‘আফ্রিকান ব্রাজিলের’ মাস্টার ক্লাস
ব্রাজিল গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকারের মাথার ওপর দিয়ে বল মেরে এভাবেই গোল করেন মরক্কোর ইসমায়েল সাইবারি। ছবি- এএফপি
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, নিউইয়র্ক থেকে
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৪ | আপডেট: ১৫ জুন ২০২৬ | ০৮:১৬
এই তো এই নিউইয়র্কের ঘটনা। জাতিসংঘের সদরদপ্তরে লটারি বা ড্র করে মরক্কোকে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ‘প্রথম আসন’ দেওয়ার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আগামী অধিবেশনে মরক্কোর প্রতিনিধিরা প্রথম সারির আসনে বসবেন এবং ইংরেজি বর্ণানুক্রমে বাকি ১৯২ দেশ। ফিফাও এমন একটা নিয়ম এখন থেকে ভেবে দেখতে পারে বিশ্বকাপের পরের ম্যাচগুলোতে। গ্রুপ ‘সি’তে মরক্কোকে সামনে বসিয়ে বাকিদের ইংরেজি বর্ণনানুক্রমে! কেননা, যে মেধা আর কৌশল দিয়ে তারা নিউ জার্সিতে ব্রাজিলকে রুখে দিয়েছে, তা এক কথায় ট্যাকটিক্যাল ‘মাস্টার ক্লাস’।
তাদের হাই প্রেসিং এবং ‘লো ব্লক’ ডিফেন্স। দুটি ব্যাপারে ভীষণভাবে নিখুঁত থেকে ব্রাজিলকে বোকা বানিয়েছে মরক্কো। আগের দিন নিজেদের ‘আফ্রিকান ব্রাজিল’ বলে সংবাদ সম্মেলনে মজা করেই বলছিলেন মরক্কোর অধিনায়ক আশরাফ হাকিমি। পরে অবশ্য তিনি ব্যাখ্যা করেছেন ‘জাগো বনিতোর’ ব্রাজিলকে প্রেরণা মেনেই আজ আফ্রিকার ব্রাজিল এই মরক্কো। এদিন তাদের কোচ ওয়ালিদ রেগ্রাগুই ব্রাজিলের ডন কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে হারিয়ে দিয়েছেন রীতিমতো দাবার চালে। যার একটি ছিল ক্যাসেমিরোকে অবরুদ্ধ করে রাখা। সে যখনই নিচে নেমে ডিফেন্ডারদের কাছ থেকে বল রিসিভ করতে চাইতেন, তখনই মরক্কোর সোফিয়ান আমরাবাত এবং আজুদিন উনাহি তাঁকে চারপাশ থেকে ছেঁকে ধরতেন। বল ঘোরানো কিংবা থ্রু পাস দেওয়ার কোনো সময় পাননি ক্যাসেমিরো, যে কারণে তাঁকে অনেকবার ব্যাক পাস দিতে দেখা গেছে। তাঁকে এমন অস্বস্তিতে ফেলে মেজাজও হারাতে বাধ্য করেছে মরক্কো। ফলে হলুদ কার্ডও দেখতে হয়েছে।
আফ্রিকান ব্রাজিলের জন্য আসল ব্রাজিলকে কাবু করার এটাই ছিল বুদ্ধিমান কৌশল। অপারেশনে নেমে ব্রাজিলের আরেকটি পাওয়ার স্টেশনেও আঘাত হেনেছিল হাকিমিরা। লুকাস পাকেতা ছিলেন এদিন কোচ কার্লো আনচেলত্তির ক্রিয়েটিভ সাপ্লাই লাইন। ভিনি বা রাফিনিয়ার সঙ্গে পাকেতা এই সংযোগটাই বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করে গেছে মরক্কোর খেলোয়াড়রা। পাকেতা বল পেলেই মরক্কোর ডিফেন্ডাররা ফিজিক্যাল চ্যালেঞ্জ বা গায়ের শক্তি দিয়ে পরাস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। যে কারণে পাকেতার ভুলেই প্রথম গোলটি হজম করতে হয় ব্রাজিলকে।
তাদের আরেকটি কৌশল সম্পর্কে সচেতন ছিল ব্রাজিল। তার পরও এদিন ভুল করেছে তারা। যখনই ব্রাজিলিয়ানা বল নিয়ে মরক্কোর অর্ধে প্রবেশ করেছে, তখনই নিজেদের রক্ষণ ৪-৫-১ ফরমেশনে নিজেদের সাজিয়ে নিয়েছেন হাকিমিরা। নিজে পিএসজিতে খেলেন বলেই এই কৌশলটা রপ্তা করা ছিল হাকিমির। তারা ম্যাচজুড়ে একটানা হাই প্রেসিং করেনি, বরং ট্রিগার বেজড বা নির্দিষ্ট কিছু সময়ে ব্রাজিলের ওপর চড়াও হয়েছে। তারা জানত, নিউ জার্সির গরমে একটানা হাই প্রেসিং ফুটবল খেলা যায় না। তাতে করে শক্তি ক্ষয় হয়। এমনই কিছু ছোট ছোট কৌশল দিয়েই বড় শিকার ধরতে প্রস্তুত থাকে মরক্কো। গেল বিশ্বকাপে যেমন তারা রোনালদোর পর্তুগালকে দারুণভাবে কৌশল সাজিয়ে বিদায় করেছিল, এবার তেমনই ব্রাজিলকেই প্রথম ম্যাচে টার্গেট করেছে।
আফ্রিকার অন্য সব দলের মতো শুধুই গা জোয়ারি ব্যাপার নেই হাকিমিদের। আবার ইউরোপিয়ানদের মতো গতিও নেই, কম আছে লাতিনের মতো শৈলীও। তার পরও বর্তমান বিশ্বফুটবলে বড় দলের কাতারেই নাম উচ্চারিত হয় মরক্কোর। কারণ দলটির মধ্যে যে দারুণ ঐক্য, তা তাদের তাড়িয়ে বেড়ায় সবকিছুকে সম্ভব করতে। তাই ডাচ লিগ খেলা মিডফিল্ডার ইসমায়েল সাইবারির পায়ে অমন ‘চিপ’ শটে গোল দেখেও অবাক হওয়ার কিছু থাকে না। কারণ, তারা ‘আফ্রিকান ব্রাজিল’, তাদের মধ্যে শৈলী থাকবে বৈকি।
