ফুটবলে তালা খুলল জার্মানি
বরুশিয়া ডটমুন্ডের অনুশীলনে আর্লিং হালান্ড
নাজমুল হক নোবেল
প্রকাশ: ১৫ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৬ মে ২০২০ | ০০:৩৮
করোনাভাইরাসের ভয়াল তাণ্ডবে গোটা বিশ্বের চেহারাটাই বদলে গেছে। রাস্তায় যানবাহন নেই, আকাশে বিমান নেই, চারপাশে কোলাহল নেই- সম্পূর্ণ অচেনা এই পৃথিবী। পুরোপুরি থমকে গেছে সবকিছু। ক্রীড়াঙ্গনেও এর প্রভাব পড়েছে। একের পর এক বন্ধ হয়েছে বিভিন্ন দেশের ফুটবল লিগ, পেছাতে হয়েছে ইউরো-কোপার মতো আন্তর্জাতিক আসর। ক্রিকেট, টেনিস, বাস্কেটবল, রাগবি, মোটর রেস- সব খেলাতেই এর প্রভাব পড়েছে। পেছাতে হয়েছে টোকিও অলিম্পিকও।
তবে করোনা মহামারি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না এলেও লকডাউনের বদ্ধ দুয়ার খুলতে শুরু করেছে ইউরোপের দেশগুলো। সে পথ ধরেই মুক্তির পথে ফুটবল। আর এই পথের দিশারী হলেন জার্মানরা। সবার আগে অবরুদ্ধ ফুটবলকে মাঠে আনছে তারা। গতকাল শুক্রবারই জার্মানির দ্বিতীয় বিভাগের খেলা মাঠে গড়িয়েছে। আজ শনিবার থেকে শুরু হচ্ছে বুন্দেসলিগা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই ফুটবলই নাকি যুদ্ধের বিভীষিকায় মুষড়ে পড়া মানুষের মাঝে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে এনেছিল। সবার ধারণা, অদৃশ্য শত্রু করোনার ভয়ে ভীত মানুষের মুখে এবারও হাসি ফুটাবে ফুটবল। আর এই চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে বুন্দেসলিগা শুরুর সবুজ সংকেত দেওয়ায় জার্মান সরকার ও রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে লিগ কর্তৃপক্ষ ও ক্লাবগুলো।
এই যেমন বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর কার্স্টেন ক্রেমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেছেন, ফুটবলই পারে মানুষের মনের ভয়ডর দূর করে আগের সেই ফুরফুরে ভাব ফেরাতে। তবে সরকারকে বোঝাতে তাদের যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে বলেও জানান তিনি। দফায় দফায় বৈঠক করতে হয়েছে সরকারের সঙ্গে। প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে, সরকারের নির্দেশ মেনে সমস্ত রকম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েই ম্যাচের আয়োজন করা হবে, নূ্যনতম ছাড় দেওয়া হবে না।
প্রথমদিনে খেলা হবে ছয়টি। এর মধ্যে বরুশিয়া ডর্টমুন্ড ডার্বি ম্যাচে মুখোমুখি হবে শালকের, শিরোপাধারী বায়ার্ন মিউনিখ মাঠে নামবে পরদিন রোববার। ডর্টমুন্ডের ফুটবলারদের সঙ্গে সমর্থকদের সম্পর্কটা একেবারে আত্মিক। ম্যাচের দিন প্রিয় দলের সমর্থনে সিগন্যাল ইদুনা পার্কের গ্যালারির রং হলুদ হয়ে যায়। মনে হয় যেন মিউজিক্যাল কনসার্ট হচ্ছে। এতটাই প্রাণবন্ত হয়ে উঠে পরিবেশ। অথচ ইদুনা পার্কে আজ ডার্বি ম্যাচে দেখা যাবে না গর্বের 'ইয়েলো ওয়াল'! করোনার থাবা থেকে বাঁচতে দর্শকশূন্য গ্যালারিতে হবে খেলা। অবশ্য শুধু এই ম্যাচটাই নয়, আরও কত দিন যে ফাঁকা স্টেডিয়ামে হবে, সেটা কেউ জানে না। টিভিই এখন খেলা উপভোগের একমাত্র মাধ্যম। জীবনের চেয়ে মূল্যবান আর কিছু হতে পারে না। তাই নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নূ্যনতম ঝুঁকিও নেওয়া হচ্ছে না।
গত শনিবার থেকেই সব দলের ফুটবলার, কোচিং স্টাফরা সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হোটেলে অবস্থান নিয়ে নিয়েছেন। একই হোটেলে থাকলেও একসঙ্গে সকালের নাশতা, মধ্যাহ্নভোজ কিংবা রাতের খাবার একসঙ্গে খেতে যাচ্ছেন না। এমনকি এক টেবিলের একজনের বেশি বসছেন না। প্রতিটি দলের সঙ্গে সার্বক্ষণিক দু'জন ডাক্তার থাকছেন। মেডিকেল টিম সপ্তাহে দু'বার কভিড-১৯ টেস্ট করছে। নিয়ম ভাঙলে যে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না, সেটা খেলা মাঠে গড়ানোর আগেই প্রমাণ দিয়ে দিয়েছে বুন্দেসলিগা কর্তৃপক্ষ। নিয়ম ভেঙে গত বৃহস্পতিবার টুথপেস্ট ও ক্রিম কিনতে হোটেলের বাইরে যাওয়ায় শাস্তির মুখে পড়েছেন অগসবার্গের কোচ হেইকো হার্লিচ।
তাই শনিবার উফলবার্গের বিপক্ষে ম্যাচে ডাগআউটে থাকতে পারছেন না তিনি। দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামে খেলোয়াড়, কোচ, রেফারি, গ্রাউন্ডসম্যান, কর্মকর্তা, নিরাপত্তারক্ষী, সংবাদকর্মী, ফটোগ্রাফার- সব মিলিয়ে ৩০০ লোক খেলায় সময় মাঠে উপস্থিত থাকতে পারবেন। এই তিনশ' লোকও একসঙ্গে থাকতে পারবেন না, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে মাঠে অবস্থান করতে হবে তাদের। স্টেডিয়ামের বাইরেও দর্শকরা ভিড় করতে পারবেন না। এই নিয়মের বেড়াজালে জার্মান জাতীয় দলের কোচ জোয়াকিম লো পর্যন্ত মাঠে প্রবেশের অনুমতি পাচ্ছেন না। বুন্দেসলিগার জন্য ৫২ পাতার এই নির্দেশিকা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। এত কিছুর পরও প্রতি মূহূর্তেই ভুগতে হবে করোনা-শঙ্কায়।