কানসাসের ক্যানভাসে শুধুই আর্জেন্টিনা
ছবি- এএফপি
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, নিউইয়র্ক থেকে
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬ | ০৭:৫৭
পেছনে অনন্তকাল ধরে বয়ে চলা মিসৌরি নদী আর চোখের সামনে পশ্চিমে ঢলে পড়া এক রক্তিম অস্তগামী সূর্য। একলা বিদায়ী সূর্যের সেই আভা এসে পড়েছে হোটেলের ২০২ নম্বর রুমের জানালার কাচে। অদ্ভুত এক রূপক। ওই অস্তগামী সূর্যটা বুঝি নিঃশব্দে মনে করিয়ে দিচ্ছে এক ধ্যানমগ্ন ঋষির মহাসমাপ্তির কথা; জীবনের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে দাঁড়িয়ে থাকা এক মহাজাগতিক জাদুকরের বিদায় বেলার কথা। লিওনেল মেসি– এই শহর থেকেই যিনি শেষের শুরু করতে যাচ্ছেন। খেলতে নামছেন আলজেরিয়ার বিপক্ষে তাঁর এবারের আসরের প্রথম ম্যাচে।
ভালোবাসার এই মানুষটিকে শুধু একবার দেখার জন্য রোববার আর্জেন্টিনার টিম হোটেল অরিজিনের সামনে ভিড় করেছিলেন কয়েকশ ভক্ত। যাদের অনেকেই আর্জেন্টাইন নন; কেউ নাইজেরিয়া, কেউ গুয়েতেমালার, কেউবা সন্তানকে নিয়ে এসেছেন সেই কোরিয়া থেকে। তাদের মুখের ভাষা হয়তো আলাদা, কিন্তু হৃদয়ের ভাষা সবারই এক– মেসি... মেসি...। নিউইয়র্কের গগনচুম্বী অট্টালিকার অহংকার নেই কানসাস সিটির, তাই মিসৌরির মোহনায় কানসাস সেজেছে আবেগ আর ভালোবাসার নীল-সাদার আলপনাতে। আজ এই শহর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে নাম লেখাতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা-আলজেরিয়ার ম্যাচ আয়োজন করে। সাক্ষী হতে যাচ্ছে সে প্রথমবারের মতো ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলা কোনো তারকার ইতিহাসে। বড্ড খুশি দেখাচ্ছে ট্রাম্পের দেশের শান্ত এই শহরটিকে।
যেখানে মেসির সূর্যাস্তের মতো আর্জেন্টিনারও সূর্যোদয় হতে যাচ্ছে। চতুর্থ বিশ্বকাপের জন্য তারা আজ মাঠে নামতে যাচ্ছে। ইতালি ও ব্রাজিলের পর তারা টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড ছোঁয়ার হাতছানিতে সাড়া দিতে নামছে। নীল-সাদার এই নতুন অভিযানে স্বাগত জানাতে তৈরি শহরের অ্যারোহেড স্টেডিয়াম। এখানকার মানুষ স্টেডিয়ামকে ‘লাউড হাউস’ বলে চিনে থাকে। আমেরিকান ফুটবলের জনপ্রিয় দল কানসাস সিটি চিপসের দুর্গ এটি। প্রায় ৭০ হাজার মানুষের জন্য আসন পেতে দেওয়া এই স্টেডিয়ামের একটি গিনেস রেকর্ডও রয়েছে। ২০১৪ সালে কানসাস সিটি চিপসের একটি ম্যাচে এখানকার গ্যালারির গর্জন ১৪২.২ ডেসিবল স্পর্শ করেছিল, যা কিনা বিশ্বের যে কোনো খেলা স্টেডিয়ামের ইতিহাসের সর্বোচ্চ শব্দের রেকর্ড। রোববার মেসিদের হোটেলের সামনে ভিড় করা এক আর্জেন্টাইন সমর্থকের দাবি– আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে সেই রেকর্ডও ভেঙে যাবে। তাঁর আন্দাজ তিনি ক্যামেরার সামনেই চিৎকার করে দিয়ে দিলেন– ‘ভামোস আর্জেন্টিনা’ সুর তুলে। অবশ্য শুনতে লাগল ‘ভামো আর্হেন্টিনা’।
মেসিদের হোটেলের সামনে ক্যারাভ্যান নিয়ে আসা সেই সমর্থকের দাবি, এরই মধ্যে প্রায় কুড়ি হাজার সমর্থক তাদের দেশ থেকে এসেছে। এমনিতে এই শহরে তেমন প্রবাসী আর্জেন্টাইন নেই। তবে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দল কানসাসকে বেসক্যাম্প ঠিক করে নেওয়ায় শিকাগো থেকে তাদের দূতাবাস এখানে অস্থায়ী একটি অফিস খুলেছে। কিন্তু এখানে কি কেবলই আর্জেন্টিনা, ম্যাচে যে প্রতিপক্ষ আলজেরিয়া আছে– তাদের কি সমর্থক নেই? অবশ্যই থাকবে। এয়ারপোর্ট থেকেই দেখা, সেখানেও দলে দলে আলজেরিয়ার জার্সি গায়ে সমর্থকরা নামছেন। ভক্তরা যখন সবাই তৈরি, তখন খেলোয়াড়দের প্রস্তুতিটাই বা কেমন?
গেলবার কাতারে প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে ধাক্কা খাওয়ার পর এখন কোনো প্রতিপক্ষ নিয়েই আগ বাড়িয়ে কিছু একটা বলে দেওয়া যায় না। এমনকি ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর বলেই ২৭ নম্বরের আলজেরিয়াকে উড়িয়ে দেবে– সৌজন্যতার খাতিরে এটিও বলা যায় না। মরক্কোর মতো একটা প্রতি-আক্রমণ ও শারীরিক কৌশলের ব্যাপার আছে আলজেরিয়ার মধ্যেও। যারা আলজেরিয়াকে স্রেফ র্যাঙ্কিংয়ের এক আফ্রিকান দল ভেবে উড়িয়ে দিচ্ছেন, তাদের জেনে রাখা ভালো দলটির রক্তে ফরাসি ফুটবলের ব্যাকরণ আছে। সাহারা মরুভূমির মরুঝড়ের তীব্রতা আছে। দলটির সবচেয়ে বড় তারকা তাদের অধিনায়ক রিয়াদ মাহারেজ। ম্যানসিটি, লেস্টার সিটির সাবেক এই উইঙ্গার যদিও এখন সৌদিতে খেলেন, তার পরও মনে রাখতে হবে মেসির মতো তিনিও কোচ পেপ গার্দিওয়ালারই শিষ্য ছিলেন। তাঁর জন্যও এটি শেষ বিশ্বকাপ। ডি-বক্সের মধ্যে মাহারেজের বাঁ পায়ের সুইংয়ে সাবধানী না হলে তা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে আর্জেন্টিনার জন্য। এ ছাড়া ম্যানসিটির বর্তমান লেফট উইং ব্যাক রায়ান আয়াত তুরি আছেন আলজেরিয়া দলে। আর আছেন একজন ‘জিদান’। হ্যাঁ, লুকা জিদান। বাবা জিনেদিন জিদান ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপ খেললেও ছেলে বাবার পরিচয়েই আলজেরিয়ার নাগরিকত্ব নিয়েছেন। মেসির আক্রমণ থামানোর জন্য তিনিই আলজেরিয়ার গোলপোস্টের প্রহরী থাকবেন।
গ্রুপ ‘জে’-তে আর্জেন্টিনার পর আলজেরিয়াকেই সবচেয়ে শক্তিশালী বলে ধারণা করা হয়। বাকিদের মধ্যে অস্ট্রিয়া আর জর্ডানের কোনো এক দল হয়তো তৃতীয় হয়ে পরের রাউন্ডে যেতে পারে। তাই এই ম্যাচটি জিতেই গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার নিশ্চয়তা চাইছেন আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি। এই আলজেরিয়ার সঙ্গেই একটা হিসাব নাকি বাকি আছে স্কালোনির। কিছুদিন আগে এক সাক্ষাৎকারে অনেকটা মজা করেই বলেছিলেন তিনি। ‘আমি আলজেরিয়ার কোচ ভ্লাদিমির পেতকোভিচকে খুব ভালো করেই চিনি। যখন ইতালির ক্লাব লাজিওতে খেলতাম, তখন তিনি সেখানকার ম্যানেজার ছিলেন। অসাধারণ একজন কোচ। তবে বিশ্বকাপে তাঁর বিরুদ্ধে একটা ছোট হিসাব চুকানোর আছে আমার। কারণ, তিনি লাজিওতে থাকার সময় আমাকে বেশি ম্যাচ খেলতে দেননি।’ তবে এই ম্যাচে শুধু এই হিসাব নয়, আরও কিছু হিসাব মেলাতে হচ্ছে স্কালোনিকে। দলে চোট আঘাতের খবর যতটা বাইরে এসেছে, ধারণা করা হচ্ছে অবস্থা এর চেয়েও বেশি গুরুতর। একমাত্র মেসির চোট কাটিয়ে মাঠে ফেরার অফিসিয়াল ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। বাকিদের মধ্যে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, ট্যাগলেফিগো, মলিনা, মন্তিয়েলদের ব্যাপারে এখনও ধোঁয়াশায় আর্জেন্টাইন মিডিয়া। যদিও শুক্রবার টিম হোটেলের সামনে দেখা টিওয়াইসি স্পোর্টসের এক সাংবাদিক গ্যারান্টি দিয়েই বললেন, প্রথম ম্যাচেই খেলতে পারবেন তাদের দিবু মার্টিনেজ। তবে বাকিদের ব্যাপারে ভালো খবর নেই তাঁর কাছে।
৪-৩-৩ ফরমেশন স্কালোনির সবচেয়ে পছন্দের। সেখানে আক্রমণভাগে লিওনেল মেসি, লাউতারো মার্টিনেজ বা জুলিয়ান আলভারেজ থাকতে পারেন। বাঁ দিক থেকে আক্রমণ শানাতে থাকতে পারেন নিকোলাস গঞ্জালেস। মাঝমাঠে স্কালোনির ভরসা সেই রদ্রিগো ডি পল, এঞ্জো ফার্নান্দো আর ম্যাক অ্যালিস্টার। শঙ্কা যে জায়গায়, তা হলো রক্ষণভাগ। সেখানে মলিনা, রোমেরো, মেদিনা আর লিসান্দ্রো মার্টিনেজের থাকাটা প্রায় নিশ্চিত। তবে মাঝমাঠ যদি কোনো কারণে বলের দখল হারিয়ে ফেলে, তবে ‘রেস্ট ডিফেন্স’-এ দুর্বলতা ধরা পড়েছে সাম্প্রতিক কিছু ম্যাচে। তাই মাঝমাঠটা ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ আলবিসেলেস্তেদের।
স্কালোনির এই আর্জেন্টিনা কিন্তু ম্যানসিটি বা আর্সেনালের মতো মেপে মেপে পজেশন ধরে রাখার ফুটবল খেলে না। তারা ইচ্ছে করেই নিজেদের অর্ধে বল অলসভাবে পাস করতে পারে। প্রেভোকশন বিল্ডআপ করে প্রতিপক্ষকে প্ররোচিত করে, যাতে করে তারা হাই প্রেস করতে আর্জেন্টিনার বক্সের কাছে চলে আসে। আর তখনই ড্যাগার পাস বা থ্রু বলে প্রতিপক্ষের ফাঁকা মাঠে আক্রমণ। সাধারণত একটু ছোট দলগুলোর বিপক্ষে এই কৌশলেই স্কালোনিকে বাজিমাত করতে দেখা যায়। সমর্থকদের মতো তিনিও হয়তো কানসাসের ক্যানভাসকে এভাবেই নীল-সাদায় সাজিয়ে তুলবেন। সূর্যোদয়ের মতোই নতুন সম্ভাবনায় তিনি আর্জেন্টিনাকে আলোকিত করবেন। আর নিশ্চিতভাবেই অরিজিন হোটেলে বিখ্যাত সেই রুম নম্বর ২০২-এর মানুষটিকে বিদায়ী উপহার দিতে চাইবেন।
- বিষয় :
- লিওনেল মেসি
- আর্জেন্টিনা
- বিশ্বকাপ ফুটবল
