ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬

১০টি থ্রি নট থ্রি রাইফেল...

১০টি থ্রি নট থ্রি রাইফেল...
×

আব্দুর রাজ্জাক

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২০ | ১২:০০

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে মার্শাল ল' আইনবিরোধী আন্দোলনে ময়মনসিংহের মধ্যে আমার যে কয়জন সহকর্মীর জেল হয় তাদের মধ্যে গফরগাঁওয়ের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ছালাম, মুক্তাগাছার মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক, ফুলবাড়িয়ার মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট এম এ কুদ্দুস, জালাল, হারুন, শহীদুল্লাহ এবং নজরুল। আমাদের সবারই এক বছরের জেল হয়। ঢাকা জেলের তৎকালীন ২০ নং ওয়ার্ডে আমাদের জায়গা হয়। ঢাকা জেলের দেওয়ানি ওয়ার্ডে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তার পাশের ওয়ার্ডই ছিল ২০ নং ওয়ার্ড। সে সময় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার রাজনৈতিক প্রশিক্ষণখানায় পরিণত হয়েছিল।
১৯৭০ সালে জেল থেকে বের হওয়ার পর আমাদের নেতা মোস্তফা মহসিন মন্টুর সুবাদে বঙ্গবন্ধুর ৩২ নং বাসভবনে তার সঙ্গে সাক্ষাতের সৌভাগ্য হয়। বঙ্গবন্ধুকে আমার কথা বললে, তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে অতিস্নেহে চুমু খেয়ে আদর করেন সেদিন।
৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর থেকে বৃহত্তর ময়মনসিংহে অপ্রকাশিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি চলতে থাকে। টাউন হলে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। পরে ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পর আমরা সুবেদার জিয়াউদ্দিনের তত্ত্বাবধানে আক্রমণ চালিয়ে বিডিআর ক্যাম্পের অস্ত্র দখল করি। হানাদার বাহিনী ঢাকা থেকে ময়মনসিংহের দিকে রওনা হচ্ছে জানতে পেরে আমরা ভৈরবে ও মধুপুরে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হই। ময়মনসিংহ শহর ১৯ এপ্রিল দখলদারদের হাতে চলে যায়। আমি সৈয়দ আহমদের মাধ্যমে ১০টি থ্রি নট থ্রি রাইফেল পেয়েছিলাম; তা নিয়ে চলে যাই ফুলবাড়িয়ার পাহাড়ি অঞ্চলে। মধুপুর, ভৈরব, বিডিআর ক্যাম্পের বাঙালি সৈনিকরাও পাহাড়ি অঞ্চলে চলে আসে। এই অস্ত্র দিয়ে আর্মি, ইপিআর, আনসার, পুলিশ জোয়ানদের নিয়ে গড়ে তুলি শক্তিশালী বাহিনী। আমার বাড়ি ফুলবাড়িয়ায় হওয়ায় পাহাড়ে থাকা, খাওয়া, যোগাযোগের বিষয়টি আমার ওপর বর্তায়। যে কারণে মুক্তিযোদ্ধারা আমাকে নেতা বলে সম্বোধন করতেন।
সেই সময়ে হানাদার বাহিনী ত্রিশাল, ফুলবাড়িয়া, ভালুকায় স্থায়ী ক্যাম্প করেনি। এর মাঝে একদিন মেজর আফসারের নেতৃত্বে আমরা ভালুকা থানা আক্রমণ করে থানার সব অস্ত্র লুট করে নিয়ে আসি। এটাই আমার প্রথম যুদ্ধ। যুদ্ধ শুরুর আগেই ফুলবাড়িয়ার কেশরবাজারের মফিজউদ্দিনের মাধ্যমে একটি রিভলভার আমি পাই। যুদ্ধকালীন সময়ে এলএমজি, এসএমজি, রাইফেল, এসএলআরসহ অন্যান্য অস্ত্র চালানো শিখে ফেলেছিলাম। আমার কোম্পানি ফুলবাড়িয়ার দক্ষিণের পাহাড়ি অঞ্চলে কাটিয়েছি বেশিরভাগ সময়। মুক্তিযোদ্ধাদের নেতৃত্ব দিচ্ছি বলে পাকিস্তানি সেনারা আমার বাড়ি পুড়িয়ে দেয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকস্তানি বাহিনী কালিবাজাইলে অবস্থান নেয়। তারা ফুলবাড়িয়ার দক্ষিণ এলাকায় অবস্থান নিয়ে মেয়েদের আটক করে রেখেছে। এই সংবাদে আমরা সিদ্ধান্ত নিই, যেকোনোভাবেই এখান থেকে পাঞ্জাবিদের গাড়ি যেতে দেব না। তখন ফুলবাড়িয়ার লক্ষ্মীপুর বাজারের পাশে অবস্থান নিয়ে পাক বাহিনীদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। জুলাই মাসের ১৩ তারিখে নায়েক মোজাফফরের নেতৃত্বে বকুল এবং অন্যরা তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পজিশন নিই। হানাদারদের গাড়ি লক্ষ্মীপুর বাজারে প্রবেশ করলে আক্রমণ চালিয়ে তাদের কয়েকটি গাড়ি ধ্বংস করি। এই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে হানাদাররা দেওখোলা থেকে দশমাইল পর্যন্ত সব বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। এ যুদ্ধটি তৎকালীন বিবিসি প্রচার করে। ময়মনসিংহ অঞ্চলে এটিই প্রথম যুদ্ধ।
পাকিস্তানি সেনারা এর পর আমাদের বিরুদ্ধে অপারেশন শুরু করে। মুক্তাগাছা, মধুপুর পাহাড়ি অঞ্চলসহ ফুলবাড়িয়ার রাঙ্গামাটিতে পাকবাহিনী যৌথ হামলা চালায়। তাদের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে লড়াই করার মতো অস্ত্র আমাদের ছিল না। তবুও প্রায় তিন দিন আমরা প্রতিরোধ করি। পরে আমরা ভারতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। ভারতে যাওয়ার পথে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ থানার উচাখিলা অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে আরেকটি যুদ্ধ হয়। আনন্দমোহন কলেজের সাবেক জিএস খোকার চাচা ঈশ্বরগঞ্জ নিবাসী আমাদের সহযোদ্ধা তার রাস্তাঘাট পরিচিত হওয়ায় আমরা অনেকেই সেদিন মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে আসতে পেরেছিলাম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে আমরা কংস নদী পাড়ি দিতে যখন নৌকায় উঠি, তখন হানাদাররা নদী-তীরবর্তী অবস্থান থেকে আমাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। সহযোদ্ধা খোরশেদ দুঃসাহসিকভাবে এলএমজি চালিয়ে কাভার দেওয়ার কারণে আমাদের নৌকাগুলো অপর পাড়ে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিল। পরে আমরা মধ্যনগর হয়ে ভারতে পৌঁছাই। ময়মনসিংহের নেতা সৈয়দ আহমদ আমাকে ভারতের খেরাপাড়ায় অবস্থানরত মুজিব বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে যান এবং আমাকে মুজিব বাহিনীর স্টাফ সেক্টরের কুরিয়ারের ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে শিববাড়ি ক্যাম্পে পাঠান।
এখানে বেশ কয়েকটি যুদ্ধে অংশ নেয় আমার দল। মুজিব বাহিনীর দায়িত্ব পালন করা অবস্থায় আনন্দমোহন কলেজের সাবেক ভিপি আব্দুল হামিদ বদর বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। আলবদরের ক্যাম্প থেকে সুকৌশলে ছাড়িয়ে নিয়ে ভারতে আমার দায়িত্বে থাকা খেরাপাড়ায় মুজিব বাহিনীর ক্যাম্পে পৌঁছাই। রাজনৈতিকভাবে গ্রামগঞ্জে প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলার জন্য মুজিব বাহিনীর জন্ম হয়। প্রতি থানায় থানায় মুজিব বাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুজিব বাহিনীর সদস্যদের স্ব স্ব থানায় পৌঁছে দেওয়াই ছিল আমার মূল কাজ। ১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ শত্রুদের হাত থেকে মুক্ত হয়। ১৪ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ শহরে আসি। সকালবেলা জানতে পারি, ময়মনসিংহের ডাকবাংলোর পেছনে এবং ছোটবাজারে একটি ইন্দিরায় পাকবাহিনী দ্বারা নির্যাতিত শত শত লাশ পড়ে আছে। দুঃখের বিষয়, বর্তমানে সেখানে ইসলামী ব্যাংক তাদের প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছে। এত দাবির পরও সেখানে বধ্যভূমির স্মৃতিচিহ্ন রাখা হয়নি।
ময়মনসিংহের সন্তান সাবেক সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল হারুন উর রশীদ আমার পরিচালনায় লক্ষ্মীপুর যুদ্ধটিকে লক্ষ্মীপুর অ্যামবুশ নাম দিয়ে ময়মনসিংহ সেনানিবাসের জাদুঘরে যুদ্ধে সৈনিকদের নাম, অস্ত্রের বিবরণ এবং রণকৌশল উল্লেখ করেছেন, যা আমার জন্য, এ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের জন্য সম্মানের বিষয়।
লেখক, মুক্তিযোদ্ধা
অনুলিখন :: মীর গোলাম মোস্তফা, ব্যুরোপ্রধান, ময়মনসিংহ

আরও পড়ুন

×