ঢাকা শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

সা ক্ষা ৎ কা র

বঙ্গবন্ধু বললেন- দেশের মানসম্মান রাখিস

বঙ্গবন্ধু বললেন- দেশের মানসম্মান রাখিস
×

কাজী সালাউদ্দিন, বাফুফে সভাপতি

সাক্ষাৎকার গ্রহণ সঞ্জয় সাহা পিয়াল

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২০ | ১২:০০

প্রশ্ন :বঙ্গবন্ধুকে প্রথম দেখা, প্রথম কথা...
উত্তর :সত্তর... না না, সালটা ছিল ১৯৬৮। আমি আর কামাল (শেখ কামাল) একই স্কুলে পড়তাম। তো আমরা দুপুর বেলায় স্কুলের পরে একেক দিন একেক জনের বাসায় ভাত খেতে যেতাম। সেদিন ছিল কামালের বাসায় খাবারের পালা। আমি, কামাল আর তান্না (তানভীর মাজহারুল ইসলাম) স্কুলড্রেস পরেই গিয়েছিলাম। আমরা তিনজন খেতে বসেছি, তখন বঙ্গবন্ধু কোথাও বেরোচ্ছিলেন। উনাকে দেখে আমি সালাম দিলাম। তিনি বললেন, তোমরা কি স্কুল থেকে এসেছো? আমি বললাম- জি, আমরা স্কুল থেকে এসেছি। এই হলো বঙ্গবন্ধুকে আমার প্রথম দেখা। সেদিন এর বেশি আর কথা হয়নি। পরে বহুবার তার সঙ্গে বাসায় দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। বাসার বাইরে মাঠে এবং ৭ মার্চের ঐতিহাসিক জনসভায় বঙ্গবন্ধুর কাছে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে।
প্রশ্ন :৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর সেই কালজয়ী ভাষণ আর বজ্রকণ্ঠে মুক্তির ডাক- সেদিনের কথা মনে পড়লে কী অনুভূতি হয়?
উত্তর :ওই ভাষণটা তো এখনও গায়ে কাঁটা দেয়। তিনি বললেন- ভাতে মারব, পানিতে মারব...। মঞ্চের সামনে যেসব মানুষ বসা ছিল, সেখানেই ছিলাম। তখন স্কুল থেকে মাত্র কলেজে গিয়েছি। টগবগে যুবক, বঙ্গবন্ধু তখন আমাদের যা বলবেন, আমরা তা-ই করতে প্রস্তুত ছিলাম। তখনই যেন যুদ্ধে নেমে যাব- ব্যাপারটা এমন ছিল। সেদিন ঢাকা ছিল লোকারণ্য। আমি কিন্তু ৫০ বছর আগের কথা বলছি। তখনই সবাই যুদ্ধের জন্য
নেমে যাওয়ার মতো অবস্থায় ছিল। সেই সময়কার কথা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। এর অনুভূতিই অন্যরকম। আমার মতে, বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষণের পর সেদিনই দেশ স্বাধীন হয়ে গিয়েছিল। গোটা ইতিহাসটাই আমি সামনে থেকে দেখেছি।
প্রশ্ন :তখন আপনারাও (শেখ কামালের বন্ধুরা) কি বঙ্গবন্ধু বলে ডাকতেন?
উত্তর :আমি তখন ঢাকা কলেজে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছিলাম। আমার সৌভাগ্য হয়েছে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে অনেকবার কথা বলার, বাসায় দেখা হওয়ার। আর মাঠে একসঙ্গে ফটোসেশন করার। আসলে তখন আমরা তাকে চাচা বলেই ডাকতাম। আমার বন্ধুরাও তাই।
প্রশ্ন :বন্ধুর পিতা আর জাতির পিতা, আপনার কাছে এই দুই পরিচয়ে কোনো পার্থক্য ধরা পড়েছিল কি?
উত্তর :আমার কাছে কোনো পার্থক্য মনে হয়নি। আমি স্বাধীনতার আগে যেটা পেয়েছি, স্বাধীনতার পরে যা পেয়েছি- সবকিছু একই ছিল। তিনি খুবই আন্তরিক ছিলেন। কখনও মনে হয়নি বঙ্গবন্ধুর বাসায় এসেছি। আর কামাল তো খুব আন্তরিক ছিল। মাঝেমধ্যে কামাল আমার বাসায় আসত। সে আমার বাবার সঙ্গে কথা বলত। তখন তো আমার বয়সও ওইরকম ছিল না, আমি রাজনীতি বুঝতামও না। আমি বঙ্গবন্ধু হিসেবে নয়, আমার বন্ধুর বাবা হিসেবেই উনাকে মনে করতাম।
প্রশ্ন :খেলাধুলা নিয়ে আপনাদের সঙ্গে কখনও আলোচনা হতো?
উত্তর :১৯৭৫ সালের ৮ আগস্ট জাতীয় দল মালয়েশিয়া যাচ্ছে টুর্নামেন্ট খেলতে। তখন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ফটোসেশন করে আমরা এয়ারপোর্টে গিয়েছিলাম। সেই ছবিটা এখনও আমার কাছে আছে। সেদিন তিনি বলেছিলেন- ঠিকমতো খেলবি, ডিসিপ্লিন অনুযায়ী খেলবি, দেশের মান-ইজ্জত রাখবি। সেটা শোনার পর আমরা আরও উজ্জীবিত হয়ে যাই।
প্রশ্ন :আপনার খেলা কি বঙ্গবন্ধু কখনও মাঠে গিয়ে দেখেছেন?
উত্তর :বঙ্গবন্ধু অনেকবারই মাঠে এসেছেন। আমার কাছে ছবিগুলো আছে। তিনি খেলার প্রধান অতিথি ছিলেন, আমাদের সঙ্গে মাঠের ভেতরে ফটোসেশন করেছিলেন। এটা ১৯৭২-৭৩ সাল হবে। আবাহনী ক্লাব চালাত কামাল, তাই তিনি এটা নিয়ে চিন্তা করতেন না। তিনি সবসময় দেশের কথা বলতেন। বলতেন- দেশের মান রাখবি।
প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মাঠের কোনো স্মৃতি মনে পড়ে কি?
উত্তর :একবার তিনি মাঠে এসেছিলেন, আমার চুল তখন অনেক বড় ছিল। ফটোসেশনের সময় তিনি তার হাতটা আমার মাথার ওপর দিয়েছিলেন। তখন তো গ্যালারি পরিপূর্ণ ছিল। পরদিন রটে যায় বঙ্গবন্ধু নাকি আমাকে বলেছেন চুল কাটতে; কিন্তু এমন কোনো কথাই হয়নি। তো পরের ম্যাচে তখনও আমার লম্বা চুলই ছিল। সবাই তখন বলছিল- বঙ্গবন্ধু বলেছেন চুল কাটতে, তুমি চুল কাটাওনি? তখন আমি বলেছিলাম, বঙ্গবন্ধু আমাকে কখনও বলেননি চুল কাটতে। তারা বুঝেছিল যে, বঙ্গবন্ধু আমার মাথায় হাত দিয়েছেন বুঝি চুল কাটতে বলবেন বলে।
প্রশ্ন :বন্ধুর বাসায় যখন নিয়মিত আড্ডা হতো তখন বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সঙ্গে নিশ্চয় অনেক স্মৃতি রয়েছে?
উত্তর :যখন ওই বাসায় যেতাম তখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর (শেখ হাসিনা) সঙ্গে দেখা হতো। তার ছোট বোন শেখ রেহানার সঙ্গেও দেখা হতো। ওই বাসায় গেলে আমাদের কোনো কিছু বলতে হতো না। তারা আমাদের খুব আপ্যায়ন করতেন। চা, পানি, মিষ্টি চলে আসত আমাদের রুমে। তাদের বাসায় গেলে বঙ্গমাতা বা চাচিকে সালাম দিয়েই আমরা লুকিয়ে যেতাম। আসলে উনাদের সঙ্গে সম্পর্কটা অনেক মধুর ছিল। আপা যখন বিদেশ থেকে আসত, তখন কামালকে বলত- তোর জন্য কী আনব? কামাল বলত, আমাদের দু'জনের জন্য জার্সি আনবে। শুধু কামালের জন্য নয়, আপা জার্সি আনত পুরো আবাহনী টিমের জন্য।
প্রশ্ন :১৫ আগস্টের হৃদয়বিদারক ঘটনাটি কার কাছে প্রথম শুনেছিলেন, মনের অবস্থা ঠিক কেমন ছিল তখন?
উত্তর :১৫ আগস্ট (দীর্ঘশ্বাস, কিছুক্ষণ নীরব...)। আমাদের খেলা ছিল মালয়েশিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে। সন্ধ্যায় খেলা থাকায় সেদিন সকালে একটু দেরি করেই আমি নাশতা করতে নেমেছিলাম লবিতে। সেই সময় তান্না মালয়েশিয়া এসেছিল। আমরা নাশতা করতে করতে এক ভারতীয় শিখ নাগরিক আমাদের টেবিলে এলেন। কুয়ালালামপুরে একমাত্র অ্যাডিডাসের দোকান ছিল তার। ওর দোকান থেকে আমরা বুট, জার্সি কিনতাম। তাই ভালো একটা সম্পর্ক হয়েছিল। তিনি এসে বললেন- তোমার সঙ্গে কথা আছে। তোমার দেশে ক্যু হয়েছে। তোমাদের বঙ্গবন্ধুর গোটা পরিবারকে মেরে ফেলেছে। তিনি আরও বললেন, আমি ভোরবেলায় ব্যাংকে গিয়েছিলাম, ব্যাংকের টেলেক্স বোর্ডে নিউজ আসছিল যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা করা হয়েছে। এই বুলেটিন দেখেই আমি তোমার কাছে এলাম।
তখন নাশতা ফেলে আমি আর তান্না একটা ট্যাক্সি করে বাংলাদেশ অ্যামবাসিতে চলে গেলাম। আমি তখন ট্র্যাক স্যুট পরা। গিয়ে দেখি অ্যামবাসি খালি। শুধু রিসেপশনে একজন পিয়ন বসা। আমরা বললাম, অ্যাম্বাসাডর অফিসে আছেন? উনি বললেন, আছেন। আমাকে দেখে তিনি চিনে ফেলেছিলেন। তখন আমরা তার রুমে ঢুকলাম। আমাদের দিকে তাকিয়ে তিনি মাথা নিচু করে বললেন, তোমরা যা জান, আমিও তাই জানি। এর বেশি কিছু জানি না।
সেদিন আমাদের খেলা। আমরা সবাই হতাশ হয়ে পড়ি। তখন সিদ্ধান্ত নিলাম বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ হিসেবে আমরা খেলব না। এরপর মালয়েশিয়া ফুটবল ফেডারেশনের লোকজন এলো, তাদের সঙ্গে কোরিয়ার ম্যানেজারও ছিলেন। আমরা তাদের বললাম, মানসিকভাবে কোনো ফুটবলারই খেলার জন্য প্রস্তুত নন। অ্যামবাসি থেকেও আমাদের বোঝাল- তোমরা যদি এখন না খেলো এটা তো বিশ্বব্যাপী নিউজ হবে। তোমরা দেশে ফিরতে পারবে না। তখন আমাদের ম্যানেজার বলল, সালাউদ্দিন জিদ করো না, খেলো। তখন আমি বলেছিলাম, খেলার আগে আমাদের পতাকাটা অর্ধনমিত করতে হবে। তখন মালয়েশিয়ার ফুটবল ফেডারেশন বলল, ঠিক আছে- আমরা তা করে দেব। আর কোরিয়ানরা বলল, তোমরা ঘাবড়িও না; আমরা তোমাদের সঙ্গে ফ্রেন্ডলি ম্যাচ খেলব। আমরা জানি, তোমাদের খেলার কোনো মানসিকতা নেই। মাঠে এসে দাঁড়াও, না দাঁড়ালে তোমাদেরই ক্ষতি হবে। আর আমরা তো নিউজটা এখনও কমপ্লিট জানি না, আসলে কী হয়েছে। শুধু নিশ্চিত ছিলাম যে বঙ্গবন্ধু মারা গেছেন। পতাকা অর্ধনমিত ছিল। সেখান থেকে দেশে আসতে ১৫-২০ দিন লেগেছিল। কারণ ফ্লাইট ছিল না, আরও অনেক ঝামেলা ছিল। বাংলাদেশে আসার আগেই শুনেছি, শেখ কামালও নিহত হয়েছে।
প্রশ্ন :১৫ আগস্টের পর দেশে ফিরলেন, ওই সময়টা তো খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল।
উত্তর :খুবই চ্যালেঞ্জিং ছিল। ওই সময় বাংলাদেশে ফিরে আসার পর আমি মানসিকভাবে খারাপ অবস্থায় ছিলাম। আমি কেন দেশে ফিরে এলাম নিজেই জানি না। আমার কাছে মনে হয়েছে এটা বাংলাদেশ ছিল না। বাড়ি থেকে বের হতে পারতাম না। আবাহনী ক্লাবে যেতে পারতাম না।
প্রশ্ন :বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন দেশে প্রত্যাবর্তন করলেন, তারপরে তার সঙ্গে আপনার প্রথম দেখা হয় কখন?
উত্তর :আপা আসার পরই আমি দেখা করেছিলাম। সেটা তো খুব হৃদয়বিদারক ছিল। আপা ফিরেছেন বলে একদিকে আনন্দ ছিল, তবে বেদনাটাই বেশি ছিল। আমার বন্ধু কামাল নেই। আমাকে দেখে আপা শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলেন। কারণ তার মাথার মধ্যে পুরোনো স্মৃতিগুলো ফিরে এসেছিল। আপনার সঙ্গে এখন এসব কথা বলতে গিয়ে আমার চোখে পানি এসে গেছে। আমি যেন ফিরে গেছি সেই সময়ে। সেই ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বরে। আপনাকে একটা কথা বলি, যখন ব্রাজিলের গোলরক্ষক হুলিও সিজার ঢাকায় এসেছিল, তখন তাকে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে ছিল ববি (রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক)। সিজারকে যখন ভেতরে নেওয়া হচ্ছিল, তখন ববি আমাকে বলেছিল- মামা আপনিও যান। কিন্তু আমি ভেতরে যাইনি। কারণ আমি ভেতরে গেলে ছবিগুলো দেখে নিজেকে ঠিক রাখতে পারব না। তখন আমি ববিকে বলেছিলাম, ববি তুমি নিয়ে যাও, আমি এখানে ঢুকতে পারব না। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।
প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বের কোন দিক আপনাকে আকর্ষণ করেছিল বেশি?
উত্তর :আমি আপনাকে একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই। উনি আদর্শ ও আদরের মানুষ ছিলেন। উনার কাছাকাছি যখনই গিয়েছি একটা আদর ও ভালোবাসা জড়িয়ে থাকত কথাবার্তার মধ্যে। উনি যে বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা। সত্যিকার অর্থেই উনি পিতা ছিলেন। আমার সৌভাগ্য, আমি বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়েছিলাম আর মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। যুদ্ধটা আমি করতে পেরেছি, বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখেছি বলে আমার জনম সার্থক। খেলাধুলায় কী সফলতা পেয়েছি, না পেয়েছি এটা পরের বিষয়, আমি বঙ্গবন্ধুকে চিনেছি ও দেখেছি এবং আমি স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছি- এটাই আমার কাছে বড় পাওয়া। এ দুটি বিষয়ই আমার জীবন সার্থক করে দিয়েছে। আমি যদি এককথায় বলে দেই, খেলাধুলা করে যা পেয়েছি- সেটা সম্মান। আর ওই দুটো জিনিস আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।
প্রশ্ন :ফুটবল নিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নটা কি কখনও জানতে পেরেছেন?
উত্তর :বঙ্গবন্ধু ফুটবল খেলেছেন। বঙ্গবন্ধুর বাবাও ফুটবল খেলেছেন। শেখ কামাল আর শেখ জামালও ফুটবল খেলেছেন। ফুটবল তো তাদের রক্তেই ছিল। ফুটবল নিয়ে তার যদি ভালোবাসা না-ই থাকত, জাতীয় দল যখন বিদেশে যায়, এত ব্যস্ততার মাঝেও আমাদের ফটোসেশনের জন্য সময় কীভাবে দেন? ওখানেই প্রমাণ হয়ে যায় ফুটবল নিয়ে তার স্বপ্ন কতটা ছিল। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আপনি দেখেন শত ব্যস্ততার মাঝেও ছেলেদের টিম কিংবা মেয়েদের টিম যারাই চ্যাম্পিয়ন হোক, তাদের নিজের কাছে ডেকে নিয়েছেন। তার বাবা যা করেছেন, একই কাজ করছেন তিনিও। খেলাধুলা নিয়ে বাবা আর মেয়ের আন্তরিকতার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

আরও পড়ুন

×