ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎই ভবিষ্যৎ

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎই ভবিষ্যৎ
×

শুধু শিল্পকারখানার ছাদ কাজে লাগাতে পারলে পাওয়া যাবে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সংগৃহীত

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১৭ | আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ১১:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভর্তুকি সুবিধায় বসানো সোলার হোম সিস্টেমে বাংলাদেশের সফলতা ছিল ঈর্ষণীয়। কিন্তু সেই সফলতায় ভাটা পড়েছে। কমে এসেছে সোলার হোম সিস্টেমের ব্যবহার। তবে বিকল্প, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ হিসেবে সৌরবিদ্যুতে আগ্রহ রয়েছে গ্রাহকের। এ ক্ষেত্রে আশা দেখাচ্ছে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ (রুফটপ সোলার)। বিশেষ করে নেট-মিটারিং সিস্টেমের (গ্রিডযুক্ত) রুফটপ সোলারে দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যৎ দেখছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) সর্বশেষ তথ্যমতে, ২০২৪ সাল শেষে দেশে মোট সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে প্রায় এক হাজার ৮৪ মেগাওয়াট। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ১৯০ মেগাওয়াট এসেছে ছাদভিত্তিক সিস্টেম থেকে। স্রেডার হিসাবে দেশে নেট-মিটারিং অনুমোদিত ইউনিটের সংখ্যা দুই হাজার ৭৪৭টি, যেখান থেকে উৎপাদিত হচ্ছে ১১০ মেগাওয়াটের বেশি। নন-নেট মিটারিং সিস্টেম আছে আরও ২৫৮টি, যার উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৮৮ মেগাওয়াট। 

শিল্প খাতে অগ্রগতি
আশার আলো দেখা যাচ্ছে শিল্প খাতে। চট্টগ্রামের কোরিয়ান রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে ইয়ংওয়ান করপোরেশন স্থাপন করেছে প্রায় ৩৭ মেগাওয়াট ক্ষমতার সোলার প্যানেল। প্রতিদিন তারা ৩০ থেকে ৪০ হাজার পরিবারের চাহিদার সমান বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।

একইভাবে দেশের ওষুধ খাতেও সোলারের ব্যবহার বাড়ছে। রেনাটা স্থাপন করেছে ৫.৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার সিস্টেম। কোম্পানির মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণ হচ্ছে এখান থেকেই। 

শিল্পগোষ্ঠী হা-মীম গ্রুপও এগিয়ে এসেছে। তারা ছাদে বসিয়েছে ১২.২ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার। ফলে তাদের মোট কার্বন নিঃসরণ কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ। গ্রুপটি ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনে তাদের আরও ৩০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌর প্যানেলর স্থাপন করতে হবে। 

রাষ্ট্রীয় অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান ইডকল ইতোমধ্যে ৫২টি কারখানায় ১৬৫ মেগাওয়াট সৌর প্যানেল বসিয়েছে। ইডকলের হিসাব বলছে, শুধু শিল্পকারখানার ছাদ কাজে লাগাতে পারলেই বাংলাদেশ পেতে পারে চার হাজার মেগাওয়াট সোলার বিদ্যুৎ। আইইইইএফের গবেষক শফিকুল আলমের মতে, সরকারি ভবনগুলোর বিদ্যুৎ চাহিদা সীমিত হওয়ায় সোলার প্লান্টের বড় অংশ কার্যকরভাবে ব্যবহার হবে না।

জরিপে যা দেখা গেছে
সমকাল ও গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) যৌথ উদ্যোগে সম্প্রতি দেশব্যাপী পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ২০২০ সালের পর কয়েক বছর ধরে সৌর সিস্টেমের ব্যবহার কমে আসছে। ইডকলের সোলার হোম সিস্টেম এবং টিআর/কাবিটা সৌর প্যানেলের ব্যবহার কমছে। ব্যক্তিগত ছাদভিত্তিক (রুফটপ) সৌর স্থাপনা ব্যবহারে আগ্রহ বেড়েছে।

বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় স্থাপিত সোলার হোম সিস্টেমগুলোর কার্যকারিতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ৫৪% সৌর স্থাপনা কার্যকর রয়েছে। এর মধ্যে ব্যক্তিগত রুফটপ সোলার সিস্টেমের কার্যকারিতা সবচেয়ে বেশি– প্রায় ৭৭ শতাংশ। বিপরীতে, ইডকল এবং টিআর/কাবিটা কর্মসূচির আওতায় স্থাপিত সিস্টেমগুলোর কার্যকারিতা তুলনামূলক কম; যথাক্রমে প্রায় ৪৯% ও ৪৪%। ‘অন্যান্য’ শ্রেণিভুক্ত স্থাপনাগুলোর কার্যকারিতা মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে। এই পরিসংখ্যানগুলো দেখে বোঝা যায়, রুফটপ সৌর সিস্টেমগুলো তুলনামূলক দীর্ঘমেয়াদে কার্যকারিতা বজায় রাখতে অধিক সফল।

চ্যালেঞ্জ কোথায়
সবচেয়ে বড় সমস্যা অর্থায়ন। একটি মাঝারি কারখানার ছাদে পাঁচ মেগাওয়াট সোলার বসাতে খরচ হয় কয়েক কোটি টাকা। প্রাথমিক বিনিয়োগ সামাল দিতে গিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান পিছিয়ে যায়। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিতে চায় না। আর যে ঋণ দেয়, তার সুদের হার এত বেশি, প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে টেকসই হয় না। আরেকটি বড় সমস্যা নেট-মিটারিং প্রক্রিয়া। ভোক্তারা বাড়তি বিদ্যুৎ গ্রিডে বিক্রি করতে চাইলে দীর্ঘ কাগজপত্র আর অনুমোদনের ঝামেলায় পড়ে। কেউ কেউ বলেন, মাসের পর মাস পেরিয়ে যায় অনুমোদন পেতে।

এর পাশাপাশি আছে শুল্ক ও করের ভার। সৌর সরঞ্জাম আমদানিতে এখনও ১৪ থেকে ২৮ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর ও বিভিন্ন চার্জ বহাল আছে। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, সরকার যদি এই কর প্রত্যাহার না করে, তাহলে রুফটপ সোলারের বড় আকারে সম্প্রসারণ কঠিন। প্রযুক্তিগত সমস্যাও কম নয়। ধুলাবালি জমে গেলে সোলার প্লান্টের উৎপাদন অর্ধেক কমে যায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই প্রকল্প প্রত্যাশিত উৎপাদন দিতে পারে না। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে রুফটপ সোলার খাতের জন্য কোনো বিশেষ প্রণোদনা রাখা হয়নি। এতে বিনিয়োগকারীরা হতাশ হয়েছেন। অনেকে মনে করছেন, সরকারের উচ্চাভিলাষী ঘোষণা বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হবে নীতির এই অসংগতি।

সব বাধা সত্ত্বেও রুফটপ সোলার বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার খাত। একদিকে এটা কমাবে আমদানিনির্ভরতা, অন্যদিকে শিল্প খাতকে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখবে। 
 

আরও পড়ুন

×