সরেজমিন : ভোলার চরফ্যাসন
ঘরে ঘরে সৌর প্যানেল, গ্রিডের বিদ্যুৎও আছে
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১৬ | আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ১১:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের দক্ষিণের দ্বীপ জেলা ভোলা। ঢাকার সঙ্গে দূরত্ব প্রায় ২৮৭ কিলোমিটার। সেখান থেকে আরও ৭৫ কিলোমিটার ভেতরে চরফ্যাসন উপজেলা। উপকূলীয় এই উপজেলার সঙ্গে মিশে আছে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নানা দুর্যোগ। দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা মানুষের ঘরে ঘরে জ্বলছে সৌরবিদ্যুতের আলো। দেশের অনেক জায়গায় সোলার প্যানেল নিয়ে সমস্যা এবং ব্যবহার কমে যাওয়ার উদহারণ থাকলেও চরফ্যাসনে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, চরফ্যাসনের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে উপজেলা সদর– প্রতিটি পাড়া-মহল্লাতেই কোনো না কোনোভাবে ব্যবহার হচ্ছে সোলার প্যানেল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, এমনকি মসজিদ-মন্দিরও বাদ যায়নি। বিদ্যুতের সংযোগ থাকলেও ঘরে ঘরে সৌরবিদ্যুতের উপস্থিতি স্পষ্ট।
চরফ্যাসনের দক্ষিণ আইচা এলাকার কৃষক আব্দুর রহমান গত ছয় বছর ধরে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। তাঁর বাড়িতে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ থাকলেও তা নির্ভরযোগ্য নয়। তিনি বলেন, একটু ঝড়-বৃষ্টি হলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। আবার ঝড় না থাকলেও বিদ্যুৎ সবসময় থাকে না। তখন সৌরবিদ্যুৎ ছাড়া উপায় নেই। প্রথমবার কেনার পর আর কোনো খরচ হয়নি। বাতি, ফ্যান, টিভি সব চলে।
আব্দুর রহমান বাড়িতে একটি প্যানেল বসিয়েছিলেন প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ করে। কিস্তিতে টাকা পরিশোধ করেছেন। এখন আর কোনো ঝামেলা নেই। তাঁর ভাষায়, একবার খরচ করলেই হলো। ৬-৭টি বাতি, একটি ফ্যান, টিভিও চালানো যায়। ২০ বছরের ওয়ারেন্টি।
চরফ্যাসন উপজেলা সদরের আসলামপুরের রাশেদ ফরাজী ২০২৫ সালে বেসরকারি সংস্থা কোস্ট ফাউন্ডেশন থেকে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনা নেন। এর আগে ২০২২ সালে দোকানে বসিয়েছিলেন সূর্যের হাসির প্যানেল। তাঁর বাড়ির পাঁচ রুমে লাইট জ্বলে, দুই রুমে ফ্যান চলে। বাড়িতে বিদ্যুতের সংযোগ আসে ২০১৫ সালে। কিন্তু রাশেদের অভিজ্ঞতা হলো, গ্রিড বিদ্যুৎ থাকার পরও সোলার অপরিহার্য। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ তো দিনে থাকে না, রাতে আসে দুই-তিন ঘণ্টা। লোডশেডিংয়ে ছেলেমেয়েরা পড়তে পারে না। বরফকলগুলো বন্ধ হয়ে যায়। একটু নিম্নচাপ এলেই চার-পাঁচ দিন বিদ্যুৎ থাকে না। তখন ভরসা একটাই– সোলার।
রাশেদ তাঁর বাড়িতে ২২ হাজার আর দোকানে ৮ হাজার টাকা খরচ করেছিলেন। ব্যাটারি টানা ১০ বছর ব্যবহার করেছেন, যদিও ওয়ারেন্টি ছিল ৫-৭ বছরের। নতুন ব্যাটারি স্থানীয় দোকান থেকে কিনে নিয়েছেন। তাঁর মাসিক বিদ্যুৎ বিল এখন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার বেশি হয় না।
চরফ্যাসনের নজরুল নগর ইউনিয়নের রাকিব হোসেন ২০০৫ সালে কিস্তিতে একটি হামকো কোম্পানির সোলার প্যানেল কেনেন। তখন তাঁর এলাকায় বিদ্যুৎ আসেনি। এখন বিদ্যুৎ পেলেও সোলার ছাড়েননি। তাঁর পরিবারে পাঁচটি লাইট ও একটি ফ্যান চলে। মাসে ৮০০ টাকা বিদ্যুৎ বিল এলেও তিনি সন্তুষ্ট। কারণ, বিদ্যুতের ওঠানামার মধ্যে সোলারই ভরসা।
দুলারহাটের নীলকমল ইউনিয়নের চর যমুনার বাসিন্দা আরিফ হোসেন ২০০৬ সালে রহিমআফরোজের সোলার প্যানেল নিয়েছিলেন মাসিক ১২০০ টাকা কিস্তিতে। এলাকায় বিদ্যুৎ আসে ২০১৯ সালে। তিনি এখনও সেই সোলার ব্যবহার করছেন। আরিফ বলেন, ‘সোলারের কোনো সমস্যা হয়নি। দুই-তিন মাস পরপর প্যানেল পরিষ্কার করি। ব্যাটারির পানি পরিবর্তন করি। বছরে একবার ব্যাটারি ডাউন হয়, পানি বদলে চার্জ দিলেই ঠিক হয়ে যায়। ঘরে চারটি ফ্যান ও সাতটি বাতি চলছে সেই সোলারের শক্তিতেই।’
স্থানীয়রা জানান, চরফ্যাসনের ৯০ শতাংশ মানুষ এখনও কোনো না কোনোভাবে সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। কারণ, গ্রিডের বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন আছে, সংযোগও আছে, কিন্তু সার্বক্ষণিক সেবা নেই। সামান্য ঝড় বা নিম্নচাপেই দিনের পর দিন বিদ্যুৎ বন্ধ থাকে। লোডশেডিং এমন পর্যায়ে যে, স্থানীয় ব্যবসা ও শিল্প কার্যত অচল। স্থানীয় ব্যবসায়ী নাজমুল হক বলেন, দিনে বিদ্যুৎ থাকে না, রাতে অল্প সময়ের জন্য আসে। ব্যবসা বাঁচাতে বাধ্য হয়ে সবাই সৌর প্যানেল ব্যবহার করছে।
চরফ্যাসনের প্রত্যন্ত এলাকার কয়েকটি বিদ্যালয়ে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহারের কারণে পড়াশোনা সহজ হয়েছে। স্কুলশিক্ষক মাহফুজুল হক বলেন, বিদ্যুৎ চলে গেলে ক্লাস চলত অন্ধকারে। এখন সৌরবিদ্যুতের কারণে অন্তত ফ্যান চলে, আলো থাকে। ছাত্রছাত্রীরাও পড়াশোনায় মনোযোগী হয়।
চরকলোনির বাসিন্দা নাসিমা আক্তার সেলাই কাজ করেন। তিনি বলেন, সোলার থাকার কারণে সেলাই মেশিন আর লাইট চালিয়ে রাতে কাজ করতে পারেন। ফলে সংসারে একটু আয় বাড়ছে।
বিদ্যুতের অনিশ্চয়তার মধ্যে চরফ্যাসনের মানুষ নিজেদের মতো করে সমাধান খুঁজে নিয়েছেন। একেকজনের একেক অভিজ্ঞতা। তবে সবার বক্তব্য একটিই– জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা যায় না। সৌরবিদ্যুতের কারণে শিশুদের পড়াশোনা সম্ভব হয়েছে, দোকানপাট খোলা রাখা গেছে, ঘরে অন্তত আলোর নিশ্চয়তা মিলেছে। আর ঝড়-জলোচ্ছ্বাসপ্রবণ উপকূলের এই জনপদে সেটাই অনেক বড় অর্জন।
সড়কেও জ্বলছে সৌরবাতি
এক সময় চরফ্যাসনের রাস্তাঘাটে সন্ধ্যার পর ঘুট ঘুটে অন্ধকার নেমে আসত। ঘর থেকে বের হলেই চারপাশ অন্ধকার। দুর্গম চর আর গ্রামের মেঠোপথ ছিল পথচারীর আতঙ্কের জায়গা। গ্রামের হাট থেকে বাড়ি ফিরতে হতো দল বেঁধে। হাতে থাকত টর্চলাইট, কারও হাতে হারিকেন। এখন দৃশ্য বদলে গেছে। গ্রামাঞ্চলে টর্চলাইট বা হারিকেনের ব্যবহার প্রায় হারিয়ে গেছে। সন্ধ্যা নামলেই বাজার থেকে শুরু করে গ্রামের মেঠোপথ পর্যন্ত ঝলমল করে ওঠে সৌরবিদ্যুতের সড়কবাতি।
চরফ্যাসন উপজেলার ২১টি ইউনিয়নের রাস্তার পাশে আর হাটবাজারে বসানো হয় এক হাজার ৪৮৩টি সৌর সড়কবাতি। প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বলে ওঠে। লোডশেডিংয়ের ঝামেলা নেই। রাতভর আলো ছড়ায়। এতে বদলে গেছে গ্রামীণ জীবনযাত্রা। স্থানীয় রিফপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আবদুল করিম বলেন, আগে অন্ধকার রাস্তায় হাঁটাচলা করতে ভয় পেতাম। এখন গ্রামের পথও শহরের মতো ঝলমল করে। চুরি, ছিনতাই কমে গেছে। দ্বীপচর কুকরি-মুকরির মনুরা বাজারে মনির হোসেনের দোকানের সামনে ঝলমলে আলো। তিনি বলেন, এই বাজারে আগে রাতে কেউ আসত না। এখন সড়কবাতির কারণে দোকান রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। ব্যবসাও বেড়েছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, সৌরবাতি লাগানোর পর থেকে চরফ্যাসনের প্রত্যন্ত গ্রামে চুরি-ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ কমেছে। অন্ধকারের সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না অপরাধীরা। স্থানীয় নারীরা এখন সন্ধ্যার পরও বাজারে আসা-যাওয়া করতে পারছেন।
ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচি (টিআর ও কাবিটা) থেকে এসব সড়কবাতি বসানো হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে বসানো হয় এক হাজার ৪৮৩টি সোলার স্ট্রিট লাইট। একই প্রকল্পে মসজিদ, মন্দির, স্কুল-কলেজসহ দুস্থ পরিবারের ঘরে বসানো হয় এক হাজার ৮০৩টি সোলার হোম সিস্টেম। ব্যয় হয়েছে ১৬ কোটি ৭৮ লাখ চার হাজার ৬৬০ টাকা।
চরফ্যাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসনা শারমিন মিথি বলেন, উপকূলীয় এই জনপদে সৌরবাতি শুধু আলো জ্বালায়নি, বদলে দিয়েছে জীবনধারা। বাজার খোলা থাকে বেশি সময়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হয় নানা আয়োজন, মানুষ নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারে।
নতুনগুলোতে বারবার ত্রুটি
তীব্র গরম, আর্দ্র দিন আর বিদ্যুৎবিহীন অন্ধকার রাত– এই পরিস্থিতি ভোলার চরফ্যাসন উপজেলার ওমানপ্রবাসী রফিকুল ইসলামের কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছিল। তখন তিনি দেখেন আশপাশের কয়েকটি পরিবারে সোলার হোম সিস্টেম লাগানো হয়েছে। ফ্যান চলে, টিভি চলে দেখে তিনি নিজের ছাদের ওপরও বসালেন ২০ ওয়াট ক্ষমতার একটি সোলার সিস্টেম। সময়টা ২০১১ সাল। খরচ হয়েছিল প্রায় ১৫ হাজার টাকা। প্রথম দিকে ভালোই চলছিল। কয়েক বছর নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ পেয়েছিলেন রফিকুল। কিন্তু চার বছরের মাথায় ব্যাটারি বিদ্যুৎ ধরে রাখা বন্ধ করে দিল। তখন চার হাজার টাকা দিয়ে নতুন ব্যাটারি কিনতে গেলে দেখেন, যাদের কাছ থেকে সিস্টেম কিনেছিলেন, সেই উপকূলীয় বিদ্যুতায়ন ও মহিলা উন্নয়ন সমিতি– তারা এলাকায় নেই। অফিস গুটিয়ে চলে গেছে।
রফিকুলের ছেলে সাজেদুল ইসলাম রাব্বি বলেন, ‘সোলার প্যানেল অনেকদিন অকেজো পড়ে ছিল। অবশেষে গত বছরের জুনে লোডশেডিং বেড়ে গেলে আমরা একটা নতুন ব্যাটারি কিনি। কিন্তু সেটাও কতদিন টিকবে সন্দেহ। একই অভিজ্ঞতা ধনিয়া ইউনিয়নের জেলে ফারুক মাঝিরও। তিনি ২০১০ সালে গ্রামীণ শক্তি থেকে সোলার সিস্টেম কিনেছিলেন। ইতোমধ্যেই দুইবার ব্যাটারি বদলাতে হয়েছে। ফারুক মাঝি বলেন, আগে যে সোলার ছিল তা অনেক বছর ভালোই চলেছিল। এখন বারবার ব্যাটারি নষ্ট হচ্ছে। খরচ বাড়ছে, কিন্তু নিশ্চিন্ত বিদ্যুৎ মিলছে না।
স্থানীয়ভাবে কথা বলে জানা গেল, ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে যারা হোম সোলার কিনেছিলেন, তাদের সিস্টেম বেশ টেকসই হয়েছে। অনেকের সেট এখনও চালু আছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যারা নতুন সিস্টেম নিয়েছেন, তাদের ভোগান্তি তুলনামূলক অনেক বেশি।
চরফ্যাসনের স্কুলশিক্ষক শহিদুল হক বলেন, ‘আমার এক আত্মীয় ২০০৫ সালে সোলার নিয়েছিলেন, এখনও চলছে। অথচ আমি ২০১৮ সালে একটি কিনলাম, ব্যাটারি ও ইনভার্টার দুটিই একে একে নষ্ট হয়ে গেল।’ তিনি বলেন, প্রথম দিকে সোলার হোম সিস্টেমগুলো মানসম্মত উপকরণ দিয়ে তৈরি হতো। কিন্তু পরের দিকে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় নিম্নমানের ব্যাটারি ও ইনভার্টার বাজারে চলে আসে। এগুলো দ্রুত নষ্ট হয়। একশ্রেণির ব্যবসায়ী নিম্নমানের যন্ত্রাংশ এনে বাজার নষ্ট করছে। ফলে সাধারণ মানুষ ভরসা হারাচ্ছে। সরকারকে এ ক্ষেত্রে মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে হবে।
