অপেক্ষাটা কি তামিম পরবর্তী যুগের?
ছবি: উইজডেন
সুমন মেহেদী
প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২০ | ০৭:০৪
ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাহিত্য সমালোচনা 'শেক্সপিয়ারের মেয়েরা' বইয়ের মতো শিরোনাম হতে পারতো। 'তামিম ইকবালের ওপেনিং সঙ্গীরা'। প্রায় ১৩ বছরের ক্যারিয়ারে সব ফরম্যাট মিলিয়ে অন্তত ১৬জন ওপেনারের সঙ্গে ব্যাট করেছেন তামিম ইকবাল। কেউ তার সঙ্গে থিতু হতে পারেননি। কথাটা একটু ঘুরিয়েও বললে, তামিম কারো সঙ্গে থিতু হননি।
জাভেদ ওমর থেকে শুরু করে হালের লিটন দাস-মোহাম্মদ নাঈমরা ওপেনিংয়ে তামিমের সঙ্গে নেমেছেন ব্যাট হাতে। আশা জাগালেও স্থায়ী হয়নি তাদের অনেকের জুটি। ঘুরে ফিরে প্রশ্নটা তাই আসছে, দোষ কি তামিমের ওপেনিং সঙ্গীদের? নাকি ওপেনার তামিমের ব্যাটিং সুর কিংবা দর্শনের সঙ্গে তাদের মানিয়ে নিতে না পারার?
এই ১৩ বছরে দেশসেরা ওপেনার তামিম কম প্রতিভাবান সঙ্গী পাননি। এনামুল হক বিজয়, সৌম্য সরকার, লিটন দাস কিংবা বিস্মৃত হতে বসা শামসুর রহমান-রনি তালুকদাররা ব্যাট করেছেন তার সঙ্গে। ঠিক জমেনি তাদের কোন জুটিই।
আর জুটি জমেনি বলে বাংলাদেশ পায়নি শচীন-সৌরভ, হেইডেন-গিলক্রিস্ট, জয়সুরিয়া-কালুভিতারানা কিংবা হালের রোহিত শর্মা-শেখর ধাওয়ান কিংবা ওয়ার্নার-অ্যারন ফিঞ্চের মতো লম্বা সময় ওপেনিংয়ে ব্যাট করা একটা জুটি। তামিম তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারে সবেচেয়ে বেশি ৫৪ বার ব্যাট করতে নেমেছেন ইমরুল কায়েসের সঙ্গে। সৌম্য সরকারের সঙ্গে তার ব্যাট করতে নামা ৩৫ বার। কিন্তু আশা দেখিয়েও শেষ পর্যন্ত জমেনি তাদের জুটি।
ওয়ানডে ক্রিকেটে যেখানে ওপেনিংয়ে এক সঙ্গে একশ'র বেশি ম্যাচে জুটি গড়ার রেকর্ড আছে গোটা পাঁচেক। একশ' ছুঁইছুঁই ম্যাচে এক সঙ্গে ওপেন করার বেশ কিছু রেকর্ড আছে। সেখানে তামিম তার কোন সঙ্গীকে 'আপন' করতে পারছেন না! একটা প্রশ্ন তাই ঘুরে ফিরে চলেই আসে, তামিম কি তার সঙ্গীদের 'সহায়তা' করেন না? অসহযোগিতার প্রশ্ন আসলে অবশ্য পরিসংখ্যান সামনে চলে আসে।
খোদ শচীন টেন্ডুলকার তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারে ১৯জনের মতো ওপেনিং পার্টনার পেয়েছেন। তার মধ্যে গাঙ্গুলি, শেবাগ, গম্ভীরদের সঙ্গেই জমেছে তার জুটি। কিউই ওপেনার জোহান রাইট রেকর্ড ২৩ জন ওপেনারকে পেয়েছেন। সাইদ আনোয়ারকে ওয়ানডে ক্রিকেটে খেলতে হয়েছে ২২ জনের সঙ্গে। গ্রান্ট ফ্লাওয়ার ১৯জন এবং ক্রিস গেইলও পেয়েছেন ২০জনের বেশি ওয়ানডে ওপেনিং সঙ্গী। দীর্ঘ ক্যারিয়ার হলে একাধিক সঙ্গীর ব্যাপারটা এমনিতেই চলে আসে। কিন্তু ক্যারিয়ার শেষে অন্তত একজন ওপেনিং পার্টনারকে নিজের নামের সঙ্গে জুড়ে নিয়েছেন তারা। তামিমের ক্যারিয়ারে সেই খেদ থেকেই যাচ্ছে।
ঘনঘন ওপেনার বদলের তালিকায় অবশ্য রেকর্ড বুকে সবার ওপরে আছেন বাংলাদেশের সাবেক এক ক্রিকেটার। হান্নান সরকার তার ২০ ম্যাচের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে ৯ জনকে পেয়েছিলেন ওপেনার হিসেবে। মোহাম্মদ আশরাফুল ২৪ ম্যাচে ওপেন করে সাতজন সঙ্গী পেয়ে আছেন ছয়ে। অজি তারকা ওয়াটসনও ক্যারিয়ারের এক পর্যায়ে ২৩ ম্যাচে ৮ জনের সঙ্গে ওপেন করতে নামেন। এছাড়া অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, মার্টিন ক্রো, ইয়ান বেলদের সঙ্গেও হয়েছে এমন।
কিন্তু লম্বা ক্যারিয়ারের ওপেনারদের অনেকে তামিমের মতো জায়গা আঁকড়ে ধরে থাকেনি। তামিম ২০৪ ওয়ানডে ম্যাচে ২০২ ইনিংসে ব্যাট করেছেন। কখনও ওপেনিং ভিন্ন ব্যাট করেননি তিনি। টেস্ট-টি-২০ ক্যারিয়ারেও ওপেনিং তার জন্য ধরা-বাধা জায়গা। কিন্তু বিশ্বের সেরা ওপেনার বলতে আমরা যাদের নাম এক নিমিষে মুখে আনি সেই শচীন, হেইডেন, সৌরভ, জয়সুরিয়া, মার্ক ওয়াহরা ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন পজিশনে ব্যাটিং করেছেন।
শচীন ৩৪০ ম্যাচে ওপেন করেছেন। বাকি প্রায় একশ' ম্যাচে তিন থেকে আট নম্বরে পর্যন্ত ব্যাটিং অর্ডারে নেমেছেন সর্বকালের সেরা এই ব্যাটসম্যান। সৌরভ গাঙ্গুলি ৬৪ ইনিংসে তিন থেকে আট পর্যন্ত ব্যাটিং অর্ডারে ব্যাট করেছেন। মার্ক ওয়াহ তার ২৩৬ ওয়ানডে ইনিংসের মধ্যে ৯৫ ইনিংসে তিন, চার-পাঁচসহ ভিন্ন পজিশনে ব্যাট করেছেন। গৌতম গাম্ভীর, সনাথ জয়সুরিয়া, হালের মোহাম্মদ হাফিজরা ওপেনার হলেও ভিন্ন পজিশনে একাধিক ইনিংসে ব্যাট করেছেন।
দলের প্রয়োজনে তারা হয় সিনিয়রদের নয়তো তরুণদের জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু তামিম ইকবাল বিভিন্ন সময় রান খরায় থাকলেও, রান তুলতে ধুঁকলেও ব্যাটিং অর্ডার ছাড়েননি তিনি। বরং লিটন দাস, সৌম্য কিংবা ইমরুলদের 'বলি' হতে হয়েছে বিভিন্ন সময়। সর্বশেষ পাকিস্তান সফরেও দারুণ ফর্মে থাকা সত্বেও লিটন দাসকে ছেড়ে দিতে হয়েছে ওপেনিং স্পট।
বাংলাদেশের পাকিস্তান সফরের টি-২০ দল ছিল টপ অর্ডার ব্যাটিংয়ে ভরপুর। তামিম, লিটন, নাঈম, সৌম্যরা টপ অর্ডার তথা ওপেনিংয়ে ব্যাটিং করতে পছন্দ করেন। ভারতও তাদের সেরা সময়ে দলে একাধিক ওপেনার নিয়ে খেলিয়েছে। শচীন, শেবাগ, সৌরভ কিংবা গৌতম গম্ভীররা একসঙ্গে খেলেছেন ভারতীয় দলে। সেক্ষেত্রে সৌরভ, গম্ভীর, এমনকি শচীনকে দলের প্রয়োজনে ব্যাট করতে হয়েছে পরে।
হাশিম আমলা, মোহাম্মদ হাফিজরা শেষ দিকে তরুণদের সুযোগ দিতে ওপেনিং ছেড়ে দিয়েছেন। নিজের ব্যাটিং স্টাইলের সঙ্গে মানানসই জায়গা বেঁছে নিয়েছেন। কিন্তু তামিমের ক্ষেত্রে তেমন চিন্তা করারও যেন সুযোগ নেই। তামিম নিজের ব্যাটিং স্টাইল, ব্যাটিং দর্শন কিংবা ব্যাটিংয়ের সুর বদলাবেন না। তার সঙ্গে জুটি গড়তে হলে নিজেদের ভাঙতে হবে তরুণ কিংবা উদীয়মানদের। এই যেন হয়ে গেছে অলিখিত নিয়ম। বাংলাদেশের তাই একটা দীর্ঘমেয়াদি ওপেনিং জুটির আক্ষেপ থেকেই গেছে। অপেক্ষাটা কী তামিম পরবর্তী যুগে ফুরাবে?
- বিষয় :
- খেলা
- ক্রিকেট
- বাংলাদেশ
- তামিম
- ওপেনিং জুটি
