ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সাক্ষাৎকার

হোম অ্যাপ্লায়েন্স খাতের টেকসই উন্নয়নে বাজেটে পদক্ষেপ চাই

হোম অ্যাপ্লায়েন্স খাতের টেকসই উন্নয়নে বাজেটে পদক্ষেপ চাই
×

মাহমুদুর রহমান খান, পরিচালক, শোরুম চ্যানেল, মিনিস্টার– মাইওয়ান গ্রুপ

মাহমুদুর রহমান খান

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ | ১১:৪৭

সমকাল:  ঈদুল আজহা সামনে রেখে ফ্রিজ ও এসিতে আপনাদের কী কী অফার চলছে? অন্য হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্যের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় আছে কিনা?

মাহমুদুর রহমান খান: ঈদুল আজহা উপলক্ষে মিনিস্টার ফ্রিজ ও এসিতে থাকছে দারুণ সব আকর্ষণীয় অফার। ঈদুল আজহার আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিতে শুরু হয়েছে ‘মিনিস্টার ফ্রিজ কিনুন, হাম্বা জিতুন! – সিজন থ্রি’ ক্যাম্পেইন। এই বিশেষ অফারে মিনিস্টার ফ্রিজ কিনলেই ক্রেতারা পেতে পারেন গরু, ওমরাহ হজ প্যাকেজ, একটির সঙ্গে আরেকটি ফ্রি, ওভেন, নগদ মূল্যছাড়সহ নিশ্চিত আকর্ষণীয় উপহার। এ ছাড়া মিনিস্টার ও মাইওয়ান ব্র্যান্ডের ইনভার্টার ও নন-ইনভার্টার এসির বিভিন্ন মডেলে থাকছে বিশাল ক্যাশ ডিসকাউন্ট ও দারুণ সব গিফট। পুরোনো এসি বিনিময়ের মাধ্যমে নতুন মিনিস্টার এসি কেনার সুযোগও থাকছে সর্বোচ্চ ৩০% পর্যন্ত ডিসকাউন্টে। শুধু ফ্রিজ ও এসি নয়, মিনিস্টার টিভি, ওয়াশিং মেশিন, ওভেনসহ বিভিন্ন হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্যে থাকছে বিশেষ ঈদ ছাড়। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডে সুদবিহীন মাসিক কিস্তি সুবিধা, ডিজিটাল পেমেন্টে ক্যাশব্যাকসহ আরও নানা আকর্ষণীয় অফার থাকছে।

সমকাল: এবারের ঈদ উপলক্ষে ফ্রিজ এবং এসির চাহিদা কেমন? সার্বিকভাবে ২০২৫ সালে বিক্রয় পরিস্থিতি জানতে চাই। 

মাহমুদুর রহমান খান: এবারের ঈদকে ঘিরে দেশের ফ্রিজ ও এসির বাজারে অত্যন্ত ইতিবাচক চাহিদা লক্ষ্য করা গেছে।  দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ এবং ঈদকেন্দ্রিক কেনাকাটার উচ্ছ্বাস– এই দুটি বিষয় মিলেই হোম অ্যাপ্লায়েন্সের বাজারকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। ফলে গ্রাহকদের মধ্যে ফ্রিজ ও ইনভার্টার এসি কেনার আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শুধু বড় শহরেই নয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও এসব পণ্যের বিক্রি সন্তোষজনক হারে বেড়েছে, যা বাজার সম্প্রসারণের একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের আকর্ষণীয় অফার, সহজ কিস্তি সুবিধা, ক্যাশব্যাক ক্যাম্পেইন এবং উন্নত বিক্রয়োত্তর সেবা ক্রেতাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ২০২৫ সালের সার্বিক বাজার পরিস্থিতি মূল্যায়ন করলে দেখা যায়,  মূল্যস্ফীতি, ডলারের দাম বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার মতো কিছু চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বাজারে চাহিদার ধারা ইতিবাচক রয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় উৎপাদনের বিস্তার, আধুনিক ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ইনভার্টার প্রযুক্তির জনপ্রিয়তা এবং আরামদায়ক জীবনযাপনের প্রতি মানুষের বাড়তি আগ্রহ হোম অ্যাপ্লায়েন্স খাতকে আরও গতিশীল করে তুলেছে।

সমকাল: সামনে জাতীয় বাজেট আসছে। বাজেটে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন এমন কী কী ইস্যু রয়েছে?

মাহমুদুর রহমান খান: জাতীয় বাজেটে দেশের হোম অ্যাপ্লায়েন্স শিল্পের টেকসই উন্নয়ন ও বাজার সম্প্রসারণের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত– স্থানীয় উৎপাদনকে আরও উৎসাহিত করতে কাঁচামাল, ইলেকট্রনিক কম্পোনেন্ট ও প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক ও কর কমানো জরুরি। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং দেশীয় শিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে। এ ছাড়া শিল্প খাতের জন্য সহজ অর্থায়ন, ব্যাংক ঋণে সহনীয় সুদের হার এবং এলসি খোলার প্রক্রিয়া সহজ করা এখন সময়ের দাবি। কারণ ডলারের দাম বৃদ্ধি ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান চাপের মধ্যে রয়েছে। একই সঙ্গে গবেষণা ও উন্নয়ন, দক্ষ জনবল তৈরি  করার ক্ষেত্রেও বাজেটে বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন। এতে দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো আন্তর্জাতিক মানের পণ্য উৎপাদনে আরও সক্ষম হবে এবং রপ্তানি সম্ভাবনাও বাড়বে। সব মিলিয়ে একটি শিল্পবান্ধব, বিনিয়োগবান্ধব এবং প্রযুক্তি-সহায়ক বাজেট দেশের হোম অ্যাপ্লায়েন্স শিল্পকে আরও শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সমকাল: বাজেটের বাইরে সরকারের কী কী পদক্ষেপ ফ্রিজ, এসিসহ হোম অ্যাপ্লায়েন্স খাতের জন্য সহায়ক হতে পারে? 

মাহমুদুর রহমান খান: বাজেট সহায়তার পাশাপাশি সরকারের আরও কিছু নীতিগত ও কাঠামোগত পদক্ষেপ ফ্রিজ, এসি ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিল্প খাতের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ উৎপাদন ব্যাহত হলে ব্যয় বাড়ে এবং বাজারে সরবরাহেও প্রভাব পড়ে। এ ছাড়া শিল্পবান্ধব নীতিমালা ও দ্রুত প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে এলসি অনুমোদন, কাস্টমস কার্যক্রম এবং আমদানি-রপ্তানিসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত হলে ব্যবসায়িক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। ইলেকট্রনিক্স হোম অ্যাপ্লায়েন্স সেক্টরের জন্য বিশেষায়িত টেকনিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে টেকনিশিয়ান ও ইঞ্জিনিয়ারদের আধুনিক প্রশিক্ষণ দিলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা, শিল্পাঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী পণ্যের বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে গ্রাহকদের মধ্যে এনার্জি-ইফিশিয়েন্ট পণ্যের ব্যবহার বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব হবে। সব মিলিয়ে সরকার যদি নীতিগত স্থিতিশীলতা, সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নের ওপর গুরুত্ব দেয়, তাহলে দেশের হোম অ্যাপ্লায়েন্স খাত আরও শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারবে। 

সমকাল: বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স পণ্য রপ্তানি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে রপ্তানি পরিস্থিতি কেমন?  

মাহমুদুর রহমান খান: বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক্স পণ্যের রপ্তানি পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির পথে আছে। তবে এখনও বড় আকারে পৌঁছায়নি। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ফ্রিজ, এসি,  টিভি ও অন্যান্য হোম অ্যাপ্লায়েন্স বিদেশে রপ্তানি শুরু বা সম্প্রসারণ করেছে, যা খাতটির জন্য একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। বিশেষ করে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত মান উন্নত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো, এ খাত এখনও বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাতগুলোর তুলনায় ছোট পর্যায়ে রয়েছে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামাল আমদানিনির্ভরতা এবং ডলারের মূল্য ওঠানামা রপ্তানি সম্প্রসারণে কিছুটা চাপ তৈরি করছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান এখনও অভ্যন্তরীণ বাজারকে মূল ফোকাস হিসেব ধরে এগোচ্ছে। তারপরও ইতিবাচক দিক হচ্ছে, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পরিচিতি ধীরে ধীরে শক্ত হচ্ছে এবং কিছু ব্র্যান্ড আন্তর্জাতিক মান ধরে রেখে বাজারে প্রবেশ করতে পারছে। যদি প্রযুক্তি উন্নয়ন, নীতিগত সহায়তা এবং উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তাহলে আগামী কয়েক বছরে ইলেকট্রনিকস খাত বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সমকাল: পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে আপনারা ক্রেতাদের জন্য নিকট-ভবিষ্যতে কী কী পরিকল্পনা করছেন? দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও জানতে চাই।

মাহমুদুর রহমান খান: নিকট-ভবিষ্যতের পরিকল্পনার মধ্যে অন্যতম হলো– আরও উন্নত ও এনার্জি-ইফিশিয়েন্ট ইনভার্টার প্রযুক্তির পণ্য বাজারে আনা, যাতে গ্রাহকরা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ও টেকসই সমাধান পান। পাশাপাশি সারাদেশে বিক্রয়োত্তর সেবা নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী করা, দ্রুত সার্ভিস রেসপন্স নিশ্চিত করা এবং স্পেয়ার পার্টসের সহজ প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে মিনিস্টার  মাইওয়ান  গ্রুপ লক্ষ্য রাখছে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ডের উপস্থিতি বৃদ্ধি। এ ছাড়া প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে আরও প্রসারিত করে দেশের ইলেকট্রনিক শিল্পকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছি। পাশাপাশি আমরা  আমাদের পণ্য শুধু দেশীয় বাজারে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য রপ্তানি করার পরিকল্পনা করছি। আশা করছি, দেশের মানুষের চাহিদা পূরণ করে অচিরেই দেশের বাইরে এসি, ফ্রিজসহ বিভিন্ন হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্য রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে সক্ষম হবে মিনিস্টার– মাইওয়ান  গ্রুপ। সব মিলিয়ে, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো–গ্রাহকদের জন্য আরও নির্ভরযোগ্য, আধুনিক, সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য কুলিং ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স সমাধান নিশ্চিত করা এবং দেশীয় ব্র্যান্ডকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়া।

আরও পড়ুন

×