স্থানীয় পর্যায়ে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকা জরুরি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১৯ | আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ১১:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
গ্রামীণ বিদ্যুৎহীন ও দুর্গম এলাকার বিকল্প জ্বালানি সমাধান হিসেবে সোলার হোম সিস্টেম (এসএইচএস) এক সময় দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর প্রসার দৃশ্যমানভাবে ধীর হয়ে গেছে। ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) ২০২৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রসার কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ সঠিক মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার ঘাটতি। স্থাপনের পর ব্যাটারি ও ইনভার্টারের মান-সংক্রান্ত ত্রুটি, বিক্রয়োত্তর সেবার অনুপস্থিতি এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত টেকনিশিয়ান সংকট এ খাতে ভরসার সংকট তৈরি করছে।
সমাজ উন্নয়ন পল্লী সংস্থার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অনেক এলাকায় স্থাপনের পর নিয়মিত সেবা নিশ্চিত না হওয়ায় সিস্টেমের কার্যকারিতা দ্রুত কমে যায়। সমকালের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একই চিত্র পাওয়া গেছে।
কুড়িগ্রামের রফিকুল ইসলাম জানান, কাবিটা প্রকল্পের সৌর ব্যবস্থা স্থাপনের কিছুদিনের মধ্যেই ব্যাটারি নষ্ট হয়ে পড়ে। চট্টগ্রামের সেলিম উদ্দিন বলেন, শুরুতে সিস্টেম ভালো চললেও পরে ইনভার্টারে ত্রুটি দেখা দেয়, অথচ মেরামত সেবা পাওয়া কঠিন। গফরগাঁও উপজেলার কয়েকটি গ্রামে পাওয়া গেছে– দুই বছরের মধ্যেই অনেক সোলার প্যানেল অকেজো হয়ে পড়ে এবং এখন অব্যবহৃত আছে।
সিপিডি ও সমকালের জরিপ থেকেও এ বিষয়ে নানান পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে। ৪০টি কমিউনিটিতে করা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ব্যাটারি-সংক্রান্ত ত্রুটিই সবচেয়ে বড় সমস্যা। প্রায় ৭৭ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, ব্যাটারি বিকল হওয়ার কারণেই তারা সোলার ব্যবস্থার ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন বা বন্ধ করেছেন। পরিবেশগত ক্ষতি, বিশেষ করে বজ্রপাতকে দায়ী করেছেন প্রায় ১৪ শতাংশ, ঢিলা সংযোগের কথা বলেছেন ৫ শতাংশ এবং নিম্নমানের উপকরণকে দায়ী করেছেন আরও ৫ শতাংশ উত্তরদাতা। তাদের মত, ব্যাটারির মান উন্নয়ন, টেকসই সরঞ্জাম ব্যবহার ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে সিস্টেমের ব্যর্থতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
মেরামত খরচের চাপও ব্যবহারকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। তথ্য অনুযায়ী, ব্যাটারির পানি ভরতে গড়ে ১৫২ টাকা, মেরামতে ২২০ টাকা এবং ত্রুটি সংশোধনে গড়ে ২৭০ টাকা খরচ হয়। অধিকাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, ছয় মাসে অন্তত একবার মেরামত করতে হয়; আবার এক-তৃতীয়াংশের অভিজ্ঞতায় বছরে একবার ত্রুটি দেখা দেয়। ঘন ঘন মেরামতের কারণে বাড়তি ব্যয় যোগ হয়ে সিস্টেম ব্যবহারে অনীহা তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সেবা-পরিকল্পনা, স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ টেকনিশিয়ান তৈরি, সহজলভ্য খুচরা যন্ত্রাংশ ও স্বচ্ছ সেবা ব্যবস্থার অভাবে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আস্থা ক্ষুণ্ন হয়েছে। ফলে এসএইচএসের বিস্তার কমেছে। তারা মনে করেন, ইউনিয়ন ও উপজেলায় নির্ভরযোগ্য মেরামত কেন্দ্র, নিয়মিত পরিদর্শন, ব্যবহারকারী প্রশিক্ষণ এবং সেবামূল্য নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে সৌর শক্তি ব্যবস্থার টেকসই ব্যবহার পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হবে।
