ঢাকা শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

সা ক্ষা ৎ কা র

বঙ্গবন্ধু, আমাদের ভিত্তির স্থপতি

বঙ্গবন্ধু, আমাদের ভিত্তির স্থপতি
×

শাহাবুদ্দিন আহমেদ, বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী

সাক্ষাৎকার গ্রহণ সঞ্জয় ঘোষ

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২০ | ১২:০০

প্রশ্ন :আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, শিল্পী। রণাঙ্গনে অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছেন। এ স্বাধীনতা আর বঙ্গবন্ধুকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বঙ্গবন্ধুকে আপনি কীভাবে দেখেন?
উত্তর :বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলেন আমাদের ভিত্তির স্থপতি। একটা ঘর, একটা বাড়ি যেমন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তার পিলারগুলোর ওপর, বঙ্গবন্ধু আমাদের সেই পিলারগুলো তৈরি করে দিয়ে গেছেন। সে পিলারগুলো এত মজবুত যে, বারবার ঝড়ঝঞ্ঝা এসে ঘরের দেয়াল, দরজা-জানালা সব ভেঙেচুরে ফেলে দিয়েছে- পিলার কিন্তু ভাঙেনি। তার ওপরেই আমরা টিকে আছি। আবার ঘর-দরজা-জানালা তৈরি করছি সবাই মিলে। জয় একদিন আমাদের হবেই।
প্রশ্ন :বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আপনার শৈশবের স্মৃতির কথা বলছিলেন-
উত্তর :বঙ্গবন্ধুকে প্রথম চিনেছি কবে, আজ আর তার দিন-তারিখ বলতে পারব না। তবে তাকে প্রথম দেখেছিলাম পল্টন ময়দানে ছয়দফা আন্দোলনের সময়। আমার বাবা আওয়ামী লীগ করতেন। সেই সূত্রে আমাদের বাসায় আওয়ামী লীগের লোকজনের আসা-যাওয়া লেগেই থাকত। তাদের মুখে এবং বাবার মুখে, চারপাশের সবার মুখে শুনে শুনেই শেখ মুজিবকে চিনতাম ছোটবেলা থেকেই। তিনি আমার বাবার বন্ধু। বাবা সব সময়ই তার নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে গর্ব করতেন। তাকে নিয়ে আমাদের কাছে গল্প করতেন। তখনও তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে ওঠেননি।
আমাদের কলাবাগানের এই বাসায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের প্রায় সব বড় বড় লোকজনই আসতেন। তখন কলাবাগান, শুক্রাবাদ, ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বর এই এলাকাজুড়েই ছিল আমাদের আনাগোনা। ক্রিকেট খেলতে গিয়ে শেখ কামালের সঙ্গে দেখা হতো। কিন্তু প্রথম দিকে এই শেখ কামালই যে বাবার বন্ধু শেখ মুজিবের ছেলে- তা জানতাম না।
তখন আমি ক্লাস সিক্সে পড়ি। হাফপ্যান্ট পরে ঘুরে বেড়াই। সেদিনের কথা আমি জীবনে ভুলব না। বাবার সঙ্গে নিউমার্কেট থেকে বাজার করে ফিরছিলাম- পথে
বাবার এক বন্ধু বাবার সঙ্গে কথা বলছেন, আর বলছেন 'কিরে, তোদের চোর নেতার খবর কিরে?' শেখ মুজিবকে তখনও আমি নিজ চোখে দেখিনি, কিন্তু তার সম্পর্কে এমন বাজে কথা শুনে আমি সহ্য করতে পারিনি। বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, বাবা ওই লোকটা শেখ মুজিবকে চোর বলল কেন! মনে আছে, বাবা সেদিন হেসে বলেছিলেন, আরে ও ঠাট্টা করেছে। ওরা মুসলিম লীগ করত, তাই শেখ মুজিবকে পছন্দ করে না, মেনে নিতে পারে না। কিন্তু সেই বয়সেই আমার তখন বাবার বন্ধুর সেই কথাগুলো গায়ে লেগেছিল। আমার মাথায় শুধু ঘুরছিল, শেখ মুজিব আমার বাবার বন্ধু, ওই লোকটা তাকে নিয়ে কেন বলবে এরকম কথা!
প্রশ্ন :বঙ্গবন্ধুকে প্রথম দেখার অনুভূতি এবং সেই দিনটি সম্পর্কে কিছু বলুন।
উত্তর :সেদিন পুরানা পল্টনে মিটিং ছিল। বাবার মুখে আগেই শুনেছি। অন্য লোকজনের মুখেও শুনেছি। মিটিংয়ের আগেই আমি গিয়ে হাজির হলাম গুলিস্তান সিনেমা হলের সামনে। সেখানে তখন একটা কামান ছিল। সেই কামানের গোড়ায় দাঁড়িয়ে সেদিন প্রথম দেখলাম শেখ মুজিবুর রহমানকে। সেই মুহূর্তটিও আমি কোনোদিনই ভুলতে পারব না। বাবার মুখে অনেক শুনেছি, কিন্তু বুঝিনি। সেদিনই প্রথম বুঝলাম শেখ মুজিব কী জিনিস। সেদিন ভাষণ শুনে সেই ছোট্ট বয়সেই আমি তার প্রেমে পড়ে গেলাম। তিনি ভাষণ দিচ্ছেন, 'আইয়ুব খান তুমি হতে পার লৌহমানব, কিন্তু তোমার খুঁটি নড়ে গেছে।' আমি এই ভাষণ শুনে তো বিস্ময়ে তাকিয়ে আছি। সেদিনই ভাবতে থাকলাম- এই লোক তো যেনতেন লোক নন!
প্রশ্ন :বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ আর দিকনির্দেশনায় যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধের পর বহুবার তার সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছে-
উত্তর :যুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছে অস্ত্র সমর্পণ করতে গিয়ে। অস্ত্র সমর্পণের সময় তিনি আমাদের কয়েকজন তরুণ মুক্তিযোদ্ধাকে একসঙ্গে পেয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বাবারা তোমরা কে কী কর? আমি তো তাকে আগে থেকেই চিনি, বাবার বন্ধু- কিন্তু আমি সেটা তাকে তখন বলছি না। ভাবছিলাম যে, দেখি তিনি আমাকে চিনতে পারেন কিনা! আমি বললাম, আমি আর্ট কলেজে পড়ি, ছবি আঁকি। তিনি অবাক হয়ে বললেন, ছবি আঁকো! দারুণ ব্যাপার তো! তারপর আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, কেমন আঁকো, আমাকে দেখিও তো। এ কথায় আমি তো নিজেই অবাক!
প্রশ্ন :তারপর?
উত্তর :এরপর তো আমার ঘুমই হয় না আর। আর্ট কলেজের হোস্টেলের পেছনে একটা ভাঙা ঘরের মধ্যে, কেউ যাতে দেখতে না পারে, সে জন্য গোপনে ছবি আঁকতে লাগলাম। সাত দিন পর সকাল বেলা সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে আট ফুট বাই চার ফুট সেই ছবিটা নিয়ে গেলাম ধানমন্ডি ৩২ নম্বর। সেখানে গিয়ে অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি, কিন্তু সুযোগ পাচ্ছি না। শুনলাম কেবিনেট মিটিং হচ্ছে। রফিকউল্লাহ চৌধুরী ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সেক্রেটারি। তিনি ছিলেন, হানিফ ভাই [প্রয়াত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ], তোফায়েল ভাইসহ আরও বেশ কয়েকজন মানুষ ছিলেন ওখানে। এক ঘণ্টা পর হানিফ ভাই এসে বললেন, 'শাহাবুদ্দিন, মিটিং শেষ রে- যা না তুই। যাইয়া দেখাইয়া আয়।' ছবিটা নিয়ে দোতলায় উঠতে লাগলাম, সিঁড়ি থেকেই আওয়াজ পাচ্ছিলাম তার কথাবার্তার। উপরে ওঠামাত্রই তোফায়েল ভাইরা বললেন, আরে আরে কী করছ, উনি ব্যস্ত, ভেজাল করিস না তোরা। নিচে নামার সময় দেইখা যাইবোনে'। আমি তাকিয়ে দেখলাম বড় টেবিলের একপাশে অনেক বড় বড় নেতা বসা। তাজউদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, মনসুর আলী, সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ আরও অনেকে। তাদের থেকে একটু দূরে অন্য পাশে বসে বঙ্গবন্ধু তার পাইপ ঠিক করছিলেন। আমাকে দেখে বললেন 'আয়, এদিকে আয়।' বঙ্গবন্ধু যখন আয় বলেছেন, তখন আর আমারে কে আটকায়, এক দৌড়ে তার কাছে পৌঁছালাম ছবিটা নিয়ে। তিনি তো ক্যানভাস দেখে অবাক! বললেন, 'এত বড় ছবি! খোল তো, খোল তো দেখি।' আমি আর আমার মুক্তিযোদ্ধা আরেক বন্ধু মিলে ছবিটা খোলামাত্রই তিনি চিৎকার করে উঠলেন। বললেন, 'এই তাজউদ্দীন, দেখো দেখো কী এঁকেছে। এই তো সোনার ছেলেরা আমার। ওরাই তো একদিন সোনার বাংলা বানাবে।' আমি গিয়ে ওনার পাশে দাঁড়ালাম। বঙ্গবন্ধু তখন বললেন, 'আমি তো পেইন্টিং এত বুঝিটুঝি না রে। বিদেশিরা অনেক ভালো বোঝে এগুলা। ওদেরকে আমি দেখাব। বলব, দেখ আমার দেশের ছেলেরাও আঁকতে পারে। খালি যুদ্ধ করে না, ছবিও আঁকে।' ছবিটা আবার তিনি আরেকবার ভালো করে দেখলেন। তারপর বললেন, 'কোথায় লাগাবি?
ওইখানে দেয়ালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আর শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের ছবি ছিল। তিনি বললেন, 'তোফায়েল, হানিফ সরা এগুলা, ছবিটা এইখানেই লাগাইয়া দে।' ততক্ষণে কেবিনেট মিটিংয়ের সবাই চলে গেছেন। তোফায়েল ভাই, হানিফ ভাই আর ফটোগ্রাফার আলম ছিল। আলম একটা ছবি তুলল।
প্রশ্ন :সেদিনটা নিশ্চয়ই আপনার শিল্পীজীবনে দারুণ অনুপ্রেরণা হয়ে আছে?
উত্তর :ঠিক তাই। সেই ঘটনার পর আমার সবকিছু অন্যরকম হয়ে গেল। তার কাছ থেকে এত বড় পুরস্কার পেয়ে আমার উৎসাহ হাজার গুণ বেড়ে গেল। স্বাধীনতার পর অনেকবার বত্রিশ নম্বরের বাসায় গেছি। এই মহান নেতার সঙ্গে বহুবার বহু কারণে দেখা করার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। তার মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে স্মরণীয় দিনটি হলো যেদিন আমাদের কয়েকজনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু প্রায় এক ঘণ্টা কথা বলেছিলেন। ২৫ মার্চ রাতে তাকে পাকিস্তানি আর্মিরা গ্রেপ্তার করে নিয়ে গিয়েছিল, এ কথা সবাই জানে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে বঙ্গবন্ধুর নিজের মুখে সেই রাতের কথা খুব জানতে ইচ্ছা করত। সেদিন আমরা পাঁচ তরুণ মুক্তিযোদ্ধা একটা কাজে গিয়েছিলাম বত্রিশ নম্বরে। বঙ্গবন্ধু ব্যস্ত ছিলেন। অনেক অপেক্ষার পর যখন তার দেখা মিলল তখন দুপুরের খাওয়ার সময় হয়ে গেছে। আমাদের দেখে বললেন, 'তোরা এখন আসলি! এখন তো কামালের মা খাবার জন্য ডাকাডাকি শুরু করব; আচ্ছা আসছস যখন বয়, বয়।' সেদিনই প্রথম আমি তাকে কাকা বলে ডাকি। বাবার কথা শুনে তিনি আবারও অবাক হয়ে বললেন, 'তুমি তাইজউদ্দিনের পোলা! বল কি!' এই সুযোগে আমি বঙ্গবন্ধুকে কাছে পেয়ে বলে ফেললাম, 'কাকা আমার একটা স্বপ্ন, ২৫ মার্চ রাতে যে আপনাকে ধরে নিয়ে যায়- আপনারে কেমনে নিয়া গেল তারা। সেদিন কী ঘটছিল?'
বঙ্গবন্ধু সেদিন সে ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে অনেক কথা বলেছিলেন। তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার আগে বাড়ির সামনের মোরগ ফুলের বাগান থেকে হাত দিয়ে তিনি এক মুঠ মাটি তুলে নিয়ে তাতে চুমু খেয়েছিলেন। সেদিন আর্মিদের সঙ্গে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়ার আগে বাংলার মাটিতে চুমু খেয়ে তিনি বলেছিলেন, 'জয় বাংলা। হয়তো আর দেখা হবে না।'
প্রশ্ন :আপনি বলছিলেন যে, আপনার প্যারিস গমন এবং পরবর্তী জীবন ও সফলতায় সরাসরি শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান আছে?
উত্তর :হ্যাঁ, একদম তাই। প্যারিসের স্কলারশিপটা পাওয়ার আগে নিউজিল্যান্ডের একটা স্কলারশিপের জন্য আমার নাম দেওয়া হয়েছিল। সেই স্কলারশিপটা পেয়েও ছিলাম আমি। কিন্তু তখন আমি ভাবতাম নিউজিল্যান্ডে কে যায়! এটা কি যাওয়ার মতো কোনো দেশ হলো! আসলে তখন স্বাধীন দেশে নির্দি্বধায় ছুটে বেড়ানোর স্বাধীনতার চেয়ে নিউজিল্যান্ড যাওয়াটা আমার কাছে ভালো মনে হচ্ছিল না। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের স্কলারশিপটা না নেওয়ায় একদিন আমার উপস্থিতিতেই বঙ্গবন্ধুর কাছে আমার নামে নালিশ করে বসেছিলেন তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ইউসুফ আলী সাহেব। সেদিন একজনের পেনশনের টাকার সমস্যা নিয়ে সচিবালয়ে গিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। বয়স কম আর একটু দুষ্ট, সাহসী ছিলাম বলে হয়তো নানা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়ও চলে যেতাম। সেদিন নানা চেষ্টা-চরিত্র করে যখন সচিবালয়ের ওই কক্ষে পৌঁছালাম, তখন সেখানে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন জেনারেল ওসমানী সাহেব, তোফায়েল আহমেদ আর ইউসুফ আলী সাহেব। কাজ শেষে যখন চলে আসব, ইউসুফ আলী সাহেব বললেন, 'বঙ্গবন্ধু, ও তো আমাদের মাথা হেঁট করে দিয়েছে।' আমি তো থতমত খেয়ে গেলাম! বঙ্গবন্ধুও বললেন, 'কেন! কী করেছে ও?।' ইউসুফ সাহেব তখন বললেন, 'নিউজিল্যান্ড সরকারের স্কলারশিপ পাঠিয়েছি ওর নামে। ও সেটা রিজেক্ট করে দিয়েছে। তাদের কাছে আমার মাথা হেঁট হয়ে গেছে।' আমি তো ভয়ে শেষ। কিন্তু কি আশ্চর্য ব্যাপার। আমাকে এবং আমার মনে হয় তখন সেই ঘরের সবাইকে অবাক করে দিয়ে বঙ্গবন্ধু বললেন, 'শোনো নিউজিল্যান্ড একটা দেশ হইল?' তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'শাহাবুদ্দিন, তোকে প্যারিসে যেতে হবে। তুই পারবি না? তোরা তো মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিস, এবার পারবি না পিকাসোর চেয়ে বড় শিল্পী হতে?' আমার শরীরে কেমন এক শিহরণ ঘটে গেল। যেন জেগে উঠলাম এক মহামানবের স্বপ্নের সোনার বাংলায়।
প্রশ্ন :বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জীবনের শেষ দেখার দিনটির কথা কিছুটা বলবেন?
উত্তর :১৯৭৪ সালের অক্টোবর মাসে আমি চলে গেলাম ফ্রান্সে। যাওয়ার আগে শেষ যেদিন তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, সেদিন তার চোখে জল দেখেছিলাম। চুয়াত্তরের বন্যার ত্রাণ তহবিলে দেওয়ার জন্য আমি ছবি এঁকে, বিক্রি করে সাতাশ হাজার টাকার একটা চেক নিয়ে গিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর কাছে। চারদিকে সমস্যা। সামাল দেওয়া যাচ্ছে না দেশের দুর্নীতি। সেই চেক হাতে নিয়ে তিনি সেদিন কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চশমাটা খুলে আমাকে বললেন, 'এই টাকা। কী হবে এটা দিয়ে আমার! এটা তুই তোর বাবাকে দিয়ে দে। তোর বাবাকে কিছুই তো দিতে পারলাম না।' আমি বললাম, না কাকা। আমি এটা মানুষের জন্য করেছি। তখন সেদিন এই এক বড় মানুষকে দেখলাম আমার মাথায় হাত দিয়ে কেঁদে ফেললেন। বললেন, 'বেঁচে থাক'।
আমি বেঁচে আছি। শুধু তাকেই এই বাংলার মাটিতে বেঁচে থাকতে দিলো না ওরা।
প্রশ্ন :১৫ আগস্ট আপনি কি ফ্রান্সে? বঙ্গবন্ধুকে হত্যার খবর যখন শুনলেন- সেই দিনটির কথা কিছু বলুন।
উত্তর :হ্যাঁ, আমি তখন ফ্রান্সে। প্রথমে শুনে বিশ্বাস করতে পারিনি। সেদিন আমি একটা সৈকতে বসে আছি। ফ্রান্সে আমার এক ফরাসি আন্টি ছিলেন- তন্‌ত ইবন। আন্টি নামেই ডাকতাম তাকে। সেই আন্টি সেদিন দৌড়ে এসে আমাকে বলছিলেন, শাহাবুদ্দিন, তোর সঙ্গে যে একটা লোকের ছবি দেখেছিলাম, লম্বা-চওড়া হ্যান্ডসাম একটা লোক- একটু আগে তাকে দেখিয়েছে টিভিতে। তোদের দেশে কী যেন একটা হয়েছে! কী যেন একটা সাংঘাতিক কিছু হয়েছে। আমি বললাম, বাংলাদেশে আবার কী হবে! ধুর তুমি কী দেখেছ না দেখেছ! আন্টি নিশ্চিত করে বলতে পারছিলেন না। কিন্তু আধঘণ্টা পর আন্টির বোন ফোন করে একই কথা বললেন। বললেন, ঢাকার রাস্তায় নাকি সৈন্য দেখা গেছে। কী যেন একটা হয়েছে। পরের দিন ভোরবেলা টিভির সামনে বসে আছি। পাই না, পাই না, হঠাৎ দেখলাম বলছে, 'ইন বাংলাদেশ, দ্য টাইগার অব দ্য স্টেট ওয়াজ কিল্ড।' আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। যে মানুষ দেশের মানুষকে এত ভালোবাসতেন, সে মানুষকে দেশের ভেতরেই এভাবে হত্যার শিকার হতে হবে।

আরও পড়ুন

×