ফ্রিজের সিংহভাগ বিক্রি গ্রামে, শহরে এসি
জসিম উদ্দিন বাদল
প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ | ১১:৫৬
দেশের ইলেকট্রনিক্স পণ্যের বাজারে এক নতুন সমীকরণ দেখা দিয়েছে। বছরজুড়ে যে পরিমাণ ফ্রিজ বিক্রি হচ্ছে, তার সিংহভাগ বা প্রায় ৭০ শতাংশই যাচ্ছে গ্রামে। বাজারে ১৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা দামের ফ্রিজ থাকলেও গ্রামীণ ক্রেতাদের মূল পছন্দ ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকার ফ্রিজগুলো। অন্যদিকে, ফ্রিজের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও দেশে বছরে প্রায় আট থেকে সাড়ে আট লাখ ইউনিট এসি বিক্রি হচ্ছে। তবে এই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের মূল বাজার এখনও শহরকেন্দ্রিক।
উৎপাদন ও বাজারজাতকারী সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে বছরে প্রায় ৩০ লাখ ইউনিট ফ্রিজ বিক্রি হয়। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ, অর্থাৎ ১৮ লাখ ইউনিট বিক্রি হয় রমজান ও কোরবানি ঈদে। তবে এ দুই ঈদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় কোরবানি ঈদ ঘিরে। এ সময় বিক্রি হয় প্রায় ৬৫ শতাংশ বা প্রায় ১২ লাখ ইউনিট। এ সময় বিক্রেতারা নানা ছাড় ও উপহার দেন।
ফ্রিজ এক যুগ আগেও আমদানিনির্ভর পণ্য ছিল। এসি বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রও তাই। এখন ফ্রিজ ও এসির সিংহভাগ দেশেই তৈরি হচ্ছে। রপ্তানিও শুরু হয়েছে। দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের হাত ধরে গড়ে ওঠা ফ্রিজ ও এসির বাজার প্রতিবছর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়ছে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। স্থানীয়ভাবে ফ্রিজ-এসি উৎপাদন হওয়ায় দামও সহনীয় পর্যায়ে নেমেছে। তাছাড়া কিস্তিতে কেনার সুযোগ রয়েছে। ফলে ব্যবহার বেড়েছে। তবে এ খাতে কিছু চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি হয়েছে। বারবার নীতি পরিবর্তন, নানা সংযোজন-বিয়োজন করে নতুন শর্ত জুড়ে দেওয়ার কারণে বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য ১০ বছরের করহার নির্ধারণ এবং নীতিতে কতটুকু ছাড় দেওয়া হবে, তা স্পষ্ট করতে সরকারের প্রতি দাবি তাদের।
ফ্রিজ, এসি, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স পণ্যের উৎপাদনকারীরা বাজেট সামনে রেখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে আয়কর, অগ্রিম আয়কর এবং কাঁচামালের শুল্ক কমানোর দাবি করেছেন। এ ছাড়া সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার, ন্যূনতম মূল্য ব্যবস্থা বাতিল এবং আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী কাঁচামালের শুল্কায়ন নিশ্চিত করার দাবি তাদের। পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, সহজে এলসি খোলা, স্থিতিশীল ডলার বাজার এবং সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ চান তারা।
বাজারের আকার ৩০ হাজার কোটি টাকা
চাহিদার কারণে দ্রুত বাড়ছে ফ্রিজ-এসির বাজার। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইনডেক্সবক্সের চলতি বছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছর সামগ্রিক এসির বাজারে ১২ দশমিক ৬ থেকে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে; যেখানে বার্ষিক চাহিদা প্রায় আট লাখ ইউনিট।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে শুধু গৃহস্থালিতে ব্যবহৃত ফ্রিজের বাজার ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার। তবে গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিস্টা ডটকমের তথ্যমতে, শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত কুলারসহ সামগ্রিক ফ্রিজ ও এসির বাজার ২০১৮ সালে ছিল ১৮ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা, যা গত সাত-আট বছরে বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকায় ঠেকেছে। ২০২৯ সাল নাগাদ এই বাজার ৩৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
ফ্রিজের চাহিদার ৯০ শতাংশই পূরণ হয় স্থানীয়ভাবে
বর্তমানে দেশে ওয়ালটন, ভিশন, মিনিস্টার, যমুনাসহ ১৩টি দেশীয় প্রতিষ্ঠান এবং স্যামসাং, সিঙ্গারের মতো বিদেশি ব্র্যান্ডের কারখানা গড়ে উঠেছে। এনবিআর ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ফ্রিজ ও এসির চাহিদার প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই এখন স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণ হচ্ছে, বাকি ১০ শতাংশ আমদানি হয়।
২০২১ সালে মার্কেটিং ওয়াচ বাংলাদেশের (এমডব্লিউবি) প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশের ফ্রিজের বাজার ছিল বিদেশি ব্র্যান্ডের নিয়ন্ত্রণে। এরপর পাল্টাতে থাকে দৃশ্যপট। সরকারের নানা সহায়তায় দ্রুত স্থানীয় শিল্পের প্রসার ঘটে। বর্তমানে ফ্রিজের বাজার দেশীয় ব্র্যান্ডের দখলে। এসির সিংহভাগ চাহিদাও মেটে স্থানীয়ভাবে।
রপ্তানি বাড়ছে
স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে ফ্রিজ-এসিসহ নানা হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্য। তবে এখনও বড় আকারে পৌঁছায়নি। ৪০টির বেশি দেশে ফ্রিজ ও এর প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ রপ্তানি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয় ভারতে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ফ্রিজ, এসি, টিভি ও এসব পণ্যের যন্ত্রাংশ রপ্তানি করে আয় হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি ডলার। এর মধ্যে টিভি থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ৯০ লাখ ডলার। সংযুক্ত আরব আমিরাত-নেদারল্যান্ডসসহ কয়েকটি দেশে টিভি রপ্তানি হচ্ছে।
নীতি পরিবর্তনে বিনিয়োগ ঝুঁকিতে ইলেকট্রনিক্স শিল্প
বারবার নীতি পরিবর্তনের কারণে ইলেকট্রনিক্স খাতের উদ্যোক্তারা সংকটে পড়েছেন। বিশেষ করে ২০১৯ সালের পর রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজার ও এসি খাতে দেওয়া কর ও শুল্ক সুবিধা প্রত্যাহার করায় নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
উদ্যোক্তারা জানান, ২০৩২ সাল পর্যন্ত ১০ শতাংশ আয়কর সুবিধা, আমদানি পর্যায়ে মূসক ও সম্পূরক শুল্ক অব্যাহতি এবং উৎপাদন পর্যায়ে কম ভ্যাটের আশ্বাসে ২০১৮-১৯ সালে এ শিল্পে বড় বিনিয়োগ আসে। কিন্তু ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকেই এসব সুবিধা সীমিত করা হয়। গত বছর এ খাতের আয়কর ১০ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ, আগাম আয়কর ২ থেকে ৫ শতাংশ এবং উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ১৫ শতাংশ করায় উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ ও ব্যয়ের চাপে পড়েছেন।
আরএফএল ইলেকট্রনিক্সের নির্বাহী পরিচালক মো. নুর আলম সমকালকে বলেন, গত বাজটে ফ্রিজ-এসির বিভিন্ন উপকরণে শুল্ক-কর বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে আমদানি শুল্ক ৫ থেকে তিনগুণ বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ, উৎপাদন ও স্থানীয় পর্যায়ে মূসক ১৫ শতাংশ নির্ধারণ এবং আমদানি পর্যায়ে প্রযোজ্য এআইটি দু্ই থেকে বাড়িয়ে পাঁচ শতাংশ করা হয়েছে। এ ছাড়া এসির কম্প্রেসারের শুল্কায়ন মূল্য ৪০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৮৫ ডলার করা হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, আগামী বাজেটে উদ্বেগ নিরসন হবে।
