ঢাকা শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক

ব্যাংকবিমুখ হয়ে আমানত কমার শঙ্কা

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক
×

 বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ | ০৮:৫৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যাংকে ব্যক্তি ও ব্যবসায়িক হিসাব খুলতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এতদিন এনআইডি দিয়ে ব্যক্তি হিসাব এবং ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে ব্যবসায়িক হিসাব খোলা যেত। এমনিতেই বিভিন্ন ব্যাংকের প্রতি আস্থাহীনতার কারণে মানুষের হাতে টাকা রাখার প্রবণতা বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে এলো টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব। এতে ব্যাংক বিমুখ হয়ে আমানত কমার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ছাড়া এখন থেকে যে কারও অ্যাকাউন্ট খোলার সময় টিআইএন সনদ দাখিল করতে হবে। স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্ট ও নো-ফ্রিলস তথা কম টাকায় খোলা কৃষক, মুক্তিযোদ্ধা, সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় ভাতাভোগী এবং পর্ষদ থেকে অব্যাহতি পাওয়ারা ছাড়া অন্যদের জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করছি।’ পাশাপাশি ব্যবসায়িক হিসাব খুলতে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) থাকা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ভ্যাটের আওতা বাড়াতে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে মূসক নিবন্ধন গ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে আইনে সংশোধনী আনার প্রস্তাব করছি।’

বর্তমানে ট্রেড লাইসেন্স ও টিআইএন দিয়ে ব্যবসায়িক ব্যাংক হিসাব খোলা যায়। আর এনআইডি বা জন্মনিবন্ধন সনদ কিংবা অন্য পরিচিতিমূলক কার্ডের কপি দিয়ে ব্যক্তি হিসাব খোলা যায়। অবশ্য ব্যাংকে আমানতের বিপরীতে কর কাটার ক্ষেত্রে টিআইএন থাকা না-থাকার ওপর পার্থক্য রয়েছে। টিআইএন সনদ না থাকলে মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর দিতে হয়। সনদ থাকলে যেখানে মুনাফার ওপর দিতে হয় ১০ শতাংশ কর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, রাজস্ব ফাঁকি ঠেকাতে সব পর্যায়ে ব্যাংক লেনদেনের আওতায় আনা জরুরি। তবে একবারে কঠোরতা আরোপ করলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে। এতে মানুষের হাতে টাকা রাখার প্রবণতা বাড়বে। ফলে ব্যাংক হিসাব খুলতে একবারে টিআইএন বাধ্যতামূলক না করে ধীরে ধীরে এ ব্যবস্থার আওতায় আনা যেতে পারে। কেননা বিগত সরকারের সময়ে অনিয়ম-জালিয়াতির কারণে অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান অনেক দিন ধরে টাকা ফেরত দিতে পারছে না।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর গড়ে ১০ শতাংশ হারে ছাপানো টাকার চাহিদা বাড়ছে। বর্তমানে ২৪ লাখ কোটি টাকার সঞ্চয়ের বিপরীতে তিন লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার ছাপানো নোট রয়েছে। সাধারণভাবে প্রতিবছর কোরবানি ঈদের আগে নোটের চাহিদা বেড়ে যায়। ঈদের পর দ্রুত আবার মানুষের হাতের টাকা ব্যাংকে ফিরতে শুরু করে। তবে এবার এ ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। এখনও আশানুরূপ টাকা না ফেরায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাহিদামতো ব্যাংকগুলোকে টাকা দিতে পারছে না। যে কারণে অনেক সময় ভালো ব্যাংকের এটিএম বুথে গিয়েও টাকা মিলছে না। মূলত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে ঈদের পর প্রথম কর্মদিবস থেকে গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে মতিঝিলে আন্দোলন হচ্ছে। শুধু ইসলামী ব্যাংক থেকে ঈদের পর সাত হাজার কোটি টাকার বেশি উত্তোলন করা হয়েছে। অন্য অনেক ব্যাংক থেকেও টাকা উত্তোলন বেড়েছে। এ রকম অবস্থায় ছাপানো নোটের চাহিদা মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জুলাই আন্দোলনের পর ফেলে রাখা বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত পুরোনো নকশার দুই হাজার ৪০০ কোটি টাকা বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সব মিলিয়ে এখন বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার নোট রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মানুষের সঞ্চয়ের বড় অংশই অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরভিত্তিক। মোট সঞ্চয়ের সামান্য যে অংশ ছাপানো নোট, এর বড় অংশই ব্যবসায়িক প্রয়োজন, কেনাকাটাসহ দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে মানুষের হাতে থাকে। সারাদেশে ব্যাংকগুলোর ১২ হাজারের মতো শাখার ভল্টে থাকে ১৬ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বিনিময় করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট, সোনালী ব্যাংকের চেস্ট শাখার কাছে থাকে ১৪ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা। 

চব্বিশের গণআন্দোলন পরবর্তী নতুন নকশার নোট বাজারে আনাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ সময় নোট বাজারে আসা বন্ধ ছিল। এতে করে চাহিদার সঙ্গে জোগানের বড় পার্থক্য দেখা দেয়। এর মধ্যে টাকা ফেরত আসা কমে যাওয়ায় সংকট আরও বেড়েছে। কোনো একটি ব্যাংকের প্রতি আস্থাহীনতা বাড়লে মানুষের হাতে টাকা রাখার প্রবণতা বাড়ে। 
২০১৯ সাল থেকে অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান মানুষের জমানো টাকা ফেরত দিতে পারছে না। ২০২১ সাল থেকে কয়েকটি ইসলামী ব্যাংক টাকা ফেরত দিতে পারছে না। যে কারণে ইসলামী ব্যাংকের সমস্যা দ্রুত সমাধানের অনুরোধ জানিয়েছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে এবিবির বৈঠকে বলা হয়, দ্রুত সমস্যার সমাধান না করলে এই সংকট পুরো ব্যাংক খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

আরও পড়ুন

×