ন হলেই যে তাদের সমস্যার সমাধান হবে না, সেটি প্রমাণিত হয়েছে। তাদের সামাজিক মর্যাদা ও সুরক্ষার জন্য দরকার সেই নীতিমালার বাস্তবায়ন। পাশাপাশি আইনেরও দরকার রয়েছে। আইন হলেই নীতিমালা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। এখন কেউ কেউ বলছেন, দেশে গৃহশ্রমিকের সংখ্যা ১৩ লাখ, আবার কেউ বলছেন ৩০ লাখ। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে। শহরের পাশাপাশি গ্রামেও এখন ঘরে ঘরে গৃহশ্রমিক রয়েছে। আমরা চাই এমন একটি সময় আসুক, যখন আর কোনো গৃহশ্রমিক পাওয়া যাবে না। দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, আমার বিশ্বাস, সবাই সচ্ছল হবে। তখন ঘরের কাজের জন্য কাউকে পাওয়া যাবে না। তবে যে পর্যন্ত সে ধরনের পরিবেশ আসছে না, সে সময় পর্যন্ত আমাদের উচিত গৃহশ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা। আজকের এই আলোচনার সারসংক্ষেপ নির্ধারণ করে সরকারের কাছে পেশ করতে হবে। সরকার যেন গৃহশ্রমিকদের সামাজিক মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
ইসরাফিল আলম এমপি
গৃহশ্রমিকের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণের বিষয়টি নিয়ে সরকার, ট্রেড ইউনিয়ন ও নাগরিক সমাজ সম্মিলিতভাবে শুরু থেকেই কাজ করে যাচ্ছে। আজকের বৈঠকে যেসব বক্তব্য আপনারা তুলে ধরছেন তার সঙ্গে একমত পোষণ করছি। এগুলো সুপারিশমালা আকারে উপস্থাপন করলে সকলের জন্য সহায়ক হবে বলে আমি মনে করি।
শামসুন্নাহার ভূঁইয়া এমপি
করোনা পরিস্থিতিতে শুধু গৃহশ্রমিকরা কাজ হারিয়েছেন, তা নয়। এ অবস্থায় দেশের ৮৫ শতাংশ শ্রমিক কর্মহীন। শ্রমিকরা খুবই দুঃসহ জীবনযাপন করছেন। গৃহশ্রমিকরা অনেকেই খণ্ডকালীন কাজ করতেন। তাদের সিংহভাগই এখন কাজ হারিয়েছেন। তাদের অনেকে এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। করোনার কারণে যারা কাজ হারিয়েছেন, তাদের সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় নানাভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভবিষ্যতেও তাদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনতে সরকার তৎপর থাকবে। ইতোমধ্যে যারা কর্মহীন হয়েছে, তাদের বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থারও নজর রাখা উচিত। তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো গৃহকর্মীদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়ে বেশি মনোযোগী হওয়া। বিশেষ করে তাদের কাজটিকে আত্মমর্যাদার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। এ জন্য সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ব্যাপক আকারে জনসচেতনতা শুরু করার বিকল্প নেই।
রাশেদা কে চৌধুরী
গৃহশ্রমিকদের কল্যাণে প্রণীত নীতিমালাটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। নীতিমালায় যে ১১টি নির্দেশনা রয়েছে, সেগুলো পরিপূর্ণভাবে প্রয়োগ করা হলে আমাদের আর এ বিষয়ে সেমিনার করা লাগবে না। এর সঙ্গে আইনি কাঠামোও দরকার। নিয়োগকর্তার মানসিক পরিবর্তন অনেক বেশি জরুরি। এ জন্য দরকার ব্যাপক জনসচেতনতা। এ ক্ষেত্রে মিডিয়াকে অনন্য ভূমিকা রাখতে হবে। বার্তাগুলো খুব সহজ ভাষায় তৈরি করতে হবে, যাতে সবাই বুঝতে পারেন। বেসরকারি পর্যায়ে গৃহকর্মীদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। সেটি সরকারিভাবে করতে হবে। তাদের নিয়োগ হতে হবে সুরক্ষিতভাবে। বিভিন্ন দেশে গৃহশ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে যে ধরনের সনদপত্র প্রথা চালু রয়েছে, সেটি অনুসরণ করা যেতে পারে। এ বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করতে না পারলে গৃহশ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা কখনোই সম্ভব নয়। এজন্য একটি আইনি কাঠামো প্রয়োজন। উপযুক্ত কারিকুলাম উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গৃহশ্রমিকদের সনদ প্রদান করে তাদের পেশাগত মানোন্নয়নে মনোযোগ দেওয়ার পাশাপাশি নিয়োগকারীদের মানসিকতায় পরিবর্তন ঘটাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
নজরুল ইসলাম খান
গৃহশ্রমিকদের সামাজিক মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই গোলটেবিল বৈঠকে অনেকগুলো আলোচনা উঠে এসেছে। অনেক তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ হয়েছে। এতে গৃহশ্রমিকদের প্রকৃত অবস্থা অনুমান করা যায়। তাদের সমাজে এগিয়ে আনার বিষয়টিতে আমরা সকলেই সম্মত। আমরা চাই, আজকের আলোচনায় উত্থাপিত প্রস্তাবনাগুলোর দ্রুত পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হোক। তাহলে গৃহশ্রমিকদের দীর্ঘদিনের যাতনা ও নির্যাতনের অবসান ঘটবে।
ড. দীপঙ্কর দত্ত
করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শ্রমজীবী মানুষ। এর মধ্যে গৃহশ্রমিকরা অন্যতম। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অংশ গৃহশ্রমিকরা কাজের উদ্দেশ্যে শহরে আসে। কিন্তু করোনা তাদের শহর থেকে বিতাড়িত করেছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য কতটুকু তাদের কাছে পৌঁছেছে, সেটি মনিটরিং করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে ১৩ লাখ গৃহকর্মীর জীবন ও জীবিকা বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যে পড়েছে। গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি-২০১৫ প্রণীত হলেও এর দৃশ্যমান তৎপরতা নেই। গৃহকর্মীদের সুরক্ষা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা নিরলস কাজ করছে। সরকারের উচিত গৃহকর্মীদের জন্য আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। এ গোলটেবিল আলোচনার মাধ্যমে গৃহকর্মীদের জন্য সময়োপযোগী সুপারিশ উঠে আসুক। তা যেন সরকার আমলে নেয় এবং দ্রুত বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
নাজমা ইয়াসমিন
শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-১৭ অনুযায়ী, দেশে গৃহস্থালি কাজের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ। ৮৩ শতাংশই নারী, যাদের মধ্যে বড় অংশই শিশু ও তরুণী। গৃহশ্রমিক নির্যাতনের হার দিন দিন বেড়েই চলেছে। গত বছর দেশে ২৩ জন গৃহশ্রমিক বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। চলতি বছর প্রথম তিন মাসেই ১০ জন মারাত্মক নির্যাতনের শিকার, যাদের মধ্যে অনেকে হত্যাকাণ্ডেরও শিকার হয়েছেন। বিগত নয় বছরে নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছেন ৫১২ জন গৃহশ্রমিক। চলমান করোনা পরিস্থিতিতে গৃহকর্মীরা ভালো নেই। ঢাকার চারটি এলাকায় পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, ৮০ ভাগ গৃহকর্মীর পরিবারে শিশু রয়েছে। ৩০ ভাগের পরিবারে বয়স্করা আছেন। তবে তাদের মধ্যে করোনায় আক্রান্তের হার কম। কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে অনেকে বেতন পায়নি। সরকারের পক্ষ থেকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় নানা সহযোগিতা এবং ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হলেও গৃহকর্মীদের মাত্র ৩৪ ভাগ এর আওতায় আসতে পেরেছেন। তাও এই ত্রাণসামগ্রী দিয়ে মাত্র দুই থেকে তিন দিন চলতে পারে একটি পরিবার। জরুরি অবস্থায় যোগাযোগ করার কোনো উপায় গৃহকর্মীদের নেই। নীতিমালায় যেসব নির্দেশনা ছিল, সেগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তাদের মজুরি, কর্মঘণ্টা নির্ধারণসহ ছুটি, বিশ্রাম ও বিনোদনের বিষয়গুলো সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করতে হবে। নির্যাতনের বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
মোস্তাফিজ আহমেদ
অনেক স্বপ্ন নিয়ে গৃহকর্মীরা শহরে আসেন। কিন্তু আমরা জানি না শেষ পর্যন্ত কতজন তাদের স্বপ্নের পথে ঠিক থাকতে পারেন। তাদের অধিকার বঞ্চনার গল্প জানতে হলে এবং তাদের সামাজিকভাবে সুরক্ষিত রাখতে হলে যথেষ্ট পরিমাণ তথ্য-উপাত্ত দরকার। কিন্তু এ বিষয়ে অনেক ঘাটতি রয়েছে। এমনকি গৃহশ্রমিকদের প্রকৃত সংখ্যা নিয়েও তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। গৃহশ্রমিকদের একটি সুনির্দিষ্ট ডাটাবেজ থাকা দরকার। পরিসংখ্যান ব্যুরো গৃহশ্রমিকের সংখ্যা ১৩ লাখ বললেও এটি আসলে নিশ্চিত না। কোনো কোনো সংস্থার হিসাবে এই সংখ্যা ৩০ লাখ। অনানুষ্ঠানিক পেশার প্রায় চার ভাগই গৃহশ্রমিক। তারা এমনিতেই নানারকম ঝুঁকিতে থাকেন। তার ওপর করোনা তাদের আরও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বর্তমানে ৯৫ শতাংশ গৃহশ্রমিক কাজে যেতে পারছে না। আমি এমন একজনের সঙ্গে কথা বলেছি; যিনি একসঙ্গে তিনটি বাসায় কাজ করতেন। করোনার কারণে একটি বাসায়ও যেতে পারেন না। তিনি বেতনও পাচ্ছেন না। তার মতোই অবস্থা বেশিরভাগ গৃহশ্রমিকের। এসব বিষয় সমাধানে সরকারকে আরও আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে।
নইমুল আহসান জুয়েল
ইতোমধ্যে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে গৃহশ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার কাজ শুরু হয়েছে। এই উদ্যোগ চলমান থাকবে। তাদের সামাজিক নিরাপত্তা, আইনি মর্যাদা বিষয়ে সবাইকে ভাবতে হবে। তবে শুধু নীতিমালা থাকলেই হবে না, আইনি মর্যাদা না দিলে কিংবা আইনের প্রয়োগ না থাকলে এটি কোনো কাজে আসবে না। তাদের মধ্যে দক্ষতার উন্নয়ন হওয়া জরুরি। এখন করোনা পরিস্থিতিতে শ্রমিকরা কাজ হারিয়ে শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছে। গ্রামে গিয়ে তারা কীভাবে জীবন-জীবিকা চালাবে, সেটি এক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। সরকারের উচিত তাদের প্রণোদনার আওতায় আনা। গৃহশ্রমিকদের ডাটাবেজ তৈরি করা সময়ের দাবি। তাদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং সার্বিকভাবে তাদের সরকারি পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা জরুরি। করোনাকালে তাদের আর্থিক সহায়তার আওতায় আনতে হবে। বর্তমানে যে মর্মান্তিক অবস্থা দেখা যাচ্ছে, সেগুলোকে অবশ্যই আমলে নিতে হবে।
রাজেকুজ্জামান রতন
অদৃশ্য করোনা গৃহশ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রের অনুপস্থিতিকে আরও দৃশ্যমান করে দিয়েছে। আমাদের শারীরিক প্রশান্তি, মানসিক স্বস্তিসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক জায়গায় গৃহকর্মীদের যে ভূমিকা রয়েছে, সেটি এখন স্পষ্ট। আমরা গৃহকর্মকে প্রয়োজনীয় মনে করলেও গৃহকর্মীদের গুরুত্বই দিই না। ফলে তাদের সুন্দর ভবিষ্যতে এক অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হতে থাকে। তারা প্রায় সময়ই নির্যাতনের শিকার হন। কোনো কোনো পরিবারে গৃহশ্রমিককে এতদিন গুরুত্বহীন মনে করা হলেও এখন তাদের অনুপস্থিতির যাতনা উপলব্ধি করা যাচ্ছে। নিজেদের বিপদে যাদের গুরুত্ব বোঝা গেছে, তাদের বিপদে পাশে দাঁড়াতে হবে। দুঃখজনক হলো, করোনা পরিস্থিতির কারণে অনেক মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাওয়ার খবরগুলো এলেও কতজন গৃহশ্রমিক এ তালিকায় রয়েছে, সেটির কোনো হিসাব নেই। আমাদের প্রচার মাধ্যমেও তারা ঠাঁই করে নিতে পারেন না। গৃহশ্রমিকদের সুরক্ষায় নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করতে হবে। কাজের দক্ষতা উল্লেখ করে গৃহশ্রমিকদের পরিচয়পত্র প্রদান করা প্রয়োজন। এ কার্ডে তার দক্ষতা এবং পারদর্শিতার বিষয়গুলো উল্লেখ থাকবে। এতে তার নিয়োগের ক্ষেত্রে সেটি কাজে আসতে পারে। এ ছাড়া গৃহশ্রমিকদের জন্য একটি মজুরির মানদণ্ড নির্ধারণ করাও দরকার। নির্যাতিত শ্রমিকদের জন্য ওয়ান স্টপ সেন্টার থাকতে হবে, যাতে তারা তাৎক্ষণিক একটি সমাধান পান। তাদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র দরকার।
আবুল হোসাইন
এমনিতেই গৃহশ্রমিকদের কাজের নিশ্চয়তা, নিয়োগপত্র ও নির্দিষ্ট মজুরি নেই। তার মধ্যে যুক্ত হয়েছে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি। চলমান এই বৈশ্বিক মহামারির কারণে গৃহশ্রমিকরা সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাড়িওয়ালারা এখনও গৃহশ্রমিকদের ঢুকতে দিচ্ছেন না। বেতনও দিচ্ছেন না। এর ফলে তারা প্রচণ্ড রকম আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। তারা একরকম দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতিতে পড়ে গেছে। বাজেটে গৃহশ্রমিকসহ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও বেশি বরাদ্দ দিতে হবে। রাষ্ট্রীয় সহায়তা ছাড়া গৃহশ্রমিকদের বেঁচে থাকা খুবই কঠিন। এদের যদি আমরা বাঁচিয়ে রাখতে না পারি, ভবিষ্যতে দেশে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। সরকার যেন বিষয়টি এখনই আমলে নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেন।
দীপা খন্দকার
খুব বাজে একটি পরিস্থিতি পার করছি। করোনার কারণে গৃহকর্মীরা বেশি খারাপ সময় কাটাচ্ছেন। গৃহশ্রমিকদের অধিকার বিষয়ে বেশি বেশি প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। তাদের পক্ষে নানা রকমের বিজ্ঞাপন দরকার। সেমিনারের পাশাপাশি লিফলেটসহ বৃহৎ পরিসরে সচেতনতামূলক প্রচারণা জরুরি। গৃহকর্মীদের কী ধরনের অধিকার দেওয়া উচিত, কীভাবে তাদের সঙ্গে আচরণ করা উচিত, এ বিষয়ে অনেক মালিক জানেন না। অনেক নিয়োগকারী জানেন না, গৃহশ্রমিকের প্রতি তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিংবা জানলেও এড়িয়ে যান। এ জন্য তাদের বিষয়গুলো আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা উচিত। মিডিয়ায় প্রচারের মাধ্যমে প্রতিটি ঘরে ঘরে গৃহশ্রমিকদের অধিকার বিষয়ক বার্তা পৌঁছে দিতে হবে।
কাজী আব্দুল হান্নান
গৃহকর্মীর বিষয়টিকে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনায় পরিণত করা গেলে নীতিমালার সামগ্রিক বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণের জায়গা আরও জোরদার হবে। ২০১৫ সালে যে নীতিমালা প্রণীত হয়েছে, করোনা-উত্তর বিশ্বে আর সেই পরিস্থিতি থাকছে না। ফলে ওই নীতিমালা আরও সুদূরপ্রসারী হওয়া দরকার। করোনা পরিস্থিতিতে গৃহকর্মীদের আমরা দ্রুত সরিয়ে দিচ্ছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, তাদের কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে এসেছে। বিশেষ করে ঠিকা গৃহকর্মীদের কর্মসংস্থান একেবারেই কমে গেছে। স্থায়ী গৃহকর্মীদেরও কর্মসংস্থান কমেছে। অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবও তাদের ওপরে বেশি পড়তে পারে। করোনা-উত্তর পরিস্থিতিতে গৃহশ্রমিকদের জন্য আগের নীতিমালায় কাজ হবে না। শহরে জীবনে এক ধরনের পরিবর্তন আসবে। আগামীর মন্দা পরিস্থিতিতে তারা কীভাবে কাজ করবেন, সেটিও একটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। গৃহকর্মীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়টিও এখন থেকে মাথায় রাখা উচিত।
শাহীন আক্তার ডলি
আমরা বহুদিন ধরে গৃহকর্মীদের নিয়ে কাজ করছি। মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি যে, যত বেশি সচেতনতা বৃদ্ধি করা যায়, ততই গৃহকর্মীদের নির্যাতনের হার কমে। তবে দুঃখজনক হলো, সচেতনতার কাজটি এক পর্যায়ে গিয়ে থমকে যায়। আজ এতগুলো সংস্থা এখানে একত্র হয়েছি, আমাদের উচিত গৃহশ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে আরও জোরালো ভূমিকা রাখা। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিয়ে আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে গৃহশ্রমিকদের জন্য একটি সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে জনগণের সচেতনতার পাশাপাশি সরকার যেন একটি মনিটরিং সেলকে আরও সক্রিয় করে সে বিষয়ে চাপ প্রয়োগ করতে হবে।
মাহমুদুল হাসান লিখন
করোনাভাইরাসের জন্য গৃহকর্মীদের একটি বড় অংশ কর্মহীন হয়েছে। করোনা একদিন হয়তো শেষ হবে। কিন্তু গৃহকর্মীদের সুরক্ষা এবং তাদের অধিকারের যে জায়গাটি বহুদিন ধরে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছে, সেটি থেকে বের হওয়া এখনও চ্যালেঞ্জই রয়ে গেছে। গৃহকর্মীদের যারা গ্রাহকের বাসায় থাকেন, খাবার বা বাসস্থানের বিনিময়ে কাজ করেন, তারাই সবচেয়ে বেশি নিগ্রহের এবং নির্যাতনের শিকার। আমরা এই জায়গায় পরিবর্তন আনতে চাই। গৃহকর্মীদের ২৪ ঘণ্টা বাসায় নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের একটি নীতিমালা থাকা প্রয়োজন, যেখানে গ্রাহকদের মানবিক মূল্যবোধের এসেসমেন্ট টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হবে। লিভ ইন গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে গ্রাহককে সরকারি নীতিমালা এবং ফ্রেমওয়ার্কের ভেতর আনা গেলে গৃহকর্মী নির্যাতন অনেকটাই বন্ধ হয়ে আসবে। পাশাপাশি কাজপ্রতি পারিশ্রমিকের পরিবর্তে গৃহকর্মীদের কর্মঘণ্টার পরিপ্রেক্ষিতে ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিতকরণে সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
শেখ রওশন আমিন
গৃহকর্মীদের প্রশিক্ষণ আরও উন্নত পর্যায়ে নেওয়ার বিষয়ে আমরা ভাবছি। প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠান যে কোনো খাতেই গৃহকর্মীরা যেন সুযোগ পায়, সেই ব্যবস্থা করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে গৃহকর্মীদের জন্য কাজ করতে হবে। পরিবার থেকে তাদের আমরা কতটা মূল্যায়ন করছি, সেটি আগে সুনিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা এবং প্রতিটি ব্যক্তিপর্যায় থেকে সচেতনতা আরও বাড়াতে হবে। শুধু সভা-সেমিনারে সীমাবদ্ধ থাকলে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে না। তাদের অধিকার, মর্যাদা ও সুরক্ষার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
নাকিব রাজীব আহমেদ
আমরাও গৃহকর্মীদের অধিকার এবং সুরক্ষা নিশ্চিতের বিষয়ে কাজ করছি। তবে তাদের সামাজিক আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে অনেক ঘাটতি রয়েছে। নিয়োগকারীদেরও সুনির্দিষ্টভাবে বোঝা উচিত যে, এটি একটি মর্যাদাশীল পেশা। করোনাভাইরাস পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, গৃহকর্মী একটি পরিবারের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তারা যে কতটা সহায়ক এটি আমরা উপলব্ধি করতে পারছি। আত্মমর্যাদার জায়গা সৃষ্টির জন্য প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ব্যাপক জনসচেতনতা দরকার। এ পেশার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় প্রত্যেক ব্যক্তিকে কাজ করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে গৃহকর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের দরকার। সরকার যে নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, সেটি আরও ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান করতে হবে। নিয়োগকারী পক্ষের দিক থেকে পেশাটিকে মর্যাদাশীল হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সর্বশেষ গৃহকর্মী নিজেও যেন আত্মমর্যাদার বিষয়ে সজাগ থাকেন। সব মিলিয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা থাকতে হবে। সুনীতি প্রকল্প সেটি করার চেষ্টা করছে। সে বিবেচনায় যেন তাদের প্রতি নির্যাতন বন্ধে সবাই তৎপর হয়।
নাজমা আক্তার
আমি নাজমা আক্তার। আমার খুবই খারাপ অবস্থা এখন। কাজকর্ম নেই। তিন থেকে চার মাস ধরে কাজ নেই। যেসব বাসায় কাজ করতাম, সেখান থেকে কোনো খবরাখবর নেয় না। অন্য সময় এক জায়গায় কাজ হারালেও সঙ্গে সঙ্গে অন্য জায়গায় কাজ পেয়ে যেতাম। করোনার কারণে এখন কেউ ডাকেও না। দুই মাস ধরে ঘরভাড়া দিতে পারি না। ভাড়ার জন্য ম্যানেজার অনেক বকাঝকা করে। পরিবার-পরিজন নিয়ে খুবই কষ্টে দিনযাপন করছি। আমাদের দেখার কেউ নেই।
মুন্নি আক্তার
আমরা যেখানে কাজ করতাম, সেখান থেকে আমাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। আমাদের নতুন করে কেউ ডাকছে না। লকডাউনের সময় কেউই আমাদের খোঁজখবর নেয়নি। আমরা এ পরিস্থিতিতে ঘরভাড়া দিতে পারছি না। ঘরভাড়ার জন্য মালিকের পক্ষ থেকে চাপ রয়েছে। করোনা পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হলে আমাদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। সরকার যেন আমাদের বিষয় মন দিয়ে ভাবে।
মো. ইউসুফ আল মামুন
গৃহশ্রমিকদের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তাদের পেশাকে সম্মানযোগ্য এবং তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্যই এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন। দৈনিক সমকাল এ অনুষ্ঠান আয়োজনে সহযোগিতা করছে। এ জন্য সমকালকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে গৃহশ্রমিকরা নিদারুণ কষ্টে দিনযাপন করছেন। তাদের কষ্ট সারাজীবনের। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে তারা আরও বড় দুর্যোগের শিকার। তাদের সামগ্রিক বিষয়গুলো আমলে নিয়ে তাদের জন্য কিছু করার এখনই সময়। বিশেষ করে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অ্যাপসের মাধ্যমে গৃহকর্মী নিয়োগের যে উদ্যোগ চলমান রয়েছে, সেটি আরও প্রসারিত করতে হবে। গৃহকর্মীদের জন্য করোনা পরীক্ষার বিষয়টি ভাবতে হবে। পাশাপাশি তাদের জন্য স্থায়ী স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র নিয়ে সরকারকে অবশ্যই ভাবতে হবে। আজকের আলোচনাটি আমরা সংক্ষেপিত রূপে সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠাব। তারা নিশ্চয়ই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবেন।
সভাপতি
মো. হাবিবুর রহমান সিরাজ
চেয়ারম্যান, বিল্‌স

আলোচকবৃন্দ

ইসরাফিল আলম এমপি
সদস্য, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়
সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি
(এই গোলটেবিলে অংশগ্রহণের পর তিনি গতকাল সোমবার সকালে মৃত্যুবরণ করেছেন)
শামসুন্নাহার ভূঁইয়া এমপি
সদস্য, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়
সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

রাশেদা কে চৌধুরী
নির্বাহী পরিচালক, গণসাক্ষরতা অভিযান

নজরুল ইসলাম খান
মহাসচিব ও নির্বাহী পরিচালক, বিল্‌স

ড. দীপঙ্কর দত্ত
কান্ট্রি ডিরেক্টর, অক্সফ্যাম বাংলাদেশ

নাজমা ইয়াসমিন
সদস্য সচিব, গৃহশ্রমিক অধিকার
প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্ক

মোস্তাফিজ আহমেদ
সহযোগী অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

নইমুল আহসান জুয়েল
যুগ্ম সমন্বয়কারী, শ্রমিক-কর্মচারী
ঐক্য পরিষদ-স্কপ

রাজেকুজ্জামান রতন
প্রতিনিধি, শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ-স্কপ

আবুল হোসাইন
ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী, গৃহশ্রমিক অধিকার
প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্ক

দীপা খন্দকার
অভিনেত্রী ও ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর
সুনীতি প্রকল্প

কাজী আব্দুল হান্নান
সভাপতি, লেবার রাইটস জার্নালিস্ট ফোরাম

শাহীন আক্তার ডলি
নির্বাহী পরিচালক, নারী মৈত্রী

মাহমুদুল হাসান লিখন
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, হ্যালোটাস্ক

শেখ রওশন আমিন
প্রকল্প পরিচালক, ইউসেপ বাংলাদেশ

নাকিব রাজীব আহমেদ
হেড অব প্রোগ্রাম, রেড অরেঞ্জ লিমিটেড

নাজমা আক্তার
গৃহশ্রমিক

মুন্নি আক্তার
গৃহশ্রমিক

সঞ্চালক
মো. ইউসুফ আল মামুন
উপপরিচালক, বিল্‌স

অনুলিখন

জয়নাল আবেদীন
স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সমকাল

আরও পড়ুন

×